এসপিবি: কৈশোরের অমর প্রেম

সে আরেক জনমের গল্প।

ভিসিআরে সিনেমা দেখাটা তখন আমাদের স্বপ্নের সাধ্যেও ছিলো না। সেই সময়ে আমাদের ক্লাশে ভর্তি হয়েছিলো নিপাট-নীরিহ এক কিশোর। দিন দুয়েক গড়াতে জানা গেলো, সে আমাদের জেলার নতুন সিভিল সার্জন সাহেবের পূত্র।

ছেলেটি আস্তে আস্তে ভাজ খুললো। বললো, তাদের বাসায় ভিসিআর আছে।

আমরা ওর পেছনে পেছনে সন্দেশের লোভে হাটতে থাকা সেই পথের পাচালির শারমেয়টার মতো চললাম। কিন্তু সেখানে গিয়ে বড্ড হতাশ হলাম। ভিসিআরের রিমোট তার বড় ভাইয়ের হাতে। চোখে ভারী চশমা লাগানো সেই বড় ভাই কেবল বসে ‘আকালের সন্ধানে’ জাতীয় সিনেমা দেখেন। একদিন বোধহয় আমাদের জন্য ওনার করুনা হলো।

ভিসিআরে চালিয়ে দিলেন ঝা চকচকে একটা ক্যাসেট-সাজান; হিন্দি সিনেমা।

সিনেমায় কী দেখেছিলাম, তা মনে রইলো না। কিন্তু একেবারে মাত করে দিলো কয়েকটা গান। বিশেষ করে ‘দেখা হ্যায় প্যাহলি বার’ গানটা তো আমাদের সঙ্গী হয়ে গেলো। চলতে ফিরতে গুন গুন করতে থাকলাম। বিশ্বাস করুন, আমি ভেবেছিলাম, গানটা সালমান খানই গেয়েছেন।

লম্বা সময় ধরে আমার এই বিশ্বাসটা ছিলো।

আমি কুমার শানু, উদিত নারায়ন, অভিজিতের নাম শিখেছিলাম। কিন্তু ‘দেখা হ্যায় প্যাহলি বার’, ‘বহুত পেয়ার’ কিংবা ‘জিয়ে তো জিয়ে’ গানগুলো সালমান খানেরই গাওয়া বলে মনে করতাম। এমনকি ‘মেরে রাংমে’, ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’, ‘দিল দিওয়ানা’, ‘দিদি তেরা দেবর’, ‘হাম আপকে হ্যায় কৌন’…. এরকম গণ্ডা গণ্ডা গান সালমানের গান বলেই মেনে নিয়েছিলাম।

কিন্তু এই ‘স্বর্গে’ আমার বেশীদিন থাকা হলো না। এক বড় ভাই একদিন কথায় কথায় বলছিলেন, ‘বোম্বেতে সবচেয়ে ইউনিক ভয়েস হলো এসপিবির।’

কে এসপিবি?

হ্যা, শ্রীপতি পান্ডিতারাধুলিয়া বালাসুব্রমনিয়াম। আমার সালমানের গানগুলোর গায়ক নাকি এই এসপিবি!

এই প্রথম আমি মানুষটার নামের এবং কণ্ঠের প্রেমে পড়ে গেলাম।

তারপর থেকে শত শত দিন কেটে গেছে। মুম্বাইতে অনেক গায়ক এসেছেন, হারিয়ে গেছেন। সুখবিন্দর সিংকে বাদ দিলে এসপিবির মতো করে আমাকে আর কেউ টানতে পারেনি।

এসপিবি ছিলেন দক্ষিনের মানুষ। ফলে মুম্বাইয়ের হিন্দী গানে আমরা যে সুরেলা কণ্ঠ শুনে অভ্যস্ত, সেটার থেকে তিনি একটু অন্যরকম। শব্দগুলো উচ্চারন করতেন নিজস্ব একটা ঢংয়ে। অনেকটাই বেশী পুরুষালি বলে মনে হতো। এই একটু বেশীই তাকে আর দশ জনের থেকে আলাদা করে ফেলেছিলো।

১৯৪৬ সালে তৎকালীন মাদ্রাজ প্রদেশে, এখনকার অন্ধ্র প্রদেশের এক তেলেগু পরিবারে জন্ম এসপিবির। বাবা ছিলেন কথা নাটকের অভিনেতা। নিজেরা আট ভাই বোন। এর মধ্যে অন্তত আরও দু জন সঙ্গীত জগতে এসেছেন।

একেবারে ছোটবেলা থেকেই গানের তালিম নিয়েছেন। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে শুরু করেছিলেন। কিন্তু টাইফয়েডে আক্রান্ত হওয়াতে সেটা শেষ করতে পারেননি। ছাত্র অবস্থায়ই স্থানীয় এক সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠানে সেরা গায়কের পুরষ্কার জিতেছিলেন। এই অনুষ্ঠানে বিচারক ছিলেন দক্ষিনের কিংবদন্তী মিউজিক ডিরেক্টর এসপি কোদান্তপানি। আর এই ভদ্রলোকের হাত ধরেই প্লে ব্যাক শুরু করেন এসপিবি।

দ্রুতই বিভিন্ন দক্ষিনী ভাষায় গান করতে শুরু করেন তিনি। তবে তাকে প্রচারের আলো এনে দেয় ‘শঙ্কারাভরানাম’ সিনেমা। দক্ষিনের ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই চলচ্চিত্রে প্লে ব্যাক করে রাতারাতি সর্বভারতীয় খ্যাতি পেয়ে যান এসপিবি। ১৯৮১ সালে ‘এক দুজে কে লিয়ে’ চলচ্চিত্র দিয়ে মুম্বাইতে যাত্রা শুরু করেন। এই ছবিতে গান করে দ্বিতীয়বার ফিল্মফেয়ার পেয়ে যান এসপিবি।

তবে সারা দুনিয়ায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন ১৯৮৯ সালে ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’ মুক্তি পাওয়ার পর। সালমানের লিপে একের পর এক হিট গান। সালমানের লিপে এরপর কয়েকটা ছবিতে মারাত্মক সব হিট গান করেছেন এসপিবি। এর মধ্যে ‘হাম আপকে হ্যায় কোন’, ‘সাজান’-এর কথা আলাদাভাবে বলতে হবে।

নব্বইয়ের দশকে আরেকটা বড় ব্যাপার ছিলো মনিরত্নম, এ আর রহমানের সাথে এসপিবির জুটি করা। এ আর রাহমানের শেকড় বাঁধা ছিলো কিংবদন্তী সুরকার লাইরাজার কাছে। আবার লাইয়ারাজার প্রিয় শিল্পী এসপিবি। অবশেষে ‘রোজা’ ছবি দিয়ে রাহমানের সাথে এসপিবির জুটি হলো। তাঁর কণ্ঠে ‘রোজা জানে মান’ আজও হাহাকার তৈরী করে।

এসপিবির আরেকটা জীবন ছিলো ভয়েস অ্যাক্টিং। কমল হাসান, অনিল কাপুর, মোহন থেকে শুরু করে রজনীকান্তের পর্যন্ত ডাবিং করেছেন বিভিন্ন ভাষার জন্য।

১৯৯৫ সালের পর থেকে মুম্বাইতে একটু অনিয়মিত হয়ে পড়েন এসপিবি। দক্ষিনে আগের মতোই গান করছিলেন। ২০১৩ সালে ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’-এর টাইটেল সং করে অনেকদিন পর আবার আলোচনায় আসেন।

তারপর থেকে প্লে ব্যাকে একেবারেই অনিয়মিত ছিলেন। মাঝে মাঝে কনসার্টে দেখা যেতো। এই বছরটার শুরু থেকেই শরীরটা খারাপ যাচ্ছিলো। আগস্টের শুরুতে করোনায় আক্রান্ত হলে একটা করপোরেট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিলো। করোনা নেগেটিভ হলেও লাইফ সাপোর্ট থেকে বের করা যায়নি।

অবশেষে চলেই গেলেন; এই পৃথিবীর রং আর তাকে আটকে রাখতে পারলো না।

এসপিবি এই নশ্বর জগত থেকে চলে গেলেন। কিন্তু তার রেখে যাওয়া কৈশোর কে আমাদের থেকে কেড়ে নেবে? কে ভুলিয়ে দেবে আমাদের সেই দরাজ কণ্ঠ!

আমরা চিরকালই আপনার রংয়ে রং মিলিয়ে যাবো। ভালো থাকবেন, এসপিবি!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।