ধোনির ব্যাটিং: স্ট্র্যাটেজিক ফ্যালাসি নাকি বিশ্বকাপের ট্রেন্ড?

সমালোচনা আর প্রশংসা! চলতি বিশ্বকাপে মহেন্দ্র সিং ধোনির ক্ষেত্রে দুটোই করা যায়। তবে প্রসঙ্গ না বুঝে সমালোচনা, প্রশংসা উভয় ক্ষেত্রেই সমস্যা রয়েছে।

ভারতের ব্যাটিংয়ে বিবর্ণ লেজের বিবেচনায় উইন্ডিজের বিপক্ষে ধোনির ৬১ বলে অপরাজিত ৫৬ রানের ইনিংসটি ছিল ভালো কৌশল। আগেই তেড়েফুঁড়ে খেলার চেয়ে বরং দলীয় ইনিংসটাকে টেনে আরো গভীরে নিয়েছিলেন তিনি।

সেখানে একমাত্র সমস্যাটা ছিলো স্ট্রাইক রোটেশনের ঘাটতি। ৪০ বলে ২০ রানের একটি ইনিংস ৪০ বলে ৩০ রানের ইনিংস হতে পারত এবং শেষে ২৬৮ রানের সংগ্রহকে ২৮০ রানে রূপান্তরে সহায়ক ভূমিকা পালন করত। যাই হোক দিনশেষে ভারত ম্যাচটি জিতে এবং বড় পরিসরে চিন্তা করলে ধোনির কৌশল কাজে লেগেছিল।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ভারতের রান তাড়া করার পুরো পদ্ধতিটাই ছিল এলোমেলো। ব্যাটসম্যানদের সহায়তার জন্য পাটা উইকেট তৈরি করা হলেও ম্যাচের পুরোটা সময় উইকেটের আচরণ এক রকম ছিল না। ম্যাচের বয়স বাড়ার সাথে সাথে বার্মিংহ্যামের উইকেট অতিরিক্ত স্লো হতে শুরু করেছিল।

শুরুতেই রাহুল আউট হওয়াতে একটু বিপাকে পড়ে যায় ভারত। ৩৩৮ রানের বড় লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে রোহিতের ধীর ব্যাটিংয়ের ফলশ্রুতিতে প্রথম পাওয়ারপ্লে শেষে দলের স্কোরবোর্ডে জমা হয় মাত্র ২৭ রান। এতে করে প্রয়োজনীয় রান রেট বেড়ে দাঁড়ায় ৮ এ।

ভারতীয় টপ অর্ডার এক্ষেত্রে আরেকটু বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে পারত কিংবা কোহলি এবং রোহিত ডাগআউটে ফিরে যাবার আগে অন্তত স্ট্রাইকরেটটা ১০০ তে রাখতে পারতেন। রিশাব পান্তেরও দরকার ছিল কয়েকটা ওভারে দ্রুত রান তোলার যেহেতু ততক্ষণে তিনি বেশকয়েকটা বল খেলে একটা শুরু পেয়ে গিয়েছিলেন।

তারপর হিসাবের ক্রিকেটটা ঠিক খেলতে পারেনি ভারত। এখনকার ক্রিকেটে ভালো দলগুলো শেষ দশ ওভারে দশ করে রান তোলার জন্য উইকেট ধরে রাখে। ইংল্যান্ডের মত দুর্বল বোলিং শক্তির বিপক্ষে পান্ত, ধোনি, পান্ডিয়া ও কেদার যাদব থাকার পরেও ম্যাচটা কি ভারতের জেতার মত ছিল না?

আবার এই বিশ্বকাপে রান তাড়া করে জেতার ব্যাপারটিও কি খুব বেশি সহজ হচ্ছে? এখন পর্যন্ত চলতি বিশ্বকাপে ১৮ বারের মধ্যে ১৭ বারই আগে ব্যাট করে ২৫০ এর বেশি রান করা দলগুলো জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছে। একমাত্র বাংলাদেশ ৩২২ রান তাড়া করে জিতেছে উইন্ডিজের বিপক্ষে।

বিশ্বকাপের আগে যেকোন লক্ষ্য আরামসে তাড়া করে জয় পাওয়া ইংল্যান্ডও এবার ব্যর্থ হয়েছে পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া এমনকি শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে রান তাড়া করতে নেমে। কিন্তু ওয়ানডেতে এক নাম্বার দল হিসেবে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলতে নামে ভারত। তাই এটা কি আশা করা যাচ্ছিলো না যে তারা ওই ব্যাপারগুলোকে হারিয়ে দিবে?

ইংল্যান্ড ম্যাচে নিজের পরিকল্পনার জন্য ধোনি সমালোচিত হতে পারেন বা ১৩৫.৫ স্ট্রাইক রেটের জন্য প্রশংসিতও হতে পারেন। এখন ম্যাচের সূত্র ধরে তার ব্যাটিং ভেঙে দেখা যাক।

ধোনি যখন ব্যাটিংয়ে আসেন তখন ১২ বলে ২২ রান নিয়ে উইকেটে ছিলেন হার্দিক পান্ডিয়া এবং জয়ের জন্য ভারতের দরকার ছিল ৬৫ বলে ১১২ রান। এখনকার ক্রিকেটে এটা অর্জনীয় বা অন্তত প্রয়াসযোগ্য। তবে ভারত ওই ৬৫ বলে ৮০ রান তুলে তাদের ইনিংস শেষ করে। এটা নতুন কিছু নয় যে ভারতের ব্যাটিং লেজ দুর্বল। এটা জানা এবং তা কোনভাবেই অজুহাত হতে পারে না।

ব্যাটিংয়ে নেমে নিজের মোকাবিলা করা প্রথম বলটি লিভ করেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। চলুন এখান থেকে দেখে নেয়া যাক ওভার বাই ওভার প্রয়োজনীয় রান রেট এবং ধোনির স্ট্রাইক রেট ও রান রেট

১০ ওভারে দরকার ১০৪ – প্রয়োজনীয় রান রেট ১০.৪। ধোনি ০ (১)

৯ ওভারে দরকার ৯৫ – প্রয়োজনীয় রান রেট ১০.৫। ধোনি ১ (২)

৮ ওভারে দরকার ৯০ – প্রয়োজনীয় রান রেট ১১.৩। ধোনি ৩ (৫), স্ট্রাইক রেট ৬০, রান রেট ৩.৬

৭ ওভারে দরকার ৮৩ – প্রয়োজনীয় রান রেট ১১.৯। ধোনি ৮ (৯), স্ট্রাইক রেট ৮৮.৯, রান রেট ৫.৩৩

৬ ওভারে দরকার ৭৮ – প্রয়োজনীয় রান রেট ১৩। ধোনি ১১ (১১), স্ট্রাইক রেট ১০০, রান রেট ৬

৫ ওভারে দরকার ৭১ – প্রয়োজনীয় রান রেট ১৪.২। ধোনি ১৬ (১৩), স্ট্রাইক রেট ১২৩.১, রান রেট ৭.৩৮

ঠিক এই সময় পার্টনারশিপে ২২ বলে ২৩ রান যোগ করে আউট হয়ে যান হার্দিক। এটা স্পষ্ট যে ধোনির স্ট্রাইক রেট তখন শ্রেয়তর ছিল। ইংল্যান্ডের পেসাররা বলের গতি কমিয়ে আসল কাজটি সেরে ফেলে যেহেতু উইকেটে বল গ্রিপ করছিলো। তবে এটা হতবুদ্ধিকর কাজ হতো যদি উভয় ব্যাটসম্যান ম্যাচটাকে আরো গভীরে নেয়ার চিন্তা করত।

এই জুটিতে হার্দিক পান্ডিয়াকে নিষ্ক্রিয় হিসেবে বিবেচনা করে এটা অনুমান করা যেতে পারে যে সে ম্যাচটাকে শেষ পর্যন্ত টেনে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু এই অবস্থায় সে কেন বেশিরভাগ সময় স্ট্রাইকে ছিল এবং ধোনি কেন নয়? যেকোনভাবে একজনের দ্রুত রান তোলা দরকার ছিল যা ঠিক ঘটেনি সে ম্যাচে।

৪ ওভারে দরকার ৬২ – প্রয়োজনীয় রান রেট ১৫.৫। ধোনি ২৩ (১৭), স্ট্রাইক রেট ১৩৫.৩, রান রেট ৮.৮২

৩ ওভারে দরকার ৫৭ – প্রয়োজনীয় রান রেট ১৯। ধোনি ২৬ (২০), স্ট্রাইক রেট ১৩০, রান রেট ৭.৮

২ ওভারে দরকার ৫১ – প্রয়োজনীয় রান রেট ২৫.৫।ধোনি ২৯ (২৪), স্ট্রাইক রেট ১২০.৮, রান রেট ৭.২৫

১ ওভারে দরকার ৪৪ – প্রয়োজনীয় রান রেট ৪৪। ধোনি ৩৫ (২৮), স্ট্রাইক রেট ১২৫, রান রেট ৭.৫

ভারত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩১ রান দূরে থেকে ম্যাচটি শেষ করে। ধোনি ১৩৫.৫ স্ট্রাইক রেটে ৩১ বলে ৪২ রান করে অপরাজিত থাকেন। যখন ভারতের ১০ করে প্রতি ওভারে দরকার পড়ে তখন তিনি ব্যাট করেন ৮.১৩ রেটে। ঠিক এই সময়ে তার সঙ্গী ৬ রেটে রান তুলে আউট হন ৩৫ বলে ৩৫ করে।

এটা ছিল ভারতের কৌশলগত ব্যর্থতা ও সাদা বলের ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার মহেন্দ্র সিং ধোনির ক্ষীয়মান সামর্থ্যের ফল। ভারত রান তাড়া করতে নেমে সেভাবে অ্যাপ্রোচ নিতে পারেনি যেভাবে নেয়া উচিত ছিল। এই ব্যথতা ঢাকতে ভেসে আসা কয়েকটি তত্ত্বের একটি হলো পান্ডিয়ার আউটের পর নাকি ভারতের নেট রান রেট নিউজিল্যান্ডের চেয়ে এগিয়ে রাখার জন্য ধোনি রক্ষকের ভূমিকা পালন করেন। ধোনি যখন ব্যাটিংয়ে নামেন তখন ভারতের রান ছিল ২২৬। ঠিক এই রানেও যদি ভারত অল আউট হত তারপরও নেট রান রেটে তারা নিউজিল্যান্ডের চেয়ে খানিকটা এগিয়ে থাকতো।

হার-জিত খেলারই অংশ। টস জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত ইংল্যান্ডকে ম্যাচে এগিয়ে নিয়ে যায় এবং তারপর আরো এগিয়ে নিয়ে যায় জনি বেয়ারস্টোর বিস্ফোরক ব্যাটিং। একসময় তো মনে হচ্ছিলো ইংল্যান্ড রানের পাহাড়ে আরোহণ করবে। ভারতের বোলিংয়ের প্রশংসা করতেই হয় যে তারা পরবর্তীতে ইংলিশদের রানের লাগাম টেনে ধরে এবং ৩৮০ এর মত বিশাল সংগ্রহের নিচে চাপা পড়া এড়াতে সক্ষম হয়।

পরাজয়ের চেয়েও ভারতীয় সমর্থকরা বেশি আহত দলের অপরিকল্পিত ব্যাটিং দেখে। এখন পর্যন্ত ভারতের বিশ্বকাপ যাত্রা চলছে দুজন নাম্বার ওয়ান – বিরাট কোহলি ও জাসপ্রিত বোমরাহর ধারাবাহিকতায় ভর করে। সে যাত্রা আরো তরান্বিত হচ্ছে রোহিত শর্মা ও মোহাম্মদ শামির নজরকাড়া পারফরম্যান্সে। বোলিংয়ের মত ভারতের ব্যাটিংয়েও দরকার সম্ভাব্য সেরা পরিকল্পনা এবং কৌশল। তবে দল নিয়ে এখনই বিচলিত হওয়ার কোন প্রয়োজন নেই।

__________

লেখাটি ভারতীয় গণমাধ্যম সকাল স্পোর্টস-এ প্রথম প্রকাশিত হয়। অলিগলি.কমের হয়ে অনুবাদ করেছেন উদয় সিনা।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।