বিশ্বের বুকে উপমহাদেশীয় ছবির মুখপাত্র

তাঁকে পেয়ে খুব উচ্ছ্বসিত ছিলেন ড্যানি বয়েল। বলেছিলেন, ‘পর্দায় তাঁকে দেখতে পারাটা খুবই দৃষ্টিসুখকর।’ ততদিনে ‍মুক্তি পেয়ে গেছে ‘স্লামডগ মিলিওনার’। বিশ্ব তখন কাঁপতে শুরু করেছে, বুঝতে শুরু করেছে। ইরফান খান চেনাতে শুরু করেছেন নিজেকে।

চলচ্চিত্র সমালোচক রজার এবার্ট ‘দ্য নেমসেক’-এ তাঁর কাজ দেখে বললেন, ‘খুবই সূক্ষ্ম আর আকর্ষণীয় কাজ। এরপর ‘লাইফ অব পাই’, ‘দ্য মাইটি হার্ট’, ‘দ্য ভিঞ্চি কোড’, ‘ইনফার্নো’ কিংবা ‘জুরাসিক ওয়ার্ল্ড’ এলো। ইরফান খান নিজেকে আরো বেশি মেলে ধরেছেন। আর তাঁর কাজেই পরিচিত পেতে শুরু করলো ভারতবর্ষ। আন্তর্জাতিক মহলে তিনি হয়ে উঠলেন ভারতের কিংবা ভারতের মুখপাত্র।

সর্বশেষ ছবি ‘আঙরেজি মিডিয়াম’ যখন মুক্তি পেল অন্য সবার চেয়ে তিনিই বেশি ইতিবাচক ছিলেন। বলেছিলেন, ‘আমি এখন এমন একটা অবস্থায় আছি, যখন ইতিবাচক থাকা ছাড়া আর কোনো রাস্তা খোলা নেই। এই পরিস্থিতি থেকে ভাল কিছু বের করার সর্বাত্মক চেষ্টা আমার থাকবে। আর এই ছবিটিও তেমনই ইতিবাচক একটা ছবি। আশা করবো, এই ছবিটা আপনাদের একই সাথে হাসাবে আর কাঁদাবে।’

আসলে ইরফান খানের সব ছবিই ছিল এমন। একই সাথে ছবিটা দর্শকদের হাসাতো, আবার কাঁদাতোও। ‘মকবুল (২০০৪)’, ‘পান সিং তোমার (২০১১)’, ‘দ্য লাঞ্চ বক্স (২০১৩), ‘হায়দার (২০১৪)’, ‘গুন্ডে (২০১৪), ‘পিকু (২০১৫)’, ‘তালভার (২০১৫)’ কিংবা ‘হিন্দি মিডিয়াম (২০১৭) – সব ছবিই তো এমন।

২০১৭ সালে করেন বাংলা ছবি ‘ডুব: নো বেড অব রোজেস’। জুটি বাঁধেন বাংলাদেশের মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সাথে। ইরফান খানের চরিত্রটির নাম ছিল ‘জাভেদ হাসান’। এটা নির্মিত হয়েছে প্রখ্যাত সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের জীবনের ছায়া অবলম্বনে। ছবিটি দিয়ে এক অনাবিল দু:খের সাগরে দর্শকদের ভাসিয়েছেন ইরফান।

বাইরের বিশ্বে নিজের গুরুত্বটা বোঝাতে পেরেছিলেন ইরফান। শুধু তাই নয়, তিনি সাহস দেখাতে পেরেছিলেন। তাই তো, ম্যাট ড্যামোন, ম্যাথিউ ম্যাককোনঘি, অ্যানে হ্যাথাওয়ে, লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও, ক্রিস্টোফর নোলান কিংবা রিডলি স্কটদের সাথে কাজ করার প্রস্তাব তিনি ফিরিয়ে দিতে পেরেছেন।

ফিরিয়ে দেওয়ার পেছনে যৌক্তিক কারণও ছিল। স্টিভেন স্পিলবার্গকে সাস্প্রতিক সময়ে তিনি ‘না’ বলে দিলেন ‍মুখের ওপর। সেটা ছিল সাইফাই ছবি ‘রোবোপোক্যালিপস’। স্পিলবার্গ এখনো সেই ছবি নিয়ে কাজ করছেন। ছবিতে স্কারলেট জনসনের সাথে কাজ করার কথা ছিল তার। ইরফান এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয়নি যে, এই চরিত্রটিতে আমার জন্য বড় কোনো সুযোগ এনে দিচ্ছে। তাই না বলে দেয়। যদিও, স্কারলেট জনসন এমন একজন অভিনেতা যার সাথে কাজ করতে পারা, স্ক্রিন শেয়ার করতে পারা – যে কারো জন্য সৌভাগ্যের ব্যাপার।

এটাই প্রথম নয়। এর আগে ক্রিস্টোফর নোলানের ‘ইন্টারস্টেলার’ প্রোজেক্টে না বলে দিয়েছিলেন ইরফান। শেষ অবধি ছবিটা ৬৫০ মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করে বিশ্বব্যাপী। ঠিক নিশ্চিত নয় যে, এখানে ঠিক কোন চরিত্রের জন্য ইরফানকে প্রস্তাব করেছিলেন নোলান, তবে সম্ভবত চরিত্রটা হয় ড্যাভিড গ্যাসি কিংবা ম্যাট ড্যামোন।

টাইমস অব ইন্ডিয়াকে ইরফান খান বলেছিলেন, ‘ওরা আমার কাছ থেকে বিশাল কমিটমেন্ট আশা করছিল। আমাকে চার মাস আমেরিকায় গিয়ে থাকতে হত। আমি একটু শিডিউলটায় পরিবর্তন চাচ্ছিলাম, কিন্তু ওরা রাজি হয়নি। প্রস্তাব করেছিলাম যে আমি ভারত থেকে ওখানে যাওয়া-আসার মধ্যে থেকে কাজটা করতে চাই। কারণ, এতদিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকা আমার জন্য সম্ভব নয়। এখানে তখন লাঞ্চ বক্স আর ডি-ডে’র শ্যুটিং চলছে। এরা তো আমাকে ছাড়বে না। আমি সাধারণত আক্ষেপ করার লোক নই, কিন্তু ওটা ছিল ক্রিস্টোফর নোলানের সিনেমা। তাঁকে না বলাটা আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল।’

ইরফান একবার নয়, দুবার রিডলি স্কটের সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু, শিডিউল জটিলতায় কোনোবারই করেননি। ইন্ডিয়া টুডেকে ইরফান বলেছিলেন, ‘আমি দ্য মার্টিয়ানপিকু – দু’টোই করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু, শিডিউল জটিলতায় হয়নি। এই নিয়ে দ্বিতীয় বারের মত তাঁর সাথে কাজ করার সুযোগ হারালাম। এর আগে বডি অব লাইস-এ এক সাথে কাজ করার কথা ছিল। সেটা আর হয়নি।’

‘দ্য মার্টিয়ান’-এ পরে ইরফানের চরিত্রটি পান চিউইটেল এজিফোর। আর মার্ক স্ট্রং করেন ‘বডি অব লাইস’। এই ছবিতে আরো ছিরেন ডিক্যাপ্রিও ও রাসেল ক্রো।

২০১৬ সালে হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, হলিউড তাঁকে যতই সাফল্য দিক না কেন তিনি ভারত ছাড়বেন না। তিনি বলেন, ‘আমি খুব ইন্টারেস্টিং চরিত্রের প্রস্তাব পাই। আমার বয়স যদি আরো কম হত, তাহলে হয়তো হলিউড নিয়ে আরেকটু গুরুত্ব নিয়ে ভাবতাম। তবে, কোনো অবস্থাতেই আমি ভারত ছাড়তে রাজি নয়। এখানে আমার নিজের মানুষরা আছেন, এই গল্পগুলোও তাই আমার। এখন ভারতে কত ছোট ছোট ছবিতেও কত ভিন্নধর্মী গল্প উঠে আসে। আমি এই সাহসী আর নতুন পৃথিবীর অংশ হতে পেরে গর্বিত। হলিউড আমার জন্য শুধুই একটা বোনাস।’

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।