ওগো ও আঙিনা, ভুলিনি তো আমি!

| শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে |

ওগো ও আঙিনা

ভুলিনি তো আমি,

হেথায় নতুন বধূ হেসেছিলাম পাশে ছিল স্বামী

উলু ছিল শঙ্খ ছিল

ছিল হাসি গান

কানায় কানায় ভরা ছিল আনন্দেরই বান।

আজ নীরব সবই

মৌন সবই

শব্দ কোথাও নাই

আমার বুকের দীর্ঘনিশ্বাস শুনতে যেন পাই।

দীর্ঘনিশ্বাস বুকে নিয়ে বাংলাদেশে পড়ে আছে এমন সব কলকাতার বাঙালিদের ছেড়ে যাওয়া প্রাসাদসম বাড়ি, যে বাড়ির লোকরা চলে এসেছেন কলকাতায়, দেশভাগ কি তারপরে। বাড়িগুলো আজও অক্ষত।

শতবছর ধরে বুকভরা হাহাকার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাড়ি গুলো আজও। আশেপাশে রয়েছে এঁদের কিছু বংশধররা তাই বাড়ি গুলোর অতীত তাঁরা আজও বলতে পারেন। মানিকগঞ্জের এসব প্রাসাদ বাড়ি থেকে পাকা বাড়ি হিন্দুদের, পড়ে আছে।

আমাদের কতজনকার পূর্বপুরুষরা যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, বরিশাল ছেড়ে কলকাতায় চলে এসেছেন। তবু বলেন বলতেন জন্মভূমির মাটি হলেও যদি কেউ নিয়ে আসে মাথায় ঠেকিয়ে রেখে দেব। আমরা জানিনা কেমন আছে আমাদের হারানো জায়গা জমি বাড়ি।

কিন্তু যেটা বলার, সব মুসলমানরা হিন্দুদের অত্যাচার করে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেন তা কিন্তু নয়। অনেক ভালো বাঙালী মুসলিমও ছিলেন। আছেন। যারা অত্যাচার করেছেন তাঁদের বংশধরদেরও এখন বোধ হয়েছে।

যে ইংরেজ শাসনের থেকে স্বাধীনতা পেয়েও শুধুমাত্র দুটো ধর্ম বিদ্বেষে এক বাংলা দু ভাগ হয়ে গেল। উন্নতি আটকে গেল। রবীন্দ্রনাথ আর নজরুল কোন বাংলার আসলে সেই নিয়ে আজও ধর্মীয় বিদ্বেষ। যেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাখীবন্ধন শুরু করেছিলেন আর কাজী নজরুল কলকাতার বহু শ্যামা মায়ের মন্দিরে বসে শ্যামা সঙ্গীত রচনা করেছেন সেখানে দুই দেশ শুধু ধর্ম বিদ্বেষে আর অপপ্রচারে একে অন্যকে দোষ দিচ্ছে।

বাংলাদেশে অনেক মুক্তিযোদ্ধা পরিবার আছেন তাঁরা উর্দূ চাননি মাতৃভাষার জন্যই রক্তাক্ত হয়েছেন তাঁরা কিন্তু সবাই হিন্দুদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করেনি।

এই মাণিকগঞ্জের গল্প আমায় বলেছে রাণী রাসমণি সিরিয়াল খ্যাত বাবু রাজচন্দ্র গাজী আবদূন নূর। ওঁকে আমি নূর বলি, বাংলাদেশেরই ছেলে। ও আমায় এইসব জায়গা ঘুরে,এইসব অঞ্চলের হিন্দুদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের গল্প আমায় বলেছে। নূরের চোখ দিয়েই বাংলাদেশের গল্প শুনছি।

তাই এই যে বিদ্বেষ আর অপপ্রচার চালাচ্ছে কিছু রাজনৈতিক দল ও মানুষ সেগুলো তাঁদের নিজের স্বার্থে। ভিতরের গল্পটা অন্য। সেগুলো বলা প্রয়োজন মনে করলাম। আরো অনেক বাংলাদেশের বন্ধুর থেকেও তো দেখছি ভ্রাতৃত্ববোধ।

যেমন এই কালী মন্দির ও সেখানকার বিগ্রহ মুসলিমরা ভেঙেছে রটানো হয়েছে ভোলা জেলায় ও অন্যত্র। কিন্তু নীচের ছবিতেই দেখতে পাবেন মাদ্রাসার ছাত্ররা এই কালী মন্দির পাহাড়া দিচ্ছে। এই খবর কিন্তু ভাইরাল হয়না।
উগ্র হিন্দুরাও কিন্তু মন্দির ভাঙছে এ দেশে।

মাণিকগঞ্জের নারীদের জিজ্ঞেস করা হয় আপনারা কেন যাননি ? তাঁরা বলেন, ‘কেন যামু? ওইখানে বুঝি স্বর্গ!’ উত্তরসূরিদের নামে এখনো মালিকানা রয়েছে এখনো দুর্গাপুজো হয় অথচ বাড়ির মালিকরা সবাই কিন্তু কলকাতাতে সেটেল। মাঝে মধ্যে অনেকেই আসেন কিন্তু প্রচার করেন না যে ওখানে তাদের উত্তরসূরিরা থাকেন তাঁরা ভালো আছেন মাঝে মাঝে বেড়াতে আসেন হিসাবগুলো কেউ করেনা এবং উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেনা কারণ যখন টিভিতে খবরের কাগজে প্রচার হয় মুসলিমরা হিন্দুদের উপর অত্যাচার করছে।

হিন্দু যারা আছেন বাংলাদেশে তাঁরা অনেক দেশের উচ্চপদে থেকেও দেশে ভালো নেই বলছেন। শুধু নূরের কথাই নয় বাংলাদেশ বন্ধুদের ফেসবুক ওয়াল ও তাঁদের পাঠানো ছবি থেকেও দেখেছি মুসলিমরা মহাষ্টমীর দিন কুমারী পুজো দেখতে ভোরবেলা উঠছে বাংলাদেশে। যাচ্ছে সবাই হিন্দু মন্দিরে। যেটা কলকাতায় সচরাচর হয়না। কেউ ভাবতেও পারেনা।

যদিও কলকাতার বারোয়ারী পূজোতে সব ধর্মের এন্ট্রি সমান প্রবেশ অবাধ। বাংলাদেশের বিদ্যালয় গুলোতে মুসলিম ছাত্ররাও সরস্বতী পুজোর কাজ করে মনের আনন্দে। এই আপনাদের রাজচন্দ্র নূরই তো করেছে স্কুলে পড়াকালীন। যে তখন জানতইনা কলকাতায় ঘটি বাটির এত ভাগ।

ঢাকার রমনা কালী বাড়ি পাকিস্তানিরা একাত্তরে নারকীয় হত্যাকান্ড চালায় মন্দির ভেঙে দেয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই কালী মন্দির আবারো প্রতিষ্ঠা করে হেরিটেজ হিসেবে ঘোষনা করেন।

আমরা এখন রাজনৈতিক দল গুলোর দেশ ভাগাভাগি থেকে বেরোতে পারলামনা ধর্মীয় দাসত্ব করে যাচ্ছি। কিন্তু জানেন কি আমরা মহালয়ার দিন ভোরে আকাশবাণীর যে মহিষাসুরমর্দিনী প্রভাতী অনুষ্ঠান শুনি তাতে অনেক মুসলমান বাজনদার যন্ত্রশিল্পী বাজনা বাজিয়েছিলেন বিখ্যাত আইকনিক গান গুলোর সঙ্গে ?

তখন তো দেবীর আগমণী বার্তা অশুচি হয়নি যুগ যুগ ধরে। তাহলে মুসলমানরা কেন ব্রাত্য থাকবে দুর্গা পুজোয়? বাংলাদেশে সব মুসলিম ভাইরা কিন্তু পুজো দেখতে বেরোয়। শুধু ঈদের চাঁদ নয় কোজাগরী কবে আমার থেকে জেনে সেদিন ওরা নদীর ধারে পূর্ণিমা দেখতে যায়।

আমাদের হাওড়ায় প্রতিমার চুল তৈরী করে সব মুসলিম ভাইরা বোনেরা। সেই চুল দিয়েই প্রতিমা সম্পূর্ন হন। মুসলিমরা না হলে দেবী পরিপূর্ণ রূপ পেতেন নাহ। ‘গোত্র’ ছবিতে দেখেছি জন্মাষ্টমীর গোপাল তৈরী করেন আলিগড়ের ভাইরা। যে পুজোর অঞ্জলী দেওয়া নিয়ে এত জাতপাত কিন্তু সেই পুজোই মুসলিমদের বানানো বিরিয়ানি না খেলে সম্পূর্ণ হয়না।

দুই বাংলার মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের প্রিয় মেকআপ ছিলেন একজন মুসলিম। মহঃ হাসান জামান। সত্তর দশক থেকে সব ছবির মেকআপ ম্যান তিনি। যার একমাত্র অধিকার ছিল ‘আমাকে যেন ও টাচ্ না করে’ বলা ম্যাডামের স্কিন টাচ করার। তো সেই জামানের বাড়ির রমজান ঈদের সিমুই খেতে সুচিত্রা সেন সবার আড়ালে মুখে রুমাল চাপা দিয়ে আনোয়ার শাহ রোডের টিপু সুলতান মসজিদের পেছনে জামানের বাড়ি যেতেন। নিয়ে যেতেন ঈদের উপহার। ‘সুচিত্রা সেনের প্রিয় ছিল আমার হাতের সিমুই।বাকি সিমুই বেঁধে দিতাম টিফিন বাক্স করে ম্যাডামকে।’ জানান হাসানের বিবি জামিলা খাতুন।

আমাদের কলকাতায় সুচিত্রা সেনের সব হওয়া সত্বেও তাঁর কোনো মিউজিয়াম নেই। কিন্তু পাবনা তাঁর জন্মস্থানে সুচিত্রা সেনের বাড়ি জামাত গোষ্ঠীর থেকে উদ্ধার করে মিউজিয়াম করেছেন পাবনাবাসী মুসলিমরাই।

মাণিকগঞ্জ শুধু নয় সমগ্র বাংলাদেশে এখানকার মতো ফ্ল্যাট কালচার প্রবেশ না করায় এখনও ছেড়ে যাওয়া হিন্দু বাড়ি গুলো রয়ে গেছে। সেইসব ভাস্কর্য ঠাকুর আজও অক্ষত। যেমন লক্ষ্মীর ঝাঁপি,ঘট,তুলসী মঞ্চ আজও দাঁড়িয়ে আছে যদি তাঁরা ফিরে আসে সেই অপেক্ষায়। এই রকম লক্ষ্মী ঠাকুর কিন্তু আজকাল তৈরী হয়না।

আর এই হিন্দু-মুসলিম কি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে? রোগভোগ হলে চিকিৎসা ডাক্তার পেতে কি রক্ত পেতে তো কেউ জাতের দোহাই দেয়না। তাহলে কেন এত বিদ্বেষ!

যারা দোষ করেছিল তাঁদের পরিবার গুলো আজ অনুতপ্ত। আর ছিল পাকিস্তানি বিহারি মুসলিম প্রভাব। বাঙালীরা বাংলায় থাকবে সেখানে হিন্দু মুসলিম কেন ভাই বোন হতে পারেনা?

এই বাড়ি গুলো আজও সেইসব জমজমাট একান্নবর্তী পরিবারের স্মৃতি আনন্দ উৎসবের নানা রংয়ের দিনগুলি আগলে দাঁড়িয়ে আছে এক বুক হাহাকার নিয়ে। বাংলাদেশ গেলেও ভিসা করে এখানকার মানুষ আপ্যায়ণ করতে প্রস্তুত। কিন্তু সেই চোরা ভয়ে আজও আমরা ভাবি। কিন্তু সময় বদলেছে ভাবনা বদলেছে।

এই বাড়ি, পুকুর পাড়, তুলসীতলা, থামগুলো, পুরনো লাল ইঁট গুলো কি বলছে আসুন শুনি।

ও তুলসীতলা আজও পড়ে মনে

হেথায় গঙ্গা জলের ছটা দিতাম ছড়িয়ে স্বযতনে

সবার ভালো আশা করে

তুলসীবেদী মূলে

নিজের হাতে দিতাম আমি সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বেলে।

আজ নিবিড় কালো আঁধার সবই

আলো কোথাও নাই

সকল প্রদীপ নিভে গেছে পড়ে আছে ছাই।

এবার আমি যাই। 

ছবি: গাজী আবদুন নূর

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।