একজন মায়ের গল্প

.

– অপরিচিত কিংবা অল্প পরিচিত কেউ কিছু খাবার জিনিস দিলে খাবে না, অন্য কিছু দিলেও নিবে না। দেখা যাবে ভুলিয়ে ভালিয়ে তোমাকে নিয়ে কারো কাছে বিক্রি করে দেবে। তখন কান্নাকাটি করলেও আমাদের আর পাবে না।

খুব ছোট বেলায় বাবা মায়ের কাছ থেকে এমন উপদেশ পায় নি এমন ছেলে মেয়ের সংখ্যা বিরল। আমি নিজেও পেয়েছি এবং সেই সময়ে অক্ষরে অক্ষরে সেটা পালন করেছি।

আমাদের পরিবারে লোকজন ছিল অনেক। বাবা, মা, এক চাচা, এক ফুপু, এক মামা ছাড়াও প্রায় প্রতিদিনই গ্রাম থেকে মানুষজন আসতোই। গ্রাম কিছুটা অনুন্নত থাকায় সেখান থেকে শহরে আসলে অনেকের দুপুরের খাওয়া কিংবা মাঝে মাঝে রাতের বেলা থাকাটাও আমাদের বাসাতেই হতো। পরিবারের সবাই হয়তো অনেক মিশুক প্রকৃতিরও ছিল। কারণ পুরো মহল্লার মানুষ সন্ধ্যে হলেই আমাদের বাসায় আড্ডা দিতে বসে যেত। মোট কথা আমার শৈশবটা ছিল মানুষজনের আদর আর হৈ হুল্লুড়ে ভরপুর। এর মাঝে বাইরের মানুষের সাথে কথা বলার প্রয়োজন কিংবা সুযোগ কোনটাই ছিল না। কাজেই এত জনের নজর এড়িয়ে বাইরের মানুষ আমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে চলে যাবে এমন সম্ভাবনাও অনেক কম ছিল।

তবে ক্লাস টু/থ্রিতে পড়া একটা বাচ্চার ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক ছিল। আমিও ভয় পেলাম, গ্রাম থেকে আসা আত্মীয় স্বজনদের মাঝেও কেউ আদর করে কাছে ডাকলে যেতাম না, চকলেট কিংবা অন্য কিছু দিতে চাইলে তো কাছে যাবার প্রশ্নই উঠতো না। চকলেট দিয়ে ভুলিয়ে ভালিয়ে আমাকে বিক্রি করার ধান্দা, বোকা পেয়েছে আমাকে!

কিন্তু এর মাঝে সমস্যা হয়ে গেল আরেকটা। আমাদের দুই বাড়ি পরেই একটা পুরোণ ভাঙ্গা বাড়িতে খোলা জায়গার মতো ছিল। আমি সেখানে খেলতে যেতাম, একটা বন্ধু থাকতো সেই বাড়ির একটা ঘরে। সমস্যা বন্ধুকে নিয়ে না, সমস্যা বন্ধুদের সাথে আরেকটা ঘরে থাকা একজন মহিলাকে নিয়ে।

২.

কোন মানুষকে কুৎসিত বলা উচিত না কিন্তু এই মহিলা কে দেখলেই আমার কেন যেন ভয় লাগতো। চেহারাটা হয়তো একটা কারণ ছিল; কালো আর একটু মোটা ধাচের, সামনের দাত দুটো কিঞ্চিত উঁচু। হাসি দিলে তাকে আরো ভয়ানক লাগতো আর কেন যেন আমাকে দেখলেই একটা হাসি দিত। উনার স্বামী বিদেশে থাকতেন। ওই বাড়িতে গেলেই নানা কায়দায় উনি আমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করতেন। দেখলেই জড়িয়ে ধরে চুমু দেবার চেষ্টা করতেন। উনার স্বামী নাকি বিদেশ থেকে চকলেট পাঠাতেন, সেটা আমাকে দেবার চেষ্টা করতেন। সেই মহিলাকে এড়ানোর উপায় ছিল না, যে জায়গায় খেলতাম তার সাথেই উনার ঘরের জানালা। আমি একটা পর্যায়ে ভয়ে সেই বাসায় যাওয়াই বন্ধ করে দিলাম।

তবে একটা সময় সমস্যার সমাধান হলো। মহিলা সেই বাড়ি ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে চলে গেলো। উনার স্বামী নাকি দেশে ফিরে এসেছেন, গ্রামে গিয়ে কিছু একটা করবেন। যাবার দিন সবার সাথে দেখা করতে আসলো। আমাদের বাড়িতে এসে বিদায় নিতে গিয়ে কেদেই ফেললেন। কাউকে কাদতে দেখলে আমার মন খারাপ হয়ে যায়, কিন্তু উনাকে কাদতে দেখে আমার মন ভালো হয়ে গেলো। আপাতত আপদ তো বিদেয় হলো, এখন নির্বিঘ্নে সেই বাড়িতে গিয়ে খেলা যাবে।

আমি আবার আগের জীবনে ফিরে গেলাম। সময় বয়ে গেল। একটা সময় বাবা আরেক এলাকায় নিজেদের বাড়ি করলেন, আমরা সেই এলাকা ছেড়ে নতুন এলাকায় চলে আসলাম। সেই মহিলার কথা ভুলেই গেলাম।

উনার সাথে আবার দেখা হলো প্রায় ২৫ বছর পর।

.

আমি সচরাচর দাওয়াত টাওয়াতে যাই না, সময় পাই না। কিন্তু সেই পুরোণ এলাকার একটা দাওয়াতে বাধ্য হয়ে যেতে হলো। অনেক দিনের সম্পর্ক, না গেলে খারাপ দেখা যায়। যাওয়ার পর দেখি হুট করে এক ভদ্রমহিলা আমার কাছে এসে খুব আন্তরিক ভঙ্গিতে কথা বলছে।

কেমন আছি, কি করছি, বিয়ে কবে করেছি, বাচ্চা কয়টা, বউ কি করে – এমন আরো অনেক প্রশ্ন। সাথে থাকা দুইটা ছেলেকেও বললো যে আমি ওদের বড় ভাই। আন্তরিক ভঙ্গিতে কেউ কোন কথা বললে তাকে চিনিনা বলা বিব্রতকর। তবে পেশাগত জীবনে পছন্দ না হলেও অনেকের সাথে পেশার খাতিরে হাসিহাসি মুখ নিয়ে কথা চালিয়ে যেতে হয়। এই অভ্যেস থাকার কারণেই আমিও বেশ ভালোভাবেই উনাকে চিনেছি এমন ভঙ্গীতে কথা চালিয়ে যেতে লাগলাম।

উনি চলে যাবার পর আমার ফুপুর কাছে জানতে পারলাম যে উনিই সেই ভদ্রমহিলা যাকে আমি ছোটবেলায় ভয় পেতাম।

শুনতে পারলাম ভদ্রমহিলা আসলে নিঃসন্তান। এজন্য ছোট বাচ্চাদের প্রতি তার মায়া অনেক বেশি। সাথের থাকা বাচ্চা দুটো পালক নিয়েছে। ছোট সব বাচ্চাকেই আদর করতো। আমাকে আদর করার কারণটাও সেটাই ছিল। শুধু শুধু উনাকে ভয় পেতাম।

মা না হয়েও আরেকজনকে সন্তানসম স্নেহ করা সম্ভবত একজন নারীর পক্ষেই সম্ভব। সেই অল্প বয়সে আমার পক্ষে বুঝতে পারা সম্ভব ছিল না যে একজন মায়ের আদরকে আমি অবহেলায় ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছি।

ঘটনাটা শুনে সেই মূহুর্তে ২৫ বছর আগের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।

.

মাতৃত্ব নারীদের একটা স্বকীয়তা। এই জায়গাটাতে পুরষদের কোন জায়গা নেই। কিন্তু কেন জানি উপরওয়ালা অনেক নারীকে মা হবার স্বাদ দেখে বঞ্চিত রেখেছেন। অথচ শারীরিক ভাবে মা হতে না পারলেও মাতৃত্ববোধটা প্রকৃতিগত ভাবেই হয়তো তাদের ভেতর রয়ে গিয়েছে। এই নারীদের কষ্ট বুঝার সাধ্য কারো নাই, তবে অবাক হই যখন আশে পাশের অনেক মানুষদেরকে এই সব নারীদের নিয়ে কটুক্তি করতে দেখি। বাঁজা, বন্ধ্যা – আরো কত রকম উপাধি। এর চেয়েও বড় বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে এই উপাধি দানকারী মানুষগুলোর বেশিরভাগই আরেকজন নারী।

তাদের কষ্ট লাঘব করার ক্ষমতা আমাদের হাতে নেই। সেটা একমাত্র সৃষ্টিকর্তার হাতেই আছে। আমরা যে কাজটা করতে পারি সেটা হচ্ছে তাদের কষ্টের জায়গাটাকে খুঁচিয়ে আরো ব্যাথা দেবার পরিশ্রমটা না করা।

এই মা দিবসটা সেই সব অসহায় নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা আর এই অল্প মমত্ববোধের প্রদর্শনটুকুই না হয় হোক।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।