কাকা: সর্বজয়ী এক দু:খী রাজপুত্র

১.

ব্রাজিল এমন একটি দল যে দলে যুগে যুগেই একেকজন সুপারস্টাররের আগমন ঘটে। কালো মানিক পেলের আবির্ভাবের পরে আর কোন যুগেই ব্রাজিল দলকে সুপারস্টার শূন্য দেখা যায়নি। রোমারিও, রোনালদোর বিদায়ের পর সেই বাজিল দলে রোনালদিনহোর সাথে আরেকজন সুপারস্টারের আগমন হয়েছিল। তিনি আর কেউ নন, তিনি হলেন শৌর্য-সুদর্শন  চেহারার ফুটবলের এক রাজপুত্র- রিকার্ডো কাকা যাকে অনেকেই বাজিলের সাদা পেলে হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।

কাকার যখন সাত বছর বয়স তখন তার পরিবার সাও পাওলো তে বসবাস শুরু করে। সেখানকার স্কুল থেকে তিনি একটি যুব ক্লাবে ভর্তি হয় এবং একটি টুর্নামেন্ট জিতে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে, মাত্র আট বছর বয়সে ‘সাও পাওলো ফুটবল ক্লাব’ তাদের  যুব দলের হয়ে তাকে খেলার সুযোগ করে দেয়। ১৫ বছর বয়সে ক্লাবটির সাথে তিনি চুক্তিবদ্ধ হন এবং ঐ বছরই ক্লাবটির যুবদলকে ‘কোপা ডি জুভেনিল’ জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখেন কাকা।

যুব দলে অনবদ্য পারফর্মেন্সের কারণে তার মূল দলে সুযোগ হয়। দুই ফেব্রুয়ারি ২০০১ এ তার মূল দলে অভিষেক হয়। সেই মৌসুমে ২৭ ম্যাচ খেলে তিনি ১২ টি গোল করেন। সেই বছরেই ৭ মার্চে  সাও পাওলো  খেলছিল বুটাফুগোর বিপক্ষে ‘টর্নেও রিও’ প্রতিযোগিতার ফাইনালে  যা এর আগে ক্লাবটি কখনো জিতেনি। কাকা বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামেন ৫৯ মিনিটে যখন তার দল ১-০ গোলে পিছিয়ে ছিল। ৭৯ ও ৮১, এই দুই মিনিটের ব্যবধানে দুইটি গোল করে সাও পাওলোকে একক কৃতিত্বে ‘টর্নেও রিও’ জেতান কাকা। সেই বছরে ২২ টি ম্যাচ খেলে ১০ গোল করেন যা দিয়ে তিনি ইউরোপিয়ান ক্লাবগুলোর নজর কাড়েন তিনি। সাও পাওলোর হয়ে প্রথম দফায় ১২৫ ম্যাচ খেলে ৪৭ গোল করে কাকা।

সাও পাওলোর হয়ে অনবদ্য পারফর্মেন্সের কারণেই ২০০২ বিশ্বকাপের ব্রাজিল স্কোয়াডে জায়গা হয় তার। ২০০২ বিশ্বকাপে চুমু খাওয়ার সুভাগ্য হয়েছিল এই সুপারস্টারের যদিও অধিকাংশ সময় তিনি সাইড বেঞ্চে বসে পার করতে হয়েছে তাকে। দক্ষিন কোরিয়া ও জাপানে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে কোস্টারিকার বিপক্ষে একটি মাত্র ম্যাচে ১৭ খেলতে পেরেছিলেন কাকা।

২.

২০০৩ সালে ৮.৫ ইউরোতে কাকা ইউরোপিয়ান জায়ান্ট এসি মিলানে যোগ দেন। তার অসাধারণ ফুটবল স্কিলিং দিয়ে  খুব দ্রুতই তিনি প্রথম একাদসে তার নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করেছিলেন। প্রথম সিজনেই ৩০ ম্যাচে ১০ টি গোল এবং কিছু সংখ্যক অ্যাসিস্ট  করে মিলানকে সিরিএ জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন কাকা। সেই মৌসুমে তিনি চ্যাম্পিয়নস লিগেও চারটি গোল করেছিলেন।  ভালো খেলার ফল। হিসেব প্রথম সিজনেই তিনি ২০০৪ সালে ‘সিরিএ প্লেয়ার অফ দ্যা সিজন’ পুরষ্কার জেতেন।

এর পরের মৌসুমেও ফর্মে থাকা দুর্দান্ত কাকাকে দেখা যায়। কিন্তু অবিশ্বাস্যভভাবে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল হারতে হয়েছিল তার দলকে লিভারপুলের কাছে। প্রথমার্ধে ৩-০ গোলে এগিয়ে থেকেও জেরার্ডদের অতিমানবীয় পারফর্মেন্সে  লিভারপুল এক অবিস্মরণীয় কামব্যাক করে যা ‘মিরাকল অব ইস্তাম্বুল’ নামে পরিচিত।  দ্বিতীয়ার্ধের ১৫ মিনিটের ভিতরেই ৩ গোল করে বসে লিভারপুল। অতিরিক্ত সময়ে আর গোল না হওয়াই  খেলা টাইব্রেকারে গড়ায়।

সেখানে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা শেভচেঙ্কো এবং পিরলোর মিসে মিলান ৩-২ গোলে পরাজিত হয়। অথচ কি খেলাটাই না খেলেছিল কাকা! হাফ টাইমের বাঁশি বাজানোর একটু  আগে কাকা যখন ক্রেসপোকে পাস দেন তখন ক্রেস্পোর সামনে শুধুই গোল রক্ষক ছিলেন। সেই টুর্নামেন্টে দুটি গোলের পাশাপাশি টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ এসিস্ট মেকার(৫) হয়েছিলেন কাকা। ফলস্বরুপ, ২০০৫-এ ‘উয়েফা সেরা ক্লাব ফুটবলার’ হিসেবে মনোনীত হন তিনি। আর চ্যাম্পিয়নস লিগ ট্রফির স্বাদটা নেন ২০০৬-৭ মৌসুমে।

শেভচেঙ্কো  মিলান ছেড়ে দিলে দলের মুল ছক আঁকা হয় কাকাকে ঘিরে। তিনি হয়ে উঠেন ক্লাবটির প্রাণভোমরা। ২০০৬-০৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির গ্রুপ স্টেজে তিনি হ্যাটট্টিক করে দুর্দান্তভাবে  টুর্নামেন্ট শুরু করেন তিনি।

এরপরে দ্বতীয় রাউন্ড,  কোয়াটার ফাইনাল, সেমি ফাইনালে যথাক্রমে  সেল্টিক, বায়ার্ন মিউনিখ ও ম্যানইউকে হারিয়ে ফাইনালে উঠে মিলান। মিলানের ফাইনালে উঠায় কাকার ভূমিকা ছিল অসামান্য, অতুলনীয়। কখনো তিনি গোল করে দলকে জয় এনে দিয়েছিলেন, আবার কখনো গোল করিয়ে দলের ত্রাতা হয়েছিলেন।

গ্রুপ স্টেজে হ্যাট্টিক করে টুর্নামেন্ট শুরু করেছিলেন তিনি। আর এরপরে একে একে  বায়ার্ন, ম্যানইউ, লিভারপুলের মতো বাঘা বাঘা সব দলগুলোকে হারানোর মাধ্যমে দলকে চ্যাম্পিয়ন লিগ(২০০৭)  জিতিয়েই  সেবার ক্ষান্ত হয়েছিলেন রিকার্ডো কাকা। ঐ টুর্নামেন্টে কাকা সর্বোচ্চ ১০ টি গোল এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫ টি অ্যাসিস্ট করে।

৩.

তখনকার (২০০৭) কাকা ছিল অদম্য, অদ্বিতীয়, অতুলনীয়। তবে কাকাকে নিয়ে যত কিছুই লেখা হয় না কেন ২০০৭ এর কাকাকে নিয়ে একটু বাড়িয়ে না লিখলে সেটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। শুধুমাত্র একটি বছরের পারফর্মেন্স দিয়ে যদি কারো তুলনা করা যেত তাহলে ২০০৭ এর কাকাকে ম্যারডোনার সাথে তুলনা করলে মস্ত বড়  ভুল কিছু হতো না। ম্যারাডোনা আর্জেন্টিনা বা নাপোলিকে চ্যাম্পিয়ন করার পথে নক আউট পর্বের প্রতিটি ম্যাচে যেমন অ্যাসিস্ট করে অথবা নিজে গোল করে একক নৈপুন্যে জেতাতেন, কাকাও ২০০৭ এ মিলানকে যেভাবে চ্যাম্পিয়ন লিগ জিতিয়েছেন সেটা ম্যারাডোনার থেকে কম কিছ নয়। পাঠকরা ভাবছেন একটু বাড়িয়ে বলছি। না, মোটেই বাড়িয়ে বলছিনা। তাদের একটা পার্থক্যও আছে  যেটা বললে ক্লিয়ার হয়ে যাবে ব্যপারটা।

পার্থক্যটা এখানেই ম্যারডোনার দল ছিল একেবারে নড়বড়ে, পুচকে। এমন পুচকে দলকে চ্যাম্পিয়ন করার ইতিহাস একমাত্র ম্যারডোনারই আছে, দ্বিতীয় কারো নেই। আর কাকার দল চ্যাম্পিয়ন হবার মত যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল।

গ্রুপ স্টেজে আন্দারলেচ এর সাথে কাকার একটা হ্যাট্রিক ছিল। একটি গোল পেনাল্টি থেকে  করেছিল। আর বাকি দুটা গোলের প্লেমেকার ছিলেন কাকা নিজে। অর্থাৎ নিজেই নিজের গোলের সুযোগ তৈরি করেছিলেন কাকা। দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচ যখন ১৮০ মিনিট পেরিয়ে গোলশুন্য ড্রয়ের দিকে এগুচ্ছে তখন ইনজুরি সময়ের দুই মিনিটে মাঝমাঠ থেকে বল টেনে নিয়ে সেল্টিকের স্বপ্নভঙ্গ করেন কাকা। আমার মতে এটি কাকার করা সবচেয়ে  দৃষ্টিনন্দন দুটি গোলের একটি।

এরপর কোয়াটার ফাইনালে বায়ার্নের  ঘরের মাঠে প্রথম লেগে ম্যাচটা ২-২ গোলে ড্র ম্যাচে কাকার এক গোল, এবং দ্বিতীয় লেগে ২-০ গোলে জেতা ম্যাচে কাকার একটি অ্য্যাসিস্ট তো প্লে-মেকার ম্যারাডোনার কথাই বলে।

তবে সেমিফাইনালে ম্যানইউর সাথে দেখা যায় সেই ম্যারাডোনার মতো অপ্রতিরোধ্য কাকাকে। একদিকে  দুই পায়েই সমান খেলা ফুটবল বিশ্বে  আলোড়ন সৃষ্টি  করা ম্যানইউর রোনালদো। অন্যদিকে ‘সাদা-পেলে’ থকমা পাওয়া ফর্মের তুঙ্গে থাকা মিলানের কাকা। ফুটবলের নতুন দুজন রাজপুত্রের খেলা দেখার জন্য গোটা দুনিয়ার ফুটবল প্রেমীরা তখন পাগল হয়ে মুখিয়ে ছিলেন।

প্রথম লেগে ম্যানইউর ঘরের মাঠে রুনির ২ ও রোনালদোরর একটি গোলে হেরেছিল মিলান। তবে কাকা দুইটি মূল্যবান অ্যাওয়ে গোল করে মিলানের স্বপ্ন জিইয়ে রেখেছিলেন। ওই ম্যাচে কাকার দুইটি গোলই ছিল চোখ ধাঁধানো! কাকার দ্বিতীয় গোলটি সম্ভবত কাকার ক্যারিয়ারের সেরা গোল। দ্বিতীয় গোলটি এমন সুন্দর একটি গোল ছিল যা নিয়ে লেখার যোগ্যতা আমার নাই।  কিন্তু ম্যাচের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে

তার প্রথম গোলটিকেই বেশি নম্বর দিতে হবে। কারণ, তখন ১-০ গোলে পিছিয়ে ছিল তার দল। সির্ডফ যখন কাকাকে বলটি পাস দেব কাকা তখন ডি বক্স থেকে আট-দশ গজ দূরে।  হেইঞ্জ কিছু বুঝে উঠার আগেই কাকা বলটি পাওয়া মাত্রই বলকে প্রথম ধাক্কায় সামনে বাড়িয়ে দেয়। কাকার গতির কাছে হেইঞ্জকে পরাস্ত হতে হয়। কাকা ড্রিবলিং করা শুরু করলে ভাষ্যকার,  ‘কাকা এক্সিলারেটিং অ্যাওয়ে ফ্রম হেইঞ্জ’ -কথাটি শেষ করতে যতক্ষণ সময় নিয়েছেন কাকা তারও আগে ড্রিবলিং করা অবস্থাতেই বলকে বাম প্রান্ত থেকে কোনাকোনি শট নেন। এবং ডান কোনা দিয়ে বল মাটি ঘেঁষে যখন জালে জড়ায় তখন গোল কিপারের কিছুই করার ছিলনা। গোল ঠেকাতে অন্য একজন ডিফেন্ডার  অবশ্য স্লাইড দিয়ে বৃথা চেষ্টা করেছিলেন।

ওই ম্যাচে ৩-২ এ হারার পরে ফিরতি লেগে ঘরের মাঠে বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় ৩-০ গোলে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে হারিয়ে ফাইনালে পা রাখে কাকার মিলান।

ঠিক দুবছর আগে মানে ২০০৫ এ যাদের কাছে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ সেই লিভারপুল। তবে এবার আর কোন ভুল হয়নি তাদের। ফাইনালে লিভারপুলের বিপক্ষে ২-১ এ জেতা  ম্যাচটিতেও কাকার একটি অ্যাসিস্ট ছিল। একজন প্লে-মেকার হিসেবে কাকার এই পারফরমেন্সকে তো কেবল ডিয়েগো ম্যারাডোনার সাথেই তুলনা করা যায়! বিশেষভাবে সেল্টিক আর ম্যানইউর সাথে কাকার পারফর্মেন্সটাই ম্যারডোনার কথা বারবার মনে করিয়ে দেয়। ম্যারাডোনাযেই ভাবে তার দলকে একক ভাবে উদ্ধার করতেন, কাকাও ওই দুই ম্যাচে সেভাবেই মিলান কে উদ্ধার করেছিলেন। শুধু উদ্ধার করেই থামেননি মিলানের এই বরপুত্র। ম্যারাডোনার মতোই দলকে শিরোপা এনে দিয়েই তবে ক্ষান্ত হয়েছিলেন ব্রাজিলীয় সুপারস্টার  রিকার্ডো কাকা।

ম্যারাডোনার ফাইনাল খেলা থেকে বেশি আলোচিত গয়  সেমি ফাইনালে ইংল্যান্ড এর বিপক্ষে করা পারফর্মেন্সটির। কাকার ক্ষেত্রেও এরকম, কাকার ফাইনাল খেলার চেয়ে ম্যানইউর বিপক্ষে খেলাটি নিয়েই বেশি আলোচনা হয়। তাছাড়া ৮৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে ম্যারাডোনা যেভেবে ডিফেন্সছেড়া পাস দিয়ে জয়সূচক গোলটি করান। কাকাও তেমনিভাবে পাস দিয়ে মিলানের জয়সূচক গোলটি করান। কাকার পাসটা যেন ম্যারাডোনার পাসের কার্বন কপি ছিল। পেলে বাদে ম্যারাডোনার সাথে তুলনা করার মত খেলোয়াড় পৃথিবীতে এখনো আসেনি। আমি শুধু কাকার ২০০৭ এর পারফর্মেন্সটা বোঝাতে ম্যারাডোনার উদাহরণ দিয়েছি।

২০০৭ সালের সেই অসামান্য পারফর্মেন্স এর ফলেই সেই মৌসুমে তিনি ‘ব্যালন ডি অর’সহ ফুটবলের প্রায় সবকটি পুরষ্কার জিতেছিলেন। সে বছরই কাকা ‘ব্যালন ডি অর’ পুরষ্কার  জিতেন  বর্তমান সময়ের দুই সেরা ফুটবলার মেসি ও রোনালদোকে হারিয়ে। কাকা পেয়েছিলেন ৪৪৪ পয়েন্ট, যেখানে দ্বিতীয় স্থানে থাকা রোনালদোর পয়েন্ট ছিল ২৭৭ আর তৃতীয় অবস্থানে থাকা মেসির পয়েন্ট ছিল ২৫৫।

পরের মৌসুমে কাকা মিলানের হয়ে উয়েফা সুপার কাপ জেতেন  যেখানে ফাইনাল খেলায় কাকার একটি গোল ছিল। সেবছরই তিনি ‘ফিফা ক্লাব ওয়ার্ল্ড কাপ’ জয় করেন মিলানের হয়ে। সেই টুর্নামেন্টের ফানালেও একটি গোল করেন মিলানের এই

বরপুত্র। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে তিনি ‘গোল্ডেন বল’ পুরষ্কারটিও জেতেন।

এসি মিলানের হয়ে জিতেন ১টি সিরি-এ, ১টি ইতালিয়ান সুপার কাপ, ১ টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ১টি উয়েফা সুপার কাপ ও ১টি ফিফা ক্লাব ওর্য়াল্ড কাপ। মিলানের হয়ে প্রথম দফায় সব ধরনের প্রতিযোগিতায় ২৭১ ম্যাচে ৯৬ গোল ও ৫৬ টি অ্যাসিস্ট করেন কাকা।

৪.

এরপরে রিয়াল মাদ্রিদ তিন বারের চেষ্টায় কাকাকে ৬৮ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে কিনে নেয়। কাকাকে মনে প্রাণে ভালবেসে ফেলেছিল মিলান সমর্থকরা। কাকাকে বেচে দেয়াতে মিলান সমর্থকরা ক্ষেপে গিয়েছিল। কিন্তু মিলানের প্রেসিডেন্ট তাদের জানায় ক্লাব এর অর্থ  সংকটে ছিল। ক্লাবকে বাঁচাতেই তাদের কাকাকে বিক্রি করতে হয়েছিল।

ফুটবলের দুই নয়া রাজপুত্র কাকা আর রোনালদোকে ঘিরে রিয়াল মাদ্রিদ স্বপ্নের বীজ বুনেছিল। কিন্তু  ইনজুরি কারণে রিয়াল মাদ্রিদে তার সময়টা ভালো যায়নি। বেশির ভাগ সময় তাকে কাটাতে হয়েছিল সার্জনের কাঁচিরর নিচে।ফলে মিলানের সেই ক্ষুরধার কাকাকে কখনো আর ফিরে পায়নি রিয়াল মাদ্রিদ।

যাহোক, ইনজুরি কাটিয়ে যখন  ২০১১-১২ তে ফিরে আসে কাকা তখন মেসুত ওজিল তার ফর্মের তুঙ্গে ছিলে বিধায়  দলে কাকার তেমন একটা সুযোগ হতোনা। মাঝে মাঝে যে কয়েকটা ম্যাচে সুযোগ হত, সেগুলোতে কাকার পারফর্মেন্স কাকাসুলভ ছিলনা। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ১২০টি ম্যাচে মাত্র ২৯টি গোল  ও ৩২ অ্যাসিস্ট  করেন তিনি। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে  কাকা গোল করেছে এমন প্রতিটি ম্যাচেই রিয়াল জিতেছে। রিয়ালের হয়ে ১টি লা লিগা, ১টি কোপা দেল রে আর ১টি স্প্যানিশ সুপার কাপ ছাড়া আর কিছু জিততে পারেননি কাকা।

৫.

রিয়ালে ব্যর্থ সময় পার করার পরে  ২০১৩ সালে আবার তিনি মিলানে প্রত্যাবর্তন করেন। কিন্তু মিলানে এসেই এক ম্যাচ খেলার পরই তাকে আবার ইনজুরিতে পরতে হয়। ইনজুরি থেকে ফিরে আর আগের মতো জ্বলে উঠতে দেখা যায়নি কাকাকে।  সেই মৌসুমে মিলানের হয়ে ৩৭ টি ম্যাচ খেলে গোল করেন মাত্র ৯ টি।

এরপরে আবার তিনি সাও পাওলোতে ধারে যোগ দেব। এবং দ্বিতীয় দফায় সাও পাওলোর হয়ে ২৪ ম্যাচখেলে ৩ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট করেন। এরপরে ২০১৫ তে কাকা চলে যান আমেরিকার মেজর লিগ সকার  খেলতে  অরলান্ডো সিটিতে যোগদান করেন। এবং সেখানেই তার ১৬ বছরের ফুটবল ক্যারিয়ারের ইতি টানেন।

৬.

ব্রাজিল দলে কাকার অভিষেক হয় ২০০২ সালে বলিভিয়ার বিপক্ষে একটি ফ্রেন্ডলি ম্যাচে। ২০০২ বিশ্বকাপে তারকায় ঠাসা ব্রাজিল দলেও তার সুযোগ হয়েছিল। গ্রুপ স্টেজে ব্রাজিল দলের হয়ে  কোস্টারিকার বিপক্ষে ১৭ মিনিট খেলেছিলেন তিনি। ২০০৫ সালে ব্রাজিলের হয়ে কাকা কনফেডারেশন কাপ জিতেন যেখানে ফাইনাল ম্যাচে তার একটি গোল ছিল। ২০০৬ বিশ্বকাপে কাকা ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ১টি গোল করে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হন। পরে অবশ্য কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলকে হারতে হয়েছিল জিদানের ফ্রান্সের কাছে।

২০০৯ সালের কনফেডারেশন কাপ জিতে ব্রাজিল ব্রাজিলের যেখানে  ফাইনালে যুক্তরাষ্ট্রেকে ৩-২ গোলে হারানো ম্যাচের ম্যান অব দ্য ম্যাচ হন কাকা এবং টুর্নামেন্টের সেরাও হন তিনি।

২০১০ বিশ্বকাপে মেসি রোনালদোর সাথে সেরা তিনজন খেলোয়ারের একজন ছিলেন কাকা। হয়েছিলেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ অ্যাসিস্ট মেকার (৪টি)। শেষ আটে নেদারল্যান্ডসের কাছে হেরে সেই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছিল ব্রাজিল। ব্রাজিলের হয়ে ৯২ ম্যাচে ২৯ গোল ও ২৫ অ্যাসিস্ট করেন রিকার্ডো কাকা।

৭.

কাকা যদি ইনজুরির কবলে না পড়তেন, হয়তো মেসি-রোনালদোর ব্যালন ডি অর জয়ে একক আধিপত্য থাকতোনা। ২০০৭ এ কাকা ব্যালন জেতার পরে মেসি-রোনালদো যে একটানা নয়টি ব্যালন ডি অর জিতেছে অন্তত তার একটিতে হলেও কাকা ভাগ বসাতো।

বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়ন লিগ, ব্যালন ডি অর থেকে শুরু করে কি ছিলনা কাকার অর্জনের তালিকায়! হালের সেরা ফুটবলার মেসি বা রোনালদোর কেউই কখনো বিশ্বকাপ ছুয়ে দেখতে পারেনি। ফুটবলের দুই শিল্পী  জাভি, ইনিয়েস্তা কখনো ব্যালন ডি অর জিততে পারেনি। ইব্রাহিমোভিচেরও কখনো চ্যাম্পিয়ন ট্রফি জেতা হয়নি। কিন্তু কাকার অর্জনে এর কোন কিছুই বাদ নেই। তাই কাকাকে তো ফুটবলের সর্বজয়ী রাজপুত্র তো বলাই যায়।

যিনি বিদায় বেলায় অশ্রুসিক্ত নয়নে নিজে কাঁদতে পারেন, কাঁদাতে পারেন ফুটবল দুনিয়ার অসংখ্য-অগণিত ফুটবল প্রেমীদের, তিনি দুঃখীও বঠে। ফুটবলইতিহাসে হয় তো কাকার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবেনা। কিন্তু সর্বজয়ী কাকা  তার সময়ের ফুটবল প্রেমীদের মনের মণিকোঠায় একজন দুঃখী রাজপুত্র হয়েই বেঁচে থাকবেন চিরকাল।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।