তবুও সবাই তাঁর ভক্ত

বাংলাদেশি দর্শকদের মাঝে টেলিভিশন নাটক বেশ ভালোভাবেই হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। সাংস্কৃতিক জগতের অন্যতম সেরা মাধ্যম হচ্ছে এই টিভি নাটক। নাট্য অভিনয়শিল্পীরাও নিজেদের মেধা ও প্রতিভায় বিশেষ জায়গা করে নেন দর্শকদের কাছে, এদের মাঝে কেউ কেউ হন অত্যন্ত প্রিয়।

তিনি তাদেরই একজন। টিভি নাটকের ইতিহাসে তিনি অনন্য, নিজ প্রতিভায় সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন নাট্যাঙ্গনে। শহরের উঁচু দালানের বেড়াজাল পেরিয়ে তাঁর জনপ্রিয়তা পৌঁছেছে গ্রামের কুঁড়েঘর পর্যন্ত। তাঁর মত জনপ্রিয়তা খুব কম অভিনয়শিল্পীই পেয়েছেন।

এমনও কথা প্রচলিত আছে বিষন্ন মনে আপনি তাঁর নাটক দেখতে দেখতে মনের অজান্তেই পুলকিত হয়ে যাবেন। দর্শকদের মাঝে প্রতিষ্টা পেয়েছে তাঁর বেশ ভক্তকূল, যারা তাদের এই প্রিয় অভিনেতাকে গুরু মানেন।তিনি বাংলা নাট্যঙ্গনের অন্যতম সেরা জনপ্রিয় অভিনেতা মোশাররফ করিম।

তরুণ বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি যুক্ত হন থিয়েটারে। সেই সুবাদেই ১৯৯৯ সালে আবুল হায়াতের ‘অতিথি’ নাটকে ছোট্ট চরিত্র দিয়ে টিভি নাটকে প্রবেশ করেন। এরপর বেশ প্রতিকূল অবস্থা দিয়ে গেছেন। ছোট ছোট চরিত্র করেছেন, অচেনাই থেকে গেছেন দর্শকদের মাঝে।

অবশেষে তিনি নজরে পড়েন তখনকার সবচেয়ে জনপ্রিয় নির্মাতা মোস্তফা সারোয়ার ফারুকীর। তাঁরই নির্মিত ২০০৪ সালে ‘ক্যারাম’ নাটকে অভিনয় করেই প্রথমবারের মত আলোচনায় আসেন। এই নাটকে তাঁর অভিনয়ে সবাই মুগ্ধ হয়েছিল। প্রথমটির সাফল্যে পরবর্তীতে দ্বিতীয় কিস্তিও বের হয়।

এরপর ‘অত:পর নুরুল হুদা‘র পর ২০০৭ সালে ‘ভবের হাট’, ‘কবি বলেছেন’, ‘চাঁদের আলোয় কয়েকজন যুবক’, ‘ঘর কুটুম’ আর সঙ্গে ‘দারুচিনি দ্বীপ’ সিনেমায় অনবদ্য অভিনয়ের সুবাদে নিজেকে আরো সুপরিচিত করে তুললেন। ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন সময়ের অন্যতম ব্যস্ত অভিনেতা।

মোশাররফ করিম জনপ্রিয়তার শীর্ষে আসেন ২০০৮ সালে। ফারুকীর ‘৪২০’ ধারাবাহিক নাটকে অসাধারণ অভিনয়ের সুবাদে দর্শককূলে তাঁর প্রতি যে আস্থা সৃষ্টি হয়, সেটার প্রতিফলন ঘটে ‘ঠুঁয়া’, ‘দেয়াল আলমারি’, ‘বনলতা সেন’, ‘ছাইয়া ছাইয়া’, ‘ফ্লেক্সিলোড’, ‘পাত্র চাই’, ‘বন্ধু এবং ভালোবাসা’ থেকে বছরের শেষে ‘হাউজফুল’ ধারাবাহিকের ব্যাপক জনপ্রিয়তায়।

 

তাঁর ক্যারিয়ারের আরেকটি জনপ্রিয় নাটক ‘হ্যালো’,যেটা তিনি নিজে লিখেছিলেন। এরপর একে একে অভিনয় করেন ‘সাকিন সারিসুরি’, ‘তোমার দোয়ায় ভালো আছি মা’, ‘এফ এন এফ’, ‘মাইক‘, ‘দেনমোহ ‘, ‘বিহাইন্ড দ্য ট্র‍্যাপ’, ‘জিম্মি’, ‘চাঁদের নিজস্ব কোনো আলো নেই’, ‘কাঁটা’, ‘জিম্মি’, ‘উচ্চ মাধ্যমিক সমাধান’, ‘আমি হিমু হতে চাই‘, ‘জর্দা জামাল’, ‘সেই রকম চা খোর’, ‘খেলা’, ‘রেডিও চকলেট’, ‘তালা’, ‘চুপ! ভাই কিছু বলবে’, ‘দ্য জেন্টলম্যান’, ‘অভিনন্দন’সহ আরো বহু নাটক।

বেশকিছু চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। প্রথম সিনেমায় অভিনয় ‘জয়যাত্রা’য়, এই ছবিতে তিনি গানও লিখেছিলেন। এছাড়া তাঁর অভিনীত ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’, ‘টেলিভিশন’, ‘অজ্ঞাতনামা’, ‘হালদা’ অন্যতম। ‘জালালের গল্প’ ছবিতে অভিনয়ের সুবাদে আর্ন্তজাতিক পুরস্কার ও পেয়েছেন।

মোশাররফ করিম অত্যন্ত জনপ্রিয় ও দক্ষ অভিনেতা এই নিয়ে কারো দ্বিমত নেই। বছর শেষে ঠিকই তাঁর বেশকিছু ভালো নাটকের নাম চলে আসে। তবে তাকে সবচেয়ে বড় অভিযোগ, নাটক নির্বাচনে তিনি মনোযোগী নন,প্রচুর নাটকে কাজ করেন।

এক সময় যার কৌতুকে দর্শকগণ মুগ্ধ হতেন, এখন সেটা ম্লান হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে সিকান্দার বক্স ও যমজ সিরিজের ব্যাপক জনপ্রিয়তার পর এসব কথা উঠছে। এত ব্যস্ততার ধকলে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, তবে এই বছরের শুরু থেকে বেছে বেছে কাজ করছেন। যার প্রমান পাওয়া যায় ‘সাধাসিধে মানুষের গল্প’, ‘কহেন কবি ভূতনাথ’, ‘স্বর্ণকার’, ‘শুধুমাত্র কোম্পানির প্রচারের স্বার্থে’, ‘মাছের দেশের মানুষ’ নাটকে।

যদিও এখনো তিনি ‘যমজ’, ‘মাহি ‘, ‘ফ্যাটম্যান’, ‘ঘাউরা মজি ‘ সিরিজগুলো করেই যাচ্ছেন। এক সময় ছবিয়ালের ভাই- বেরাদার ও মোশাররফ করিম ছিলেন যেন একে অপরের পরিপূরক,অথচ অনেকদিন এই জুটিকে দেখা যাচ্ছে না। এমন কি তাদের দুইটি বিশেষ সিরিজে দেখা যায় নি মোশাররফ করিম কে, এটা বেশ হতাশাজনক। প্রত্যাশা করছি, তাঁর প্রতি যে দর্শকদের যে প্রত্যাশা, সেটা তিনি অচিরেই প্রাপ্তিতে পরিণত করবেন।

১৯৭২ সালের ২২ আগস্ট জন্ম নেওয়া এই তারকা ব্যক্তিজীবনে বিয়ে করেছেন রোবেনা করিম জুঁইকে। বর্নাঢ্য ক্যারিয়ারে মোট নয়বার মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার অর্জন করেন। এই পুরস্কার শুধু জনপ্রিয়তায় নয়, সমালোচক ক্যাটাগরিতেও এসেছে, যা অন্য কারো নেই।

তাঁকে ঘিরে সমালোচনার শেষ নেই। একই ধরণের হাজারটা নাটক করে যান। ঈদের সময় টিভি খুললেই কেবল তাঁকে দেখা যায়। এসব যেমন সত্য, তেমনটি এটাও সত্য যে, মধ্যবিত্তের ছিমছাম টিভিঘর, বস্তির ভাঙা ছোট্ট টেলিভিশন, কিংবা প্রাচুর্যে্য ভরা সুরম্য ড্রয়িং রুম – সব জায়গাতেই সমান ভাবে জনপ্রিয় এই মোশাররফ করিম।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।