রাজ, বাজিগর কিংবা একজন কিং খান

তিনি খুব ভালো করেই জানেন দর্শকদের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত থাকা যায়, কীভাবে দর্শকদের নাড়িনক্ষত্রকে উজ্জীবিত রাখা যায়, তিনি রসিকতায় দারুণ দক্ষ, তার সব কথাই জাতীয় খবরের শিরোনাম হয়ে যায়। তিনি আর কেউ নন তিনি বলিউড বাদশাহ শাহরুখ খান। বলিউডের বাদশাহ বা কিং অব রোমান্স খেতাব তার জন্যই বরাদ্দ।

বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী এবং জনপ্রিয় এই অভিনেতা নিজেকে নিয়ে গেছেন এমন জায়গায় যেখানে পৌছানোর স্বপ্ন দেখেন প্রতিটি নবাগত অভিনেতা। বিশ্বের জনপ্রিয় টক-শো টেড-টকের আমেরিকান উপস্থাপক ডেভিড লেটারম্যান একটি পর্বে তার অতিথিকে পরিচয় করিয়ে দেন এই বলে যে-  ‘আমাদের আজকের অতিথিকে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য কোন বিশেষনের প্রয়োজন নাই, তিনি ওয়ান এন্ড অনলি শাহরুখ খান।’

নব্বই দশকের শুরুতে ক্যারিয়ার শুরু করা এই মহাতারকা এখনো রাজত্ব করে চলেছেন। টেলিভিশন দিয়ে নিজের ক্যারিয়ার শুরু করা শাহরুখ খান হেমা মালিনীর পরিচালনায় ‘দিল আশনা হ্যায়’ সিনেমায় অভিনয় দিয়ে সিনেমায় নিজের অভিষেক করলেও প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা ‘দিওয়ানা’।

ক্যারিয়ারের শুরুতে খলনায়ক হিসেবে সবার চোখে পড়লেও একসময় বলিউডের সেরা রোমান্টিক তারকা খেতাবে ভূষিত হন তিনি। দিওয়ানা, ডর,বাজিগর,দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েংগে, পরদেশ, দিল তো পাগল হ্যায়, কুছ কুছ হোতা হ্যায়, দেবদাস, কাভি খুশি কাভি গাম, চলতে চলতে,বীর জারা, কাল হো না হো, ম্যায় হু না, স্বদেশ, মোহাব্বাতেন, মাই নেম ইজ খান, ওম শান্তি ওম, চাক দে ইন্ডিয়া, কাভি আলবিদা না কেহনা, রাব নে বানাদে জোড়ি, জাব তাক হ্যায় জান, ডন সিরিজ, চেন্নাই এক্সপ্রেস, হ্যাপি নিউ ইয়ার দিয়ে প্রায় তিরিশ বছর ধরে বলিউড রাজত্বের বাদশাহ খান তিনি।

তবে গত কয়েক বছরে তার সিনেমা গুলি বক্স অফিসে তেমন ভাবে সফল হচ্ছেনা। ডিয়ার জিন্দেগি, রইস হিট হলেও তেমনভাবে জৌলুস ছড়াতে পারেনি। ‘জাব হ্যারি মেট স্যাজাল’ এবং ‘জিরো’ ফ্লপ হবার পরে ভক্তদের সাথে সাথে শাহরুখ নিজেই সাময়িক অবসর নিয়ে নেন।

আজ ব্যাক্তিজীবনে ৫৪ বছরে পা ফেলতে চলেছেন এই বলিউড বাদশাহ। শাহরুখের জীবনী, ক্যারিয়ার, সিনেমা, জুটি, বন্ধুত্ব, পরিবার নিয়ে এত বেশি বেশি আলোচনা হয়েছে যে সেসব নিয়ে নতুন করে বলার/লেখার কিছু নাই। আজ তাই শাহরুখের জীবনের বিশেষ বিশেষ কিছু অংশ তুলে ধরা হল।

১.

বাবা তাজ মুহম্মদ খান আর মা লতিফ ফাতিমার পরিবারে ১৯৬৫ সালের ২ নভেম্বর জন্ম হয় শাহরুখের। পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি নানীর সঙ্গে প্রথমে ম্যাঙ্গালোর আর তারপরে ব্যাঙ্গালোরে থাকতেন। নানী তাঁর দেখাশোনা করতেন। শাহরুখের নানা ম্যাঙ্গালোর বন্দরের মুখ্য প্রকৌশলী ছিলেন।

২.

শাহরুখের বাবা পাকিস্তানের পেশোয়ারের মানুষ, মা ভারতের হায়দ্রাবাদের আর দাদি কাশ্মীরের।

৩.

বাড়িতে শাহরুখের বাবা ‘হিন্দকো’ ভাষায় কথা বলতেন। এই ভাষা পাকিস্তানে ব্যবহৃত পাঞ্জাবী কথ্য ভাষা।

৪.

পাকিস্তানের পেশোয়ারের সঙ্গে শাহরুখের যোগাযোগ নিয়মিত ছিল। ১৯৭৮-৭৯ সালে তিনি গিয়েছিলেন বাবার ফেলে আসা শহরে। সে প্রথমবার শাহরুখ বাবার পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। ভারতে শুধু তাঁর মায়ের দিকের আত্মীয় স্বজন ছিলেন, বাবার গোটা পরিবারই পেশোয়ারে থাকতেন।

৫.

একটু বড় হওয়ার পরে শাহরুখের পরিবার দিল্লিতে চলে আসেন। সেন্ট কলাম্বাস স্কুলে পড়াশোনা করেছেন তিনি। খেলাধুলোয় খুব আগ্রহী ছিলেন শাহরুখ।

৬.

স্কুলে পড়ার সময়ে শাহরুখ হিন্দিতে খুব একটা দক্ষ ছিলেন না। তবে একবার হিন্দি পরীক্ষায় দশে দশ পেয়েছিলেন তিনি, পুরষ্কার হিসাবে তাঁর মা সিনেমা দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন।

৭.

দিল্লির হংসরাজ কলেজ থেকে অর্থনীতিতে বি এ পাশ করেন আর জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়াতে মাস কমিউনিকেশন নিয়ে এম এ পড়তে ভর্তি হন। তবে সেটা আর শেষ করা হয় নি তাঁর।

৮.

শাহরুখ খানের স্ত্রী গৌরীর বাবা একজন সেনা কর্মকর্তা ছিলেন। স্কুলে পড়ার সময় গৌরীর সাথে প্রথম চেনা পরিচিতি হয় শাহরুখের। একটা পার্টিতে দুজনের মধ্যে বেশ অনেকক্ষণ গল্প চলে। তখন থেকেই শুরু হয় শাহরুখ-গৌরীর প্রেম পর্ব।

৯.

দিল্লী নিবাসী গৌরী আর শাহরুখের বিয়ে হয় ১৯৯১ সালের ২৫ অক্টোবর। প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন তারা।

১০.

শাহরুখের যখন ১৫ বছর বয়স, তখনই তাঁর বাবা মারা যান ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে। পেশায় উকিলও ছিলেন আবার স্বাধীনতা সংগ্রামেও অংশ নিয়েছিলেন শাহরুখের বাবা তাজ মুহম্মদ খান। অল্প বয়সে একবার জেলও খেটেছেন, পরে মৌলানা আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে ভোটেও দাঁড়িয়েছিলেন তাজ মুহম্মদ খান।

১১.

শাহরুখ খানের প্রথম রোজগার ছিল ৫০ টাকা। গায়ক পঙ্কজ উদাসের একটা কনসার্টে কাজ করে সেই টাকা পেয়েছিলেন। প্রথম রোজগারের টাকা দিয়ে ট্রেনের টিকিট কেটে শাহরুখ আগ্রা গিয়েছিলেন ।

১২.

শাহরুখের প্রথম টেলি-সিরিয়াল শুরু হয় ১৯৮৯ সালে। কর্নেল কাপুরের পরিচালনায় ‘ফৌজি’ নামের সেই ধারাবাহিক খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল। সেখানেই প্রথমবার ভারতের দর্শক দেখলেন পরের কয়েক বছরে স্টার থেকে সুপার স্টার হয়ে ওঠা শাহরুখ খানকে।

১৩.

গত ২৭ বছরের অভিনয় জীবনে ৫২৫ টির বেশি পুরস্কার জিতেছেন তিনি।

১৪.

১৯৮৯-৯০ সালে রেণুকা সাহানের সঙ্গে ‘সার্কাস’ সিরিয়ালে কাজ করতে শুরু করেন শাহরুখ। সেই সময়ে তাঁর মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। মাকে ধারাবাহিকটার একটা পর্ব দেখানোর জন্য বিশেষ অনুমিত নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর মা তখন এতটাই অসুস্থ, যে ছেলেকে চিনতেও পারেন নি। ১৯৯১ সালের এপ্রিল মাসে মৃত্যু হয় শাহরুখ খানের মায়ের।

১৫.

মায়ের মৃত্যুর শোক থেকে দূরে সরে যেতে এক বছরের জন্য শাহরুখ দিল্লি থেকে মুম্বাই গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর ফেরা আর হয়নি আর। মুম্বাইতেই একসময় বলিউডের সেরা নায়ক হিসেবে বসবাস করা শুরু করেন তিনি।

১৬.

১৯৯১ সালে প্রথম চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন শাহরুখ খান। সেটি ছিল হেমা মালিনী অভিনীত ‘দিল আসনা হ্যায়’। নায়ক হিসাবে শাহরুখকে প্রথম দেখা গেল পরে বছর – ১৯৯২ সালের ২৫ জুন, ‘দিওয়ানা’য়।

১৭.

কঠোর পরিশ্রম করতে পারেন শাহরুখ। মাত্র চার পাঁচ ঘণ্টা ঘুমান তিনি। তাঁর প্রিয় উক্তি হলো, ‘ঘুমানো মানে জীবন নষ্ট করা’।

১৮.

স্ত্রী গৌরি, পুত্র আরিয়ান এবং আব্রাহাম, কন্যা সোহানা ছাড়াও শাহরুখের সঙ্গে তাঁর বাড়িতে থাকেন বড় বোন লালারুখ খান।

১৯.

ফিল্মফেয়ার ম্যাগাজিনের জরিপ অনুযায়ী বলিউড অভিনেত্রী কাজলের সাথে তার জুটি ভারতের চলচ্চিত্র ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় জুটি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এই সিনেমা টানা ২০ বছর মুম্বাইয়ের মারাঠা সিনেমা হলে চলেছে। যা গিনেস বুকে রেকর্ড হিসেবে স্থান করে নেয়।

২০.

অভিনয়ের বাইরেও কলকাতা নাইট রাইডার্স নামে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (আইপিএল) তাঁর একটি ক্রিকেট দল আছে। রেড চিলিজ এন্টারটেইনমেন্ট এবং ড্রিমস আনলিমিটেড নামে দুটি প্রোডাকশন হাউজ আছে তার। এছাড়া রিয়েল এস্টেট ব্যবসাতেও তার ইনভেস্ট রয়েছে। এছাড়া রেড চিলিস ভিএফএক্স বর্তমানে বলিউডের সেরা একটি ভিএফএক্স প্রতিষ্ঠান হিসেবে গন্য হয়।

শাহরুখ খান মোট ১৪ বার ভারতের অস্কার খ্যাত ফিল্মফেয়ার পুরস্কার লাভ করেন। এর মধ্যে আটটিই সেরা অভিনেতার পুরস্কার। তিনি বলিউডের অন্যতম সফল একজন অভিনেতা। হিন্দি চলচ্চিত্রে অসাধারণ অবদানের জন্য ২০০২ সালে ভারত সরকার শাহরুখ খানকে পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত করে। সর্বোপরি তিনি ভারতের সেরা সুপারস্টারদের মধ্যে অন্যতম। ফলে শাহরুখ খান জয়-পরাজয় যা কিছুই বলেন, সবার মনোযোগ সেদিকেই যায়।

বর্তমানে শাহরুখ খান পৃথিবীর সফল চলচ্চিত্র তারকা। শাহরুখ খানের এখনকার সম্পত্তি ৫,১০০ কোটি টাকা। ২০০৮ সালে নিউজউইকতাঁকে বিশ্বের ৫০ ক্ষমতাশীল ব্যক্তির তালিকায় স্থান দেয়। ওয়েলথ-এক্স সংস্থার বিচারে বিশ্বের সবথেকে ধনী হলিউড, বলিউড তারকার তালিকায় শাহরুখ খান দ্বিতীয় স্থান পেয়েছেন। এক্ষেত্রে তিনি হলিউড তারকা ব্রাড পিট, টম ক্রুজ, জনি ডেপ-দের পিছনে ফেলে দিয়েছেন। অভিনেতা হিসেবে বৈশ্বিক অবদানের জন্য শাহরুখ খানকে সম্মানসূচক ডক্টরেট উপাধিতে ভূষিত করেছে স্কটল্যান্ডের প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রায় একবছর সিনেমাতে অভিনয় থেকে দুরে থাকলেও বিভিন্ন প্রজেক্টে তার অভিনয়ের কথা শোনা গেলেও এখনো অফিসিয়াল কোন ঘোষনা দেননি তিনি। তাঁর ‘বাজিগর’ সিনেমার জনপ্রিয় ডায়লগ ‘হার কার জিতনে ওয়ালেকো বাজিগর ক্যাহতে হ্যায়’ এর মতোই বক্স অফিসে সফলতা নিয়েই ফিরবেন এই তারকা এমনটাই আশা ভক্তসহ সকলের। এখন অপেক্ষা শুধু বাদশাহের প্রত্যাবর্তনের।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।