শাহরুখকে কে না চেনে, আব্দুর রেহমানকে ক’জনই বা চেনে!

শাহরুখ খানের নাম ছিল আবদুল রেহমান, যা তার নানা রেখেছিলেন। পরে শাহরুখের পিতা তার বোন লালারুখের সাথে মিলিয়ে তার নাম রাখেন শাহরুখ, যার অর্থ ‘রাজার মত দেখতে মুখ’। তিনি অবশ্য শাহরুখ খান নয়, ‘শাহ রুখ খান’ লিখতে পছন্দ করেন এবং নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন এই কারণে যে তার বাবা তার নাম পরিবর্তন করেছিলেন, কারন আবদুল রেহমান কখনও একটি ফিল্মস্টারের জন্য উপযুক্ত নাম হত না, মুভি জগতে এসে তাকে হয়ত নাম পরিবর্তন করতে হত, সেটা আর করা লাগেনি।

আমরা শাহরুখকে অনেক মজার এবং বিচক্ষন মানুষ হিসেবে জানি। শাহরুখ তার এই গুনটি পেয়েছেন তার বাবার কাছ থেকে, শাহরুখের মতে যিনি অত্যন্ত মজার মানুষ ছিলেন। তাঁর একটি ডায়লগের কথা শাহরুখ বলেন এক সাক্ষাৎকারে, ‘বেটা, কুচ কাম কারনা, অর না মান হো তো মাত কারনা। কিউকি জো কুচ নাহি কারতে ওহ কামাল কারতে হ্যায়!’

স্কুলে থাকতে একবার শাহরুখ ক্লাস ফাঁকি দেয়ার জন্য মৃগীরোগীদের মত অভিনয় করেন যে তিনি এখনই মারা যাচ্ছেন। তার অভিনয় এতই বাস্তব ছিল যে শিক্ষক তার বন্ধুদেরকে তাকে ক্লাসরুম থেকে দূরে সরিয়ে নিতে বলেন এবং তাকে বিশ্রাম নেয়ার অনুমতি দেন। শাহরুখের শয়তানি এখানেই শেষ হয়নি। পালানোর পরিবর্তে, তিনি তার এক বন্ধুকে আবার ক্লাসে ফেরত পাঠান, যেন সে গিয়ে শিক্ষকের চামরার জুতা নিয়ে আসে, কারন মৃগীরোগীদের চামড়ার গন্ধ শুকিয়ে সুস্থ করা যায়। শিক্ষক তার একপাটি জুতা দেন আর এরপর সারাদিন এক পায়ে জুতা ছাড়া খালি পায়ে ঘুড়ে বেড়াতে হয় বেচারাকে।

শাহরুখ খানের বাবা-মা ও বড় বোন

তার স্ত্রী গৌরি এক সাক্ষাৎকারে জানান, শাহরুখ সারাক্ষনই তার আশেপাশের মানুষকে মজার মজার কথা বলে ও জোকস শুনিয়ে হাসিয়ে থাকেন। শুধু তাই নয়, গৌরিকে খুশি করার জন্য জনপ্রিয় হিন্দি গানগুলার প্যারডি ভার্সন বানিয়ে তাকে শোনান। গৌরিকে এমনি এমনি ভাগ্যবতী বলা হয় না আসলে।

শাহরুখের ইচ্ছা ছিল মুম্বাই এসে এক বছর অভিনয় করে কয়েকটা মুভি করে আবার দিল্লী তার মায়ের কাছে চলে যাবেন। সেই এক বছর এখনো শেষ হয়নি। এমনকি গৌরি তার প্রথম মুভি ‘দিওয়ানা’ হিট হওয়ায় যারপরনাই হতাশ হয়েছিলেন কারণ  তিনি চাচ্ছিলেন না শাহরুখ মুভিতে সাফল্য পাক আর এই ইন্ডাস্ট্রিতেই স্থায়ী হয়ে যাক।

শাহরুখ কখনোই ভাবেননি তিনি মুভি ইন্ডাস্ট্রিতে এতটা সফল হবেন। তিনি বলেন, ‘আমি জানতাম আমি আমার কাজটা ভাল করে করছি, কিন্তু এত ভাল করে করেছি তা জানতাম না। সবাই ভাবে আমি আমার কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছে গেছি, কিন্তু কোন অহংকার ছাড়াই বলতে চাই, আমি আমার লক্ষ্য প্রতিবারই একটু উচুতে উঠিয়ে নেই।’

শাহরুখ সবসময় মনে করেন তার সকল সাফল্য এসেছে তার মা-বাবার দোয়ায় আর সৃষ্টিকর্তার রহমতে। শাহরুখ একবার একটা বড় মুভির সাথে চুক্তিবদ্ধ হন। শুটিং এর সময় তাকে শর্ত দেয়া হয় তার নিজস্ব মেকআপম্যান রবি-কে সরিয়ে প্রডাকশনের নিজস্ব মেকআপম্যান দ্বারা কাজ করাতে হবে। শাহরুখ এতে প্রচন্ড প্রতিক্রিয়া দেখান এবং জানিয়ে দেন এই মুভি তিনি করবেন না।

তাঁর মেকআপম্যান রবি আর স্পট বয় সুভাশকে তিনি তার পরিবারের সদস্য বলে মনে করতেন সবসময়। দু’জনই ফিল্ম লাইফের শুরু থেকে তার সাথে ছিল। সুভাশ ২০১৫ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান, শাহরুখ সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারেননি তাকে। রবিও মারা যান ২০১৬ সালে। শাহরুখ এখনো মিস করেন এই দু’জনকে।

শাহরুখ তখন খুবই ছোট। স্কুলে যায়। একবার তাঁর ক্লাস টিচার জিজ্ঞেস করলেন, ‘বড় হয়ে কি হতে চাও? শাহরুখের উত্তর ছিল ‘ফিল্মস্টার হতে যাই’। সেই শিক্ষক তাঁকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেন যে এইটা খুবই অবাস্তব স্বপ্ন। কারণ তার বা তার পরিবারের কোন কানেকশনই নেই ফিল্ম লাইনে। এমনকি তিনি শাহরুখের মাকে ডেকেও একই কথা বলেন। কিন্তু তার মার উত্তর ছিল, ‘যদি শাহরুখ বলে থাকে সে ফিল্মস্টার হবে, তাহলে সে সেটাই হবে।’ মা-বাবা তাঁর স্বপ্নের উপর অনেক বেশি ভরসা করেছিলেন, এইটাই হচ্ছে তাঁর সাফল্যের অন্যতম বড় কারণ। সেই শিক্ষক পরে এক সাক্ষাৎকারে জানান যে শাহরুখ তাঁকে ভুল প্রমান করায় তিনি বেজায় খুশি।

শাহরুখ যখন মুম্বাইতে স্ট্রাগল করছিলেন, একদিন তার বন্ধু বেনি থমাসকে বান্দ্রার এক জায়গায় বসে আড্ডা দিতে দিতে বলেন, ‘দেখিস একদিন এই শহরের কিং হব আমি।’ সেই বান্দ্রাতেই শাহরুখ তার বাড়ি মান্নাত বানিয়েছেন।

শাহরুখ তার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের বেশিরভাগই মুভিই পেয়েছিলেন তখনকার উঠতি স্টার আমির, সালমান, সাইফ মুভিগুলো রিজেক্ট করে দেয়ায়। যেমন আমিরের ‘ডার’, সাইফের ডিডিএলজি, সালমানের বাজিগর ইত্যাদি।

শাহরুখ তাঁর এত লম্বা ক্যারিয়ারে কখনই কোন নায়িকার সাথে পরকিয়ায় জড়ানোর গুজব শোনা যায়নি। এই ব্যাপারে শাহরুখ বলেন, ‘আমি আমার স্ত্রী-পরিবারকে অনেক ভালোবাসি। কাজের সময় আমার সকল জৈবিক আকাঙ্খা কাজের দিকে প্রয়োগ করি, কোন নায়িকার দিকে না!’

শাহরুখ ভারতের অন্যতম ধনী অভিনেতা। তবে শাহরুখ বলেন ‘আমি মুভিতে অভিনয়ের জন্য কোন পারিশ্রমিক দাবী করি না। প্রডিউসারকে বলে দেই, যদি মুভি ভাল বিজনেস করে, তাহলে আমাকে কিছু লাভ্যাংশ দিয়ে দিয়েন। আমার লক্ষ্য সবসময় ভাল অভিনয় করা, অভিনয় করে অর্থ উপার্জন নয়।’ তার ইনকামের প্রধান উৎস বিজ্ঞাপন। সাথে ক্রিকেট দল কলকাতা নাইট রাইডার্স, মুভি প্রডাকশন তো আছেই। শাহরুখ যেকোন রকম বিজ্ঞাপন করতে আপত্তি জানান না, এই ব্যাপারে তাঁর বক্তব্য, ‘আমার উপার্জনের প্রধান উৎস বিজ্ঞাপন। আমার পরিবার চালানোর জন্য অর্থ দরকার। আমি মনে করি পরিবারের জন্য অর্থ উপার্জনের যেকোন সৎ উপায় বেছে নিতে লজ্জার কিছু নেই।’

শাহরুখ একমাত্র ভারতীয় যিনি ইউনেস্কোর ‘পিরামিড কন মারনি’ পুরস্কার পেয়েছেন। এই পুরষ্কার তিনি পান শিশুশিক্ষা নিয়ে কাজ করার সুবাদে। শাহরুখ নাম গোপন রেখে মুম্বাইয়ের নানাবাতি হসপিটালে ডোনেট করেন। মিডিয়ার এই খবর জানতে ৯ বছর লেগেছে।

অমিতাভ বচ্চনকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তাঁর কি নেই যেটা শাহরুখের আছে? অমিতাভ বচ্চন জবাবে বলেছিলেন, ‘শাহরুখের অত্যন্ত প্রখর মস্তিষ্ক আছে।’

শাহরুখের জীবনের গল্পগুলি এক নিমেষে বর্ণনা করা যায় না – এগুলি একই সময়ে অনুপ্রেরনামূলক, মজার, দুঃখজনক, বাস্তবসম্মত, সৎ, বিনীত ও প্রীতিকর। তিনি একজন অহংকারী অভিনেতা কিন্তু একজন নম্র তারকা। তাঁর জীবন একটি ফিল্মের চেয়েও রোমাঞ্চকর। আশা করি তার জীবন-চলচ্চিত্রটি সারাজীবন এইভাবেই যেন চলে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।