স্টিভেন স্মিথ: ভিলেন না নায়ক?

স্টিভেন স্মিথ যদি নিজের বা নিজেদের দায় স্বীকার না করতেন?

স্বীকার না করলে শাস্তি-নিষেধাজ্ঞা তাকে পেতে হতো না নিশ্চিত ভাবেই। যা যাওয়ার, ব্যানক্রফটের ওপর দিয়েই যেত।

টেম্পারিংয়ের সিদ্ধান্ত সবসময় দলগত ভাবেই হয়। সবাই মিলেই পরিকল্পনা করা হয়। এক্সপার্ট দু-একজন মাঠে সেটার বাস্তবায়ন করেন। যুগ যুগ ধরে এভাবেই চলে আসছে। একজন করা মানে গোটা দলই করা।

তবে এতদিন যখন কেউ ধরা পড়েছেন, তখন শুধু তাকেই যন্ত্রণা বইতে হয়েছে। সমালোচনা, নিষেধাজ্ঞা, শাস্তি, যাবতীয় ঝড়, তাকেই সইতে হয়েছে। ফাফ দু প্লেসি যে দুফায় শাস্তি পেয়েছেন, তিনি কি একাই মাঠে গিয়ে আপন মনে টেম্পারিং করেছেন? অবশ্যই না। দু প্লেসি কি পেসার? মাইক আথারটন পেসার ছিলেন যে নিজের ফায়দার জন্য পকেটে বালি নিয়ে গিয়েছিলেন? তারা করেছেন দলের পেসারদের জন্য। গোটা দলেরই সিদ্ধান্ত ছিল, বাস্তবায়নের দায়িত্ব ছিল তাদের ওপর। জরিমানা ডু প্লেসি বা আথারটন একাই গুণেছেন। কিন্তু এবারের ঘটনা ব্যতিক্রম।

টেম্পারিংয়ের ঘটনায় কোনো ‘উজ্জ্বল’ অধ্যায় সাধারণত থাকতে পারে না। তার পরও ঘটনার পর স্মিথ যা করেছেন , একদিক থেকে সেটি লিডারশিপের উজ্জ্বল উদাহরণ।

চাইলে অনায়াসেই এটা নিয়ে চুপ থাকতে পারতেন স্মিথ। এড়িয়ে যেতে পারতেন, উড়িয়ে দিতে পারতেন। ফুটেজ থাকায় ব্যানক্রফটের ম্যাচ ফি থেকে কিছু জরিমানা হতো, কয়েকটি ডিমেরিট পয়েন্ট। ব্যস! আথারটন, দু প্লেসি, ফিল্যান্ডার, যারা টেম্পারিংয়ের জন্য শাস্তি পেয়েছেন, অভিযোগ প্রমাণ হওয়ার পরও কেউ স্বীকার করেননি। কিছু জরিমানা গুণেছেন, খেল খতম।

স্মিথও চাইলে সেই পথে হাঁটতে পারতেন। তিনি কেন দায় স্বীকার করলেন, এটা ভেবে কোনো কূল-কিনারা পাচ্ছি না। এখন মনে হচ্ছে, হয়ত ব্যানক্রফটের পাশে দাঁড়াতেই এটা করেছেন। দলের তরুণ এক ক্রিকেটার, দলের সিদ্ধান্ত মেনে যে ঝুঁকিটা নিয়েছিলেন, দু:সময়ে সেই তরুণের পাশে থেকেছেন। নিজের, দলের লিডারশিপ গ্রুপের দায় স্বীকার করেছেন। মাথা পেতে নিয়েছেন। ওই তরুণকে একা ছাড়েননি।

দায় স্বীকার না করলে স্মিথের কিছুই হতো না। স্বীকার করলেন বলে এক টেস্ট নিষিদ্ধ। ম্যাচ ফির পুরোটা জরিমানা। এই টেস্টে নেতৃত্ব হারানো। এত এত সমালোচনা। ডু প্লেসি দু’বার ধরা খেয়েছেন। একবার ম্যাচ ফির ৫০ ভাগ জরিমানা হয়েছে, আরেকবার ম্যাচ ফির পুরোটা। দু’বার ধরা খেয়ে এখনও জাতীয় দলের অধিনায়ক। কারণ স্বীকার করেননি!

অধিনায়ক এভাবে দায় স্বীকার করলে সেটি ন্যাশনাল ইন্টেগ্রিটির ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী, অস্ট্রেলিয়ার বোর্ড সেজন্যই এত কড়া ভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। দৃষ্টান্তমূলক কিছু করে দেখতে চেয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ান সরকার বা বোর্ড যেভাবে রিঅ্যাক্ট করেছে, সেটা দেখেও আমাদের শেখার আছে। স্মিথের ঘটনার পর আমাদের ফেসবুক ক্রিকেট সমাজে যে উল্লাসের চিত্র দেখছি,আমাদের হিপোক্রেসিই সেটি আরেকবার ফুটিয়ে তুলছে। এটা তো সেই ক্রিকেট সমাজ, যেখানে একজন প্রমাণিত ম্যাচ ফিক্সার এখন অনেক বড় হিরো!

বল টেম্পারিংয়ের শাস্তি কি? তাৎক্ষনিক ৫ রান পেনাল্টি। কিছু জরিমানা। ভয়াবহ কিছু হলে স্মিথের মত এরকম ১-২ ম্যাচ নিষিদ্ধ। এই তো। শৃঙ্খলাভঙ্গের আর দশটা অপরাধের মতো বলেই শাস্তির পরিমাণ বেশি না। আর ফিক্সিং? খেলাধুলায় এর চেয়ে জঘন্য কিছু তো হয় না।

অথচ একজন ফিক্সারের জন্য আমাদের দরদ উথলে ওঠে। দেশের অনেক নিবেদিত প্রাণ ক্রিকেটারের চেয়ে তার জনপ্রিয়তা এখন বেশি। তারাই আবার স্মিথের গর্দান চাচ্ছে। ক্রিকেটের চেতনা ভুলণ্ঠিত হলে বলে তাদের জান তেজপাতা হয়ে যাচ্ছে।

– ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।