মসলা নির্ভর স্টার কাস্ট সিনেমা: বলিউডের সংকট

আমার এক বন্ধু আমেরিকায় থাকে। ভারতীয় বংশদ্ভুত। সো কলড নতুন বলিউডি সিনেমা নিয়ে ওর সাথে কথা হচ্ছিল। ‘এগুলো আমার একদম পছন্দ না!’ ওর কণ্ঠে আক্ষেপ আর ঝাঁঝ, ‘হিন্দি সিনেমা তাঁর নম্রতা হারিয়েছে। গানগুলো আর আগের মত নেই, সিনেমাগুলো আগে ঘণ্টা তিনেকের হত, সেক্স সিন থাকলেও সেগুলোকে দৃষ্টিকটু লাগতো।’

হলিউডকে বাদ দিলো বলিউড হল পৃথিবীর দ্বিতীয় প্রাচীনতম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। আর বলিউড তাঁর সিনেমার সংখ্যার দিক থেকে ভারতের আরো ২০ টা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির চেয়ে এগিয়ে। অন্তত, ২০১৬ সালের হিসেবটা তাই বলছে। আর অধিকাংশ ছবিই কম বেশি একই ফর্মুলা মেনে নির্মিত – জনপ্রিয় নায়ক নায়িকা এনে দাও, এক গাদা মসলা মাখাও, নাচ গান রাখো – ব্যস সিনেমা হিট।

আগের মত এখন আর তাই গল্পগুলো খুব বেশি মগজে খেলা করে না। বরং কোন সিনেমায় কোন নায়ক কোন স্টান্ট করলো, কোন আইটেম গানে কোন নায়িকার মুভ খুব আকর্ষণীয় হল, সেসবই ঠিক করে দেয় সিনেমার ভবিষ্যৎ।

হ্যা, একটা কথা ঠিক যে, বলিউডের পরিচালকরা সর্বজনীন সিনেমা বানান, বিশেষ করে মূল ধারার চলচ্চিত্রকাররা। সেখানে মূলত সর্বস্তরের দর্শকের কথা মাথায় রাখা হয়। মাল্টিপ্লেক্সের দর্শক যে বিনোদন পাবেন, আর গ্রামের হলের দর্শক যে বিনোদন পাবেন – এই দু’টোর মাঝে যেন খুব বেশি ফারাক না থাকে।

এটা করতে গিয়ে একটা বিপদও থাকে। অধিকাংশ শীর্ষ পরিচালকদের পছন্দ খান, কুমার না হয় দেবগন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাই তামিল-তেলেগু সিনেমার হিন্দি সংস্করণ করেই তাদের সন্তুষ্ট থাকতে হয়। সমস্যা কি, দক্ষিণী অ্যাকশনে বলিউডের তারকারা মানিয়ে যাচ্ছেন, ছবিও হচ্ছে ব্লকবাস্টার। আর তার সাথে হালের দুই চারটা আইটেম সং যোগ হয়ে গেলে তো কথাই নেই।

এটাতে একটু বিপদ হল, এক শ্রেণির এলিট দর্শক এই প্রথার বিপরীতে। তারা কনটেন্ট নির্ভর সিনেমার ডিমান্ড করেন। তাদের জন্য হলিউড সহজলোভ্য। তারা সিরিজ গুলে খান। নিয়মিত নেটফ্লিক্সের অলিগলি ঘুড়ে বেড়ান। তামিল রিমেক কিংবা নাচগানের মসলা মিশিয়ে এদের বোকা বানানো খুব শক্ত কাজ। তাদের জন্য পরিচালকদের পরিশ্রম করার বিকল্প নেই।

পরিশ্রমটা কেমন? কনটেন্ট নির্ভর সিনেমা করতে হবে। আর সেটা কেবল অক্ষয় কুমারের সাথে নয়, সবার সাথেই। সিনেমা মানে যে বিশাল একটা প্রেক্ষাপট সেটা নিয়ে ভাবতে হবে পরিচালকদের। প্রচলিত ফর্মুলা সিনেমার গণ্ডীটা আবারো ভাঙতে হবে

হ্যা, ভাঙার টুকটাক চেষ্টা করা হচ্ছে। যেমন, ২০১৩ সালের ‘কাই পো চে’, ২০১৪ সালের ‘কুইন’, কিংবা ২০১৬ সালের ‘নীরজা’। আবার ২০১৫ সালের ‘দম লাগাকে হেইশা’ সিনেমার কথাও বলা যায়। ক’দিন আগে মুক্তি পাওয়া ‘শুভ মঙ্গল সাবধান’ও থাকবে এই তালিকায়। আর এমন সব সামাজিক-পারিবারিক সিনেমা যে দারুণ সফলও হতে পারে সেটা তো এই সদ্যই প্রমাণ করলেন অমিতাভ বচ্চন ও ঋষি কাপুর, তাদের সিনেমা ‘১০২ নট আউট’ দিয়ে।

বলিউডের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র হল ১৯৩১ সালের মুক্তি পাওয়া আলম আ রেইন। হিন্দি ও উর্দু ভাষায় নির্মিত এই সিনেমায় সাতটি গান ছিল। সেটাই এখন অবধি বলিউড সিনেমায় সাফল্যের টেম্পপ্লেট বলে বিবেচিত হয়ে আসছে। হিন্দি সিনেমা হল এমন একটা ব্যাপার, যেখানে নাচ-গানকে মনে করা হয় অপরিহার্য ব্যাপার, এর ফলে সাময়িক ভাবে স্টোরি টেলিংয়ে বাঁধার সৃষ্টি হলেও তাতে বিনোদনের বাড়তি একটা মাত্রা যোগ হয়। বোঝা যায়, নাচ ও গান ভারতীয় সংস্কৃতির সাথেও কতটা ঘণিষ্টভাবে জড়িয়ে গেছে। সেই নাচগানের নামে ঢুকেছে আইটেম সং, যেটা এখন অনেকটা বাধ্যতামূলকও বটে।

সমস্যা তারকাতে নয়, সমস্যা এই নাচ গান আর মসলার ধারণা থেকে বের হওয়ার। স্টার কাস্টই যখন করবেন, তখন বাড়তি মসলা কেন, কেন ভাল কোনো একটা গল্প নিয়ে সিনেমা নয়? – এই প্রশ্নের জবাবে রীতিমত গবেষণা হওয়া দরকার।

আরেকটা ব্যাপার এখানে উল্লেখ করা উচিৎ, যত দিন যাচ্ছে সিনেমাগুলোর দৈর্ঘ্য কমে আসছে। সর্বকালের সবচেয়ে লম্বা দৈর্ঘ্যের যে ভারতীয় ছবির তালিকা, তার মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ের ছবি আছে কেবল একটি। সেটা হল ২০১৬ সালের ‘মহেন্দ্র সিং ধোনি: দ্য আনটোল্ড স্টোরি। এর দৈর্ঘ্য ছিল ১৯০ মিনিট। খ্যাতনামা চলচ্চিত্র সমালোচক তারাণ আদর্শের দাবী বছর দুই হল ভারতীয় সিনেমাগুলোর দৈর্ঘ্য গড়ে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট করে কমে এসেছে।’

বলাই বাহুল্য, এই বিষয়টা আসলে করা হয়েছে বানিজ্যিক দিক বিবেচনা করেই। কারণ ছবি যত ছোট হবে, মাল্টিপ্লেক্সগুলোতে শো-এ সংখ্যা তত বাড়বে। তত আসবে অর্থ। তবে, এর ফলে কমবে সিনেমার গভীরতা। ডিটেইলিংয়ের প্রতি পরিচালকরা মন দেবেন না। ফলে, দিন শেষে দর্শকেরই কপাল পুড়বে!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।