সুবীর নন্দী: শিল্পীসত্ত্বার এক নিখুঁত আকর

১৩ বছর আগে শিল্পী সুবীর নন্দীর সাথে পরিচয় হয়েছিল। আমি তখন সদ্য পাশ করা নবীন ডাক্তার। কুমিল্লা শহরের একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে প্রভাষক পদে শিক্ষকতা করি। ঢাকায় মাঝে মধ্যে আসি।

পরিচয় পর্বটি ছিল মজার। ফোনে ঠিক হলো শাহবাগের বংগবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্টোদিকে মৌলি রেস্টুরেন্টে বসে আমরা কথা বলব। আমি যথা সময়ে যথাস্থানে উপস্থিত। উনিও আসছেন। আমি রেস্টুরেন্টের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। একটা সাদা করলা গাড়ি থেকে উনি নামলেন, ফরসা টকটকে একজন অভিজাত চেহারার মানুষ। নেমেই বললেন, ‘স্যরি একটু দেরি করে ফেললাম। বোঝেনই তো ব্যাংকে চাকরি করি।’

আমাদের প্রাথমিক পরিচয় হলো রাস্তার পাশে দাড়িয়েই। আমার ভিজিটিং কার্ডটা দিলাম।

শিল্পী সুবীর নন্দী বললেন, ‘ওহ আপনি তো ডাক্তার তার উপর শিক্ষক।  রেস্টুরেন্টে না, আমার বাসায় চলেন।’

আমি মৃদু আপত্তি করেছিলাম। কিন্তু সেই আপত্তি টিকলো না।

উনি বললেন, ‘বৈদ্য নারায়নকে বাড়িতে না নিলে শীতলা দেবী রুষ্ট হবেন৷’ বলেই একটা ভুবনজয়ী হাসি দিলেন।

রাজি হয়ে গেলাম। রাজি না হয়ে পারা যায়না আসলে। এতটা সম্মান আমার জন্য অপ্রত্যাশিত ছিল। জীবন্ত কিংবদন্তীকে আমি অনুসরণ করতে লাগলাম।

তাঁর গ্রীন রোডের বাসায় নিয়ে গেলেন। বৌদির সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমাকে ড্রইং রুমে বসিয়ে বিশ মিনিট সময় নিয়ে মেয়েকে কোচিং থেকে নিয়ে এলেন। তারপর চেইঞ্জ করে একদম ঘরের পোশাকে গল্প করতে বসলেন। ততক্ষণে দুপুরের খাবারের আয়োজন হলো। এত সহজে একজন নতুন মানুষকে আপন করে নিতে দেখে আমি ভীষণ অবাক হলাম।

খাবার শেষ আমি ড্রইং রুমে বসলাম। সুবীর দা দুজনের জন্য দুইবাটি রসমালাই নিয়ে এলেন। আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘কুমিল্লার মানুষ, আপনাকে রসমালাই দিয়েই আপ্যায়ন করলাম। গঙ্গা দিয়ে গঙ্গা পুজো! হা হা হা…।’

আমি বললাম, দাদা, চাইলে আপনি আমাকে তুমি করেও বলতে পারেন৷ বয়সে তো অনেক ছোটই। তাছাড়া আমি গানও করি। সেই সূত্রে আমি আপনার ছাত্রতূল্যও বটে।

দাদা, জিব কেটে বললেন, ‘আরে কি বলেন! বয়স যাই হোক। আপনি বড় মানুষ। আপনি ডাক্তার, আবার শিক্ষক। আমার বাবা ডাক্তার। আমি ডাক্তারদের অনেক সম্মান করি। আমার মেরুদন্ডে একটি জটিল অসুখ হয়েছিল কয়েকবছর আগে। ডাক্তাররা অনেক করেছেন আমার জন্য৷ আমি সেই ঋণ ভুলবনা।’

আস্তে আস্তে আমরা কাজের কথায় আসলাম।

আমি ব্যাগে করে টাকা নিয়ে এসেছিলাম কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে একটি অনুষ্ঠানে উনাকে নেব বলে। সম্মানীর পুরো টাকাই দিয়ে দেব, এটাই ছিল প্ল্যান।

উনি নিলেন না। বললেন, ‘নিয়ে যান, যদি অনু্ষ্ঠানে যাই তো সেদিনই দিয়েন। এডভান্স করতে হবেনা। যদি অনুষ্ঠানটি করতে না পারেন তাহলে টাকা ফেরত নিতে আবার ঢাকায় আসতে হবে।’

আমি অবাক হয়ে উনার দিকে তাকিয়েছিলাম।

এই লেখার উদ্দেশ্য ভিন্ন।

আমি সেদিন দুই ঘন্টা ছিলাম সুবীর নন্দীর বাসায়। এই দুই ঘন্টা তিনি অনেক গল্প করলেন। সেদিন আমার একটা নতুন অভিজ্ঞতা হয়েছিল।

আমার দেখা সুবীর নন্দীই একজন সেলিব্রেটি শিল্পী যিনি পরোক্ষেও তাঁর কোন সহকর্মী শিল্পীকে অশ্রদ্ধা করে কথা বলেননি।

তখন আমার বয়স অল্প। সিনিয়র শিল্পীরা সহশিল্পীদের নিয়ে অশোভন মন্তব্য করতো দেখে একধরণের কৌতুক অনুভব করতাম। তাই ইচ্ছে করে খোঁচাতাম, মজা নিতাম। সুবীর দাকেও খোঁচা দিয়েছি। সে সময় যাদের নিয়ে সব শিল্পীরা কটু মন্তব্য করত তাদের নাম নিয়েছি।

– দাদা,  আসিফের গান কেমন লাগে?

– ওহ দারুণ ভয়েস।

– একটু বেসুরো না?

– ওটা তেমন না। দেখবেন যেটুকু আছে গাইতে গাইতে ঠিক হয়ে যাবে।

আমি একটু হতাশ হলাম। লোকটাকে উস্কানো যাচ্ছেনা।

– দাদা মমতাজ কে কেমন লাগে?

– এক্সিলেন্ট পারফরমার। কি পাওয়ার ওর গলায়!

– ভাল্গার গান করে।

– সেটা হয়ত করে। কি করবে বলেন? ওর ব্যাকগ্রাউন্ডটা দেখেন। কত কষ্ট করতে হয়েছে! ভাল গীতিকার ও পায়নি। কি করবে সে?

– শাকিলা জাফর?

– ও তো আমার বোন।  আই ফিল প্রাউড অব হার।

– অ্যান্ড্রু কিশোরকে কেমন লাগে?

– গোল্ডেন ভয়েস। একজন সত্যিকারের প্লেব্যাক সিঙ্গার। নায়কোচিত কন্ঠ।

আমাকে শেষ পর্যন্ত হতাশ করে দিলেন সুবীর দা। আমি কোন ভাবেই নেতিবাচক মন্তব্য বের করতে পারলাম না উনার মুখ থেকে৷ একটা নতুন ধরণের অভিজ্ঞতা নিয়ে বের হলাম সুবীর দার বাসা থেকে।

সেদিন সন্ধায় জানতে পারি আমাদের অনুষ্ঠানটি হতে দেবেনা মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ। কারণ আমরা সরকার দলের সমর্থক নই, আর যারা আমাদের অতিথি তারাও বিরোধী পক্ষের বুদ্ধিজীবি/ চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত।

আমি সাথে সাথেই সুবীরদাকে ফোন দিলাম। দাদা হেসে বললেন, আমি আপনাদের অতিথির নাম শুনেই বুঝেছিলাম অনুষ্ঠানটা করতে পারবেননা। তাই এডভান্স টাকাটাও রাখিনি।

সুবীর দার শরীরটা কয়েকবছর যাবতই ভাল যাচ্ছিনা৷  কদিন ধরে ভাবছিলাম  দেখতে যাব। নানা ব্যস্ততায় যাওয়া হলোনা। একজন ভাল মানুষ ও শিল্পীর পায়ের কাছে কিছুক্ষণ বসলে মনটা ভাল হয়ে যায়। যাওয়া হলোনা।

আর যাবার দরকার হবেনা। সুবীর দা চলে গেলেন অনন্তলোকে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।