কাজল রয়েছে নয়নে নয়নে

স্কুলে পড়াশোনা করা অবস্থায় একটা বাচ্চা মেয়ে যদি সিনেমাতে কাজ শুরু করে, তাও আবার প্রধান নারী চরিত্রে একদম নাচ গানওয়ালা কমার্শিয়াল সিনেমাতে – তাহলে কি তার বাবা মা থেকে শুরু করে পাড়া প্রতিবেশী আর আত্মীয়স্বজন একটু হলেও ভ্রূ কুঁচকাবেন না?

কিন্তু তার ক্ষেত্রে এমনটা হয়নি মনে হয়, কেউ এতটা দৃঢ়ভাবে ভ্রূ কুঁচকায়নি, কারণ যাদের ‘প্রধানত’ ভ্রূ কুঁচকানোর কথা – তারা নিজেরাই অর্থাৎ মেয়ের বাবা মাই ছিলেন রুপালি জগতের বাসিন্দা। বাসিন্দা হয়েও খুব একটা লাভ হল না, মেয়ের প্রথম সিনেমা ‘বেখুদি’ বক্স অফিসে ফ্লপ হিসেবে নাম লেখাল। মেয়ের জীবন শুরু হল ফ্লপ দিয়ে।

আব্বাস মাস্তান নামের দুই ভাই সিনেমা বানাবেন, এমন কিছু তারা দেখাতে চাচ্ছিলেন যেটা বলিউড এর আগে দেখে নাই, যেখানে নায়কই খলনায়ক। নায়িকা চরিত্রে প্রথমে শ্রীদেবিকে নেয়ার কথা ভাবছিলেন – কিন্তু স্ক্রিপ্টে শ্রী দেবীকে মেরে ফেলার কথা ছিল। তখনকার এই জনপ্রিয় নায়িকাকে স্ক্রিনে মেরে ফেলার এত বড় রিস্ক এই দুই ভাই নিয়ে চাচ্ছিলেন না। নতুন একজন নায়িকা নিলেন শিল্পা শেঠী নামের, শিল্পার বোনের চরিত্রে নিলেন সেই ফ্লপ দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করা মেয়েকে!

সমস্যা শেষ হয়নি তখনো, এই ধরনের অ্যান্টি হিরো রোলে কেউ কাজ করতে চাচ্ছিলেন না, এই রোল একে একে ফিরিয়ে দিলেন সালমান খান, তার ভাই আরবাজ খান, অক্ষয় কুমার, অনিল কাপুরের মত স্টাররা। সিনেমা না করার আরেকটা কারণ ছিল, একদম নতুন নায়িকা, যে আবার ক্যারিয়ার শুরু করেছেন ফ্লপ দিয়ে, তার উপরে চেহারাতে তেমন ‘জৌলুশ’ নেই।

নতুন নায়িকার বিপরীতে অবশেষে আসলেন আরেকজন নতুন ছেলে, যাকে দেখে সেই মেয়ের প্রথম রিঅ্যাকশন ছিল, ‘এই ছেলে নায়ক! এই শ্যামলা চিকন ছেলেটা? ওহ গড!’ কে জানত এই শ্যামলা চিকন শাহরুখ নামের ছেলেটার সাথে তার জুটিকে পাবলিক অন্ধের মত ভালবাসবে!

‘বাজিগর’ নামের সেই সিনেমা সুপারহিট, তার সাথে হিট এই দু’জন নতুন ছেলেমেয়ে, রাতারাতি সুপারস্টার। রাতারাতি সুপারস্টার হওয়া মেয়েটা আবার রাতারাতি ব্যর্থতার স্বাদ পেলেন পরের দুইটা সিনেমা দিয়ে, এরপরে সাফল্য আসল আবার সেই ‘শ্যামলা আর চিকন’ ছেলেটার সাথে কাজ করে, এবার অবশ্য সাথে সালমান খানও ছিল – সিনেমার নাম ‘করণ অর্জুন’।

আবার ব্যর্থতা, আবার সেই শ্যামলা ছেলেটার সাথে এই শ্যামলা মেয়ে। ততদিনে এই দুইজনের জুটি সেইরকম হিট। ১৯৯৫ সালের ২০ অক্টোবর এমন এক সিনেমা করলে এই দুইজন, যেই সিনেমা কোটি মানুষকে ভালবাসতে শিখাল এবং যেই সিনেমা মুক্তির পর থেকে এখনও একটি সিনেমা হলে তিন বেলা চলছে। সিনেমার নাম দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে – যেটাকে ফ্যানরা সংক্ষেপে বলেন ‘ডিডিএলজি’।

১৯৯৫ তার জন্য আরেকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ বছর, এই বছর তিনি আরেক ‘শ্যামলা’ ছেলের প্রেমে পড়েন, সিনেমাতে নয় – বাস্তবে। ছেলের নাম অজয় দেবগন। মজার ব্যাপার হল, ছেলেকে প্রেমের প্রস্তাব তিনি নিজেই করেছিলেন। বিয়েটা তখনো হয়নি, তার আগে নিজেকে আরেকটু প্রমাণ করা বাকি ছিল তার। এতদিন যেখানে সবাই বলত – শাহরুখ এর জন্যই তুমি হিট, সেই কথার ঝাঁজটা একটু কমানোর জন্য এমন দুটো পারফর্মেন্স করলেন – যেটা দেখে সবাই বলতে বাধ্য হল যে তিনি আসলেই কতটা অসাধারণ অভিনেত্রী।

‘গুপ্ত’ সিনেমাতে নেগেটিভ রোল আর দুশমন সিনেমাতে নিজের ডবল রোলের আগে নারীকেন্দ্রিক ডবল রোল খুব কম হয়েছিল আর তার মত এরকম দুর্দান্ত পারফর্মেন্স তো অবশ্যই কম হয়েছিল! পারফর্মেন্স এরপরে আরও ভালো ছিল, দিনদিন সাফল্যের গ্রাফটা তরতর করে উপরে উঠছিল। সালমানের সাথে পেয়ার কিয়া তো ডারনা কিয়া সিনেমার একটা দৃশ্যে সালমানের মা সেজে অভিনয় করা থেকে শুরু করে কুচ কুচ হোতা হ্যায় তে মা না হয়েও রানীর মেয়ে অঞ্জলিকে নিজের মেয়ের মত দেখা – সব ধরনের চরিত্রেই তিনি প্রাণ এনে দিতেন।

অত:পর ১৯৯৯ সালে ভালোবাসার মানুষটির সাথে বিয়ের মালা বদল। টানা দু’মাস ধরে হানিমুন উদযাপন! এরপরে দুইজনের একসাথে সিনেমা – একসাথে সাফল্য আর ব্যর্থটাকে সামাল দেয়া। ২০০১ এ আবার শাহরুখ এর সাথে সিনেমা, পরিচালকের আসনে পুরনো বন্ধু করন জোহর। সাথে অমিতাভ, জয়া আর ঋত্বিক কারিনা। জীবনের ক্ষণিক আনন্দ আর ক্ষণিক বেদনার সাথে নাম মিল রেখেই যেন সিনেমার নাম ‘কাভি খুশি কাভি গাম’।

২০০১ সালে ঘোষণা দিলেন, সিনেমা থেকে সাময়িক বিরতি নিবেন, কারণ একটাই – পরিবারকে সময় দেয়া। তবে একদম বিরতি নেন নি, ভালো স্ক্রিপ্ট পেলেই কাজ করেছেন। প্রমাণ ২০০৬ সালে আমির খানের বিপরীতে ‘ফানা’। পরিচালক কুনাল কোহলি যখন এই সিনেমার স্ক্রিপ্ট আমির খানকে শুনাচ্ছিলেন, তখন আমিরকে তিনি জিজ্ঞেস করেন – এই সিনেমাতে আপনি যাকে বলবেন আমরা তাকেই নায়িকা নিব, তিনটা চয়েস বলেন।

মিস্টার পারফেকশনিস্ট বললেন- আমার তিনটা চয়েস হল- কাজল, কাজল এবং কাজল!

কাজলকে নিয়ে যতই বলব ততই কম বলা হবে। আজকে তিনি যেই জায়গায় আছেন – পুরোটা তার মেধার জোরে। তার মুখের প্রতিটা পেশি থেকে তার এক্সপ্রেশন যেন ঠিকরে বের হয়। আর সাথে বড় দুইটা এক্সপ্রেসিভ চোখ তো আছেই! সাধারণত হিন্দি সিনেমাতে নায়িকাদের রোল থাকে শুধুই শো পিস টাইপ, এখানেই কাজল আলাদা।

স্ক্রিপ্ট পছন্দ না হলে তিনি কাজ করেন না। সিনেমাতে নায়ক যেই হোক, শাহরুখ বা আমির- সেখানে কাজলের ক্যারেক্টারের আলাদা একটা গভীরতা এবং প্রাধান্য থাকবেই- এই কারণেই হয়ত এত বছর পরেও তার এত চাহিদা – যেটা আইটেম সং ওয়ালিদের নেই।

নিজের অভিনয় নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি জাস্ট ক্যারেক্টারের ইমোশনকে নিজের ভিতরে ফিল করার চেষ্টা করি। ‘মাই নেম ইজ খান’-এ আমার একটা সিন আছে, আমার ছেলে মারা গেছে আর আমি তার লাশ জড়িয়ে ধরে ‘কাম ব্যাক’ বলে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে কান্না করছি। করন আমাকে বলেছিল তুমি নিজের মত করে করো। বিয়ের পর আমি যখন প্রথম মা হই, আমার সেই সন্তানটা বাঁচেনি, সন্তান হারানোর কষ্টটা তাই আমার জানা। সেই কষ্টটা মনে করার চেষ্টা করলাম, দেখলাম কিছুতেই চোখের পানি আটকাতে পারছি না, এমনকি করন নিজেও কান্না করে দিসে আমার অভিনয় দেখে! করনকে দিয়ে কিচ্ছু হবেনা!’

প্রথম সন্তানকে হারালেও এখন তিনি দুই সন্তানের গর্বিত মা। যত ব্যস্তই থাকুন না কেন- সন্তানের যত্নের দিকে তার নজর থাকে সর্বক্ষণ। যদিও মা হিসেবে নিজের কিছু দুর্বলতা তিনি অকপটে প্রকাশ করেন, ‘আমি রান্না করতে পারি না, একেবারেই না, এমনকি এক কাপ চাও না। আমার সন্তানেরা বড় হয়ে কখনো কাউকে বলতে পারবে না, আহ! আমার মায়ের হাতের রান্না যা ছিল না!’

অনেকের সাথে অভিনয় করলেও, শাহরুখ এর সাথে তিনি যখন ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান- তখন যেন দুনিয়ার সব কিছু থেমে যায়। এই দুইজন যখনই একসাথে পর্দায় এসেছেন, তখনই বক্স অফিসে অঢেল পয়সা এনেছেন আর সাধারণ মানুষের অঢেল ভালোবাসা নিয়ে গেছেন। বলিউডের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জুটিও বলা যায় তাঁদের নির্দ্বিধায়।

দু’জন এখনও ছয়মাস পরপর মারাঠা মন্দিরে গিয়ে দর্শকের সাথে ডিডিএলজি দেখেন। শাহরুখ এর সাথে আপনার যেই কেমিস্ট্রি,এই জেনারেশনে সেরকম আর কাকে দেখেন? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই রণবীর আর দীপিকা। ওদের মধ্যে একটা ম্যাজিক আছে।’

‘মাই নেম ইজ খান’-এর পাঁচ বছর পর তিনি আবার কামব্যাক করছেন, সেই শাহরুখ এর সাথে। সিনেমার নাম ‘দিলওয়ালে’। যদিও সিনেমা নিয়ে খুব একটা আশাবাদী ছিলেন না, কারণ পরিচালকের নাম রোহিত শেত্তি যিনি গাড়ি না উড়ানো পর্যন্ত শান্তি পান না। দেখা যাবে কাজল এক গাড়িতে করে উড়ে যাচ্ছেন, আরেক বাসে শাহরুখ উড়ছেন! তারপরেও শাহরুখ কাজল বলে কথা- ছোটবেলা থেকে এই জুটির মাঝে এতটাই বুঁদ হয়ে আছি যে এখনও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে এরা স্বামী স্ত্রী নন- কাবাবের মাঝে গৌরি খান আর অজয় দেবগন বলে আসলেই দুইটা হাড্ডি আছে!

বলিউডে প্রিয় অভিনেত্রী বললে এখনো সবার আগে আপনার নাম মুখে চলে আসে এই কারিনা, ক্যাটরিনা আর আলিয়াদের যুগেও, হয়ত এখনও ‘সেকেলে’ রয়ে গেছি তাই, অথবা এখনও শরীর প্রদর্শনকারীদের ভিড়ে আমি একজন অভিনেত্রীকে খুঁজি – তাই। কারণ যেটাই হোক, আপনার প্রতি ভালোবাসা কখনোই কমবে না। কাজল নামক বস্তুটা মানুষের চোখে থাকে, আপনিও আমার চোখেই লেগে থাকবেন সবসময় আপনার কাজের দ্বারা – নয়ন আপনাকে পায় দেখিতে, কারণ রয়েছেন আপনি নয়নে!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।