পাশের বাড়ির সেই মিষ্টি মেয়েটা

বলিউডের রুপালী জগতে প্রতিদিনই কোন না কোন নায়িকার আগমন ঘটে। কেউ সাফল্য লাভ করেন, কেউবা কিছু সময় পরে হারিয়ে যান। কিন্তু এমন কিছু অভিনেত্রী তাদের ছাপ এমনভাবে রেখে যান যে, তাদের নামটি ছাড়া বলিউড সিনেমার ইতিহাস অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে আর এমনই একটি নাম হচ্ছে রাণী মুখার্জী।

২২ বছরের অভিনয় জীবনে পেরিয়ে এসেছেন অনেকটা সময়, এসেছে উত্থান- পতন। তবুও তিনি নিষ্প্রভ হননি, আপন আলোয় জ্বলে উঠেছেন বারবার। সমসাময়িক নায়িকাদের মত ঝলসানো রুপ কিংবা উচ্চতা হয়তো তাঁর ছিল না, কিন্তু এই বাঙালি কন্যা মায়াবী চেহারা আর অভিনয় গুণে ঠিকই দর্শক জয় করেছিলেন। তিনি প্রমান করেছিলেন বলিউডের এই আলো ঝলকানো জগতে অভিনয়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বাবা প্রযোজক রাম মুখার্জী, চাচী বলিউডের এক সময়ের নামকরা অভিনেত্রী তনুজা, চাচাতো বোন কাজল, কাজলের স্বামী অজয় দেবগন বলিউডের অন্যতম সেরা জনপ্রিয় অভিনেতা, আরেক চাচাতো ভাই আয়ান মুখার্জী বলিউডের এই সময়ের অন্যতম সেরা পরিচালক। কলকাতার প্রখ্যাত অভিনেত্রী দেবশ্রী রায় হচ্ছেন তার মাসি। স্বামী বলিউডের সবচেয়ে বড় প্রোডাকশন হাউজ যশ রাজ চলচ্চিত্রের মালিক আদিত্য চোপড়া।

রাণী মুখার্জীর পারিবারিক ইতিহাস দেখতে হলে চোখ এমন ছানাবড়া হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে বাস্তবজীবনে খুবই সাধারণ এক বাঙালি মেয়ের জীবন যাপন করতেই আগ্রহ তাঁর। তাই তাঁর সেই পাশের বাড়ির মিষ্টি মেয়ের ইমেজ এখনো বহাল।

বলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে রাণীই তার সময়ের একমাত্র অভিনেত্রী যার সাথে অন্য নায়িকাদের বন্ধুত্বের খবর দেখা যেত খবরের পাতায়। প্রীতি জিনতা হোক বা কারিনা কাপুর, বিপাশা বসু থেকে বিদ্যা বালান – রাণী সবার বন্ধু। সদ্য প্র‍য়াত সুপারস্টার শ্রীদেবীর সাথেও তার বন্ধুত্ব ছিল রীতিমতো বিস্ময়কর। অন্যদিকে শাহরুখ, সালমান, আমির, হ্নতিক, গোবিন্দ, অভিষেক থেকে শুরু করে পরিচালক করন জোহর, মনি রত্নম, সঞ্জয় লীলা বনসালী বা সাদ আলী রানী তার রাজত্বে সবার কাছ থেকেই পেয়েছেন বন্ধুত্বের সার্টিফিকেট।

চলচ্চিত্র পরিবারের মানুষ বলেই হয়তো নিজের পিতার প্রযোজনায় বাংলা ছবি ‘বিয়ের ফুল’ দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক, সাথে ছিলেন প্রসেনজিৎ এবং ইন্দ্রাণী হালদার। সিনেমা ব্যবসাসফল তো বটেই, সাথে সুপারহিট হয়েছিল সিনেমার গান।বাংলা জয় করার পর বলিউড জগতে পদচারনা, তবে শুরুটা তেমন ভালো হয় নি। প্রথম ছবি ‘রাজা কি আয়েগে বারাত’ ফ্লপ, সাথে নিজের কণ্ঠস্বর নিয়েও কিছুটা সমালোচিত হন তিনি।

তবে দমে যাননি রানী, পরের সিনেমা আমির খানের বিপরীতে ‘গুলাম’, এই ছবি ব্যবসাসফল তো হলোই সাথে তার গ্ল্যামারাস লুক, সহজ অভিনয় প্রশংসিত হয়েছিল। তবে অভিনয় করেছিলেন অন্যের কন্ঠে। তাই একটু খুতখুতানি যেন রয়েই গেল। তবে তাঁর এই ভিন্ন কন্ঠ কে নিয়ে বাজি ধরেছিলেন তখনকার নবাগত পরিচালক করণ জোহর, টুইঙ্কল খান্না, ঐশ্বরিয়া সহ বেশ কয়েকজন নায়িকার ফিরিয়ে দেয়া ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’-এর টিনা চরিত্র করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন তিনি।শাহরুখের রাহুল বা কাজলের অঞ্জলি চরিত্রগুলোর মাঝেও এতটুকুও ম্লান হয়নি টিনা।

ব্যাস, তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। তবে ছোটখাটো, শ্যামলা বর্নের রাণী পাল্লা দিয়েছেন সেই সময়ের অনেক সুন্দরী, গ্ল্যামারস নায়িকাদের সাথে। ঐশ্বরিয়া, প্রীতি, কারিনা, বিপাশার মতো নায়িকাদের সাথে তাল মিলিয়ে চুটিয়ে অভিনয় করেছেন রানী। তিন খান, হ্নতিক, অজয়, সাঈফ আলী খান, অভিষেক বচ্চনের সাথে হিট সুপারহিট সিনেমা উপহার দিয়েছেন তিনি।

হার দিল জো পেয়ার কারেগা, চোরি চোরি চুপকে চুপকে, সাথিয়া, চালতে চালতে, প্যাহেলি, বান্টি অওর বাবলি, কাভি আলবিদা না ক্যাহনা, বীর জারা, যুবা, নো ওয়ান কিলড জেসিকা, তালাশ, মারদানি’র মত সিনেমা। তবে রানী সিনেমাপ্রেমীদের মাঝে অমর হয়ে থাকবেন, তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা সিনেমা ‘ব্ল্যাক’ সিনেমার জন্য, এক অন্ধ এবং বোবা মেয়ের ভূমিকায় দূর্দান্ত অভিনয় করেছিলেন তিনি, যা এখনো যেকোন অভিনেত্রীর জন্য গাইডেন্সের মতো কাজ করে। ‘হাম তুম’ ছবিটিও তার ক্যারিয়ারে উল্লেখযোগ্য সংযোজন।

মূল নায়িকা, বা কখনো পার্শ্ব চরিত্র অভিনয় করেও সবসময় নিজেকে সমুজ্জ্বল করেছেন তিনি। পর্দায় তার দিক থেকে চোখ ফেরানো দায় হয়ে যায় দর্শকদের জন্য। যার স্বীকৃতিস্বরুপ জি-সিনে, ফিল্মফেয়ার, আইফা, স্টারডাস্ট সহ প্রায় সব পুরস্কার অর্জন করেছেন তিনি। সর্বশেষ ছবি ‘হিচকি’ দর্শক ও সমালোচক – সবাইকেই মুগ্ধ করেছে।

এর আগে একটা সময় পর প্রধান নায়িকা হিসেবে কিছু ছবি ফ্লপ হয় রাণীর। এমনকি মুক্তির আগে আলোচিত ‘আঁইয়া’ও মুখ থুবড়ে পড়ে। কিছুদিনের জন্য বিরতি দিয়ে ‘মারদানি’ সিনেমার মাধ্যমে ফিরে আসেন তিনি স্বমহিমায়। ২০১৪ সালে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন প্রযোজক পরিচালক আদিত্য চোপড়াকে। ২০১৫ সালে কন্যা সন্তানের মা হন তিনি। মেয়ের নাম আদিরা চোপড়া।

চল্লিশের পরে নাকি বলিউড নায়িকারা অভিনেত্রী হিসেবে নিজেদের এক অন্যতম সেরা আসনে নিয়ে যান। ওয়াহিদা রহমান, নূতন, শাবানা আজমী, জয়া বচ্চন, হেমা মালিনী, শ্রীদেবী, মাধুরী থেকে কাজল এরা সবাই চল্লিশের পরে নিজেদের ক্যারিয়ারের ভিন্নধর্মী ও সেরা কিছু কাজ উপহার দিয়েছেন। ‘হিচকি’ দিয়েই সেই পথেই নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে বলিউড রাণীর। এই যাত্রা কোথায় নিয়ে যাবে তাঁকে – সেটা হয়তো সময়ই বলে দিবে!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।