হারানো দিনের চেনা ছন্দের সন্ধানে

শ্রীলঙ্কান দলটা তাদের সুদিন হারিয়েছে অনেকদিন হল। এক গাদা শীর্ষ ক্রিকেটার, বোর্ডের দ্বন্দ্ব ও নিজেদের ফিটনেসজনিত গোয়ার্তুমির কারণে এখন দলটির পারফরম্যান্সের গ্রাফ তলানীতে গিয়ে ঠেঁকেছে। এবারের বিশ্বকাপে তাই বাকিদের চেয়ে তো বটেই, আফগানিস্তানের চেয়েও কম আলোচনা হচ্ছে শ্রীলঙ্কানদের ঘিরে।

  • দলের শক্তিমত্তা

শ্রীলঙ্কার বর্তমান দলে জেনুইন না কিন্তু কার্যকরী, এমন একঝাঁক অলরাউন্ডার রয়েছে। এঞ্জেলো ম্যাথিউস, থিসারা পেরেরা, মিলিন্দা সিরিবর্ধনে, জীবন মেন্ডিস, ধনঞ্জয়া ডি সিলভা, ইসুরু উদানারা হয়তো ম্যাচ জয়ের ক্ষেত্রে ব্যাটে বলে ততটা বড় আকারে কিছু করে না। তবে ছোটখাটো কাজ করে দলের বেশ উপকার করে।

যেমন ধরুন, অধিনায়কের এখন  ব্রেক থ্রু দরকার। এরা এসে ৩-৪ ওভার বল করে দিতে পারবে। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে একাধিক উইকেট তুলে নিবে। আবার ধরা যাক অধিনায়কের এখন এমন কাউকে দরকার যে মাঝের ৩০-৪০ বল খেলে ৫০-৬০ রান করে দিবে। এতে করে বড় স্কোর দাঁড় করাতে কিংবা তাড়া করতে সুবিধা হবে। এক্ষেত্রেও এরা বেশ কার্যকর প্রমাণিত হবে। দলকে একটা প্লাটফর্মে দাড় করাতে এদের ভুমিকা অপরিসীম।

দ্বিতীয় শক্তিমত্তা হলো শ্রীলঙ্কার ফিল্ডিং। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ হলেও দ্বৗপ অঞ্চলের বাসিন্দা হওয়ায় এদের শারীরিক গঠন আমাদের তুলনায় বেশ ভালো। ফিল্ডিংয়ের সময় শ্রীলঙ্কার একজন ফিল্ডার নিজের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা দিয়ে রান বাঁচানোর কিংবা উইকেট নেওয়ার চেষ্টায় মত্ত্ব থাকে। এমন প্রচেষ্টা উইকেট তোলার ক্ষেত্রে বোলারকে অনেক সুবিধা দেয়।

  • অভিজ্ঞতা

বয়সের দিক থেকে এবারের আসরের সবথেকে বুড়ো দল এটি। দলের ৯ জনের বয়স ত্রিশ কিংবা তার বেশি! দলের হয়ে ফার্স্ট বোলার লাসিথ মালিঙ্গা সর্বোচ্চ তিনটি বিশ্বকাপ খেলেছেন। দুই অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার এঞ্জেলো ম্যাথিউস ও থিসারা পেরেরা খেলেছেন দুইটি বিশ্বকাপ। এছাড়া অধিনায়ক দিমুথ করুনারত্নে, ব্যাটসম্যান লাহিরু থিরিমান্নে, উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান কুশাল পেরেরা, অলরাউন্ডার জীবন মেন্ডিস এবং ফার্স্ট বোলার সুরাঙ্গা লাকমল খেলেছেন একটি বিশ্বকাপ। বাকি সাত জনের সবাই এবারই প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছেন।

  • তুরুপের তাস

দুই অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউস এবং থিসারা পেরেরার ওপর নির্ভর করছে শ্রীলঙ্কা এবারের বিশ্বকাপে কেমন করবে। এরা ভালো করলেই শ্রীলঙ্কা ভালো করবে। সম্মিলিতভাবে দুজনে খেলেছেন ২৫৮ ম্যাচ, করেছেন ৭,৫৭৮ রান এবং নিয়েছেন ২৮৪ উইকেট!

দুই ডানহাতি ফার্স্ট বোলার লাসিথ মালিঙ্গা এবং সুরাঙ্গা লাকমল ভালো পারফরমেন্স দেখিয়ে দলের কান্ডারি হয়ে উঠতে পারেন। ক্রিকেট ইতিহাসে মালিঙ্গাই একমাত্র খেলোয়াড় যার বিশ্বকাপ ম্যাচ দুইটি হ্যাটট্রিক রয়েছে। বোলারদের মধ্যে এবারের আসরে তিনি সর্বোচ্চ ৩২২ উইকেট সংগ্রহ করে মাঠে নামছেন, এই আসর খেলবে এমন অন্য কোনো খেলোয়াড়ের উইকেট সংখ্যা ৩০০ ছাড়ায়নি। অন্যদিকে সুরঙ্গ লাকমলের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে উইকেট সংখ্যা ১০৭ টি (৮২ ম্যাচ)। নতুন বলে গতি এবং সুইং এর মিশেলে তিনি প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের ভালো চাপে ফেলতে পারবেন।

  • দুর্বলতা

লঙ্কানদের এবারের দলে প্রধান দূর্বলতা তাদের টপ অর্ডার। লেজেন্ডারি দুই ব্যাটসম্যান কুমার সাঙ্গাকারা ও মাহেলা জয়াবর্ধনে অবসর নেওয়ার পর থেকে শ্রীলঙ্কlর টপ অর্ডার যেনো তাসের ঘর হয়ে গেছে। এক লাহিরু থিরিমান্নে ছাড়া দলে আর কোনো ব্যাটসম্যান নেই যার গড় ত্রিশের ওপর। কোয়ালিটি পেস বোলিংয়ের সামনে এই ব্যাটিং লাইনআপকে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে।

দলের দ্বিতীয় দুর্বলতা হলো স্পিন ডিপার্টমেন্ট। এটা খুবই দুঃখজনক ব্যাপার যে, শ্রীলঙ্কার বর্তমান দলে কোনো কোয়ালিটি স্পিনার নেই; যেখানে বাকি সব দলেই কমপক্ষে একজন করে বিশ্বমানের স্পিনার রয়েছে।

এছাড়া লঙ্কান দলে ম্যাচ উইনারের বড্ড অভাব। থিসারা এবং ম্যাথিউস ছাড়া দলে আর কোনো ম্যাচ উইনার নেই। পারফর্মার থাকলে ভালো খেলা যায়। আর ম্যাচ উইনার থাকলে ম্যাচ ছিনিয়ে নেওয়া যায়। পার্থক্যটা এখানেই।

  • প্রেডিকশন

১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপজয়ী এই দেশটি তৎকালীন সময়ে ক্রিকেটদুনিয়াকে বেশ চমকেই দিয়েছিল। কাপ নেওয়া তো দূর, সেই লঙ্কান টিম যে নকআউট স্টেজে পা রাখবে, এমনটা কেউ আগে ভেবে রাখেনি। অরবিন্দ ডি সিলভা, সনথ জয়সুরিয়া, মারভান আতাপাত্তুর দল সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিল। আন্ডারডগ হয়ে বিশ্বকাপ জিতেছিল।

এরপর তারা ২০০৭ সালের ফাইনাল খেললো কিন্তু কাপ নিতে পারলো না। যদিও এক্ষেত্রে তাদের কিছুটা দূর্ভাগ্যই ভালো যায়। ম্যাচে ভালো অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও বারবার বৃষ্টির বাগড়ায় তাদের খেলার রিদম নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ফ্ল্যাডলাইট না থাকায় শেষ ক’ওভার ঘুটঘুটে অন্ধকারেই খেলতে হলো! আর ২০১১ এর বিশ্বকাপে সাঙ্গা-মাহেলা-দিলশান ত্রয়ী ভালো খেলেও পরাজয় বরণ করলো ভারতের সাথে।

তবে এবারের শ্রীলঙ্কার অবস্থা খুবই বেগতিক। তাদের ক্রিকেটে একটি জেনারেশন গ্যাপ চলছে যার দরুণ বর্তমানে তাদের এই হাল। জয়সুরিয়া, ভাস, মুরালিধরনরা চলে যাওয়ার পর সাঙ্গাকারা, মাহেলা মিলে অনেক দিন লঙ্কান ক্রিকেটের হাল ধরে রেখেছিল। তারা চলে যাওয়ার পর থেকেই ধুকে ধুকে চলছে দ্বৗপরাষ্ট্রের ক্রিকেট। ২০১৮ সাল হতে ২২ ওয়ানডে খেলে এখন অবধি মাত্র ছয় টি ম্যাচে তারা জয়ের মুখ দেখেছে!

বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার প্রথম ম্যাচ নিউজিল্যান্ডের সাথে, এক জুন। বাস্তবতা বলছে এবার লঙ্কানদের অবস্থান হবে একদম তলানিতে। রাউন্ড রবিন লিগের সবকয়টি ম্যাচ হারলেও অবাক হওয়ার মতো কিছু হবে না। উল্টো তারা যদি তিন ম্যাচে জয়লাভ করতে পারে, তাতেই সবাই হাততালি দিবে।

  • শ্রীলঙ্কার বিশ্বকাপ স্কোয়াড

দ্বিমুথ করুনারত্নে (অধিনায়ক), কুশাল পেরেরা (উইকেটরক্ষক), কুশাল মেন্ডিস (উইকেটরক্ষক), লাহিরু থিরিমান্নে, আভিস্কা ফার্নান্দো, অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউস, থিসারা পেরেরা, ধনঞ্জয়া ডি সিলভা, জীবন মেন্ডিস, মিলিন্দা সিরিবর্ধনে, ইসুরু উদানা, লাসিথ মালিঙ্গা, সুরাঙ্গা লাকমল, নুয়ান প্রদীপ, জেফরে ভ্যানডার্সে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।