শাফল করে সফল!

কাজটা কঠিন। ঝুঁকিরও। তবে তামিম প্রথম ইনিংসে করে দেখিয়েছেন। দ্বিতীয় ইনিংসেও। সৌম্য সেটিই অনুসরণ করেছেন সম্ভবত।

তামিম এমনিতে স্টেডি থাকতে পছন্দ করেন। স্টান্স, ব্যাক লিফট নিয়ে নিখুঁত থাকতে চান, প্রসেসের বাইরে যান সামান্যই। শাফল কখনও করেন না সাধারণত। তবে এই টেস্টে, মূলত নিল ওয়েগনারের শর্ট বল সামলাতে, বিশেষ করে রাউন্ড দা উইকেটে করা শর্ট বল খেলতে, তামিম শাফল করে ভেতরে ঢুকে খেলেছেন। তাতে পুল-হুক করতে, বল ছাড়তে বা ‘ডাক’ করার জন্যও ভালো পজিশনে যেতে পেরেছেন। আজ সৌম্যকেও দেখলাম শাফল করে সাফল্য পেতে।

ওয়েগনার তো একটি ফর্মূলাই মানে, শরীর তাক করে শর্ট বল। বল সুইং করছিল না বলে বোল্টও আজ একই পথ নিয়েছিলেন সকালে। ক্রমাগত শর্ট বল, বাঁহাতি ব্যাটসম্যানকে রাউন্ড দা উইকেটে শর্ট বল। সৌম্য বিস্ময়কর রকম ভালো সামলেছেন দুজনকেই।

পুল-হুক শটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বল সিলেকশন। কোন লেংথ থেকে কোন উচ্চতার বলে শট খেলব, কোনটা ছাড়ব। যেটিতে শট খেলার সিদ্ধান্ত নেব, সেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কন্ট্রোল। আজ সৌম্যর এই সবকিছুই ছিল প্রায় নিখুঁত। প্রথম হুক শটে শাফল করে ছক্কা পাওয়ার পর হয়তো আত্মবিশ্বাস পেয়ে গিয়েছিলেন।

এমনিতে আমাদের ব্যাটসম্যানরা পুল-হুক শট দুই-তিনটি ভালো খেলে এরপরই গড়বড় করে ফেলেন বল সিলেকশনে বা কন্ট্রোলে রাখতে। আজ ছিল আনন্দদায়ী ব্যতিক্রম। শাফল করে ফাইন লেগে খেলা থেকে তাকে আটকাতে এক পর্যায়ে শর্ট ফাইন লেগে ফিল্ডার রাখা হলো। সৌম্য তবু পথ বের করে নিলেন। বল ছুটতে থাকল, উড়তে থাকল।

সৌম্যর ব্যাটিংয়ের বিশেষত্বই এটি, যেদিন নিজের মতো খেলতে থাকেন, বল যেন সম্মোহিতের মতো তার কথা শুনে!

সকালে আগ্রাসী খেলে, লাঞ্চের আগের আধ ঘণ্টায় যেভাবে সাবধানে খেললেন সেশন কাটানোর জন্য, আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে সেই অংশটুকু।

সৌম্য কিছু ভেবেছেন, একটি দারুণ পরিকল্পনা করেছেন, সেটির প্রয়োগও করেছেন সফলভাবে, সাহস দেখিয়েছেন, বিশ্বাস রেখেছেন নিজের ব্যাটিংয়ে, এই সবকিছুই দারুণ ব্যাপার। আশা করি, নিজেকে আরও ভালো করে চিনতে, আরেকটু পরিণত হয়ে উঠতে এই ইনিংস তাঁর টনিক হিসেবে কাজ করবে।

নিউ জিল্যান্ড গত সফরেও টেস্ট দলে ফিরেছিলেন সৌম্য। ইমরুলের চোটের সুযোগে ক্রাইস্টচার্চে ফিরে খেলেছিলেন ৮৬ রানের ইনিংস। সেটিই কাল টেস্টে তার সর্বোচ্চ। এবার সুযোগ মিলেছে সাকিবের চোটে। খেললেন প্রথম শ্রেণির ক্যারিয়ারেই সর্বোচ্চ ইনিংস।

দেশে ১২ ইনিংসে তাঁর টেস্ট ব্যাটিং গড় এখন ১৬.৮৩, সর্বোচ্চ ৩৭। দেশের বাইরে ১২ ইনিংসে গড় ৪৪.৬৬, সেঞ্চুরি একটি, ফিফটি ৪টি।

তার ঘরানার ব্যাটসম্যানদের জন্য মানসিকতা শক্ত থাকা বা রাখার বিকল্প নেই। চারপাশে ভ্রুকটিকে উপক্ষো করে খেলতে হবে। নিজেকে নিয়ে সংশয় করা যাবে না। দ্বিতীয় নতুন বলে ট্রেন্ট বোল্ট সুইং পেতে শুরু করলেন। সৌম্য একটা বলে পরাস্ত হলেন। হয়তো সংশয়ও ঢুকল মনে। সাউদিকে ঠিকই তিনটি চার মারলেন ওভারে। বোল্টের বলে দ্বিধার কারণেই কাভার করতে পারলেন না লাইন। বোল্ড।

সৌম্য নিজের দ্বিধা জয় করবেন। অন্যদের সংশয় দূর করবেন। সেই দিনের স্বপ্ন দেখি। সৌম্যদের প্রজন্ম সেই পর্যায়ে গেলে আমাদের ক্রিকেটও নতুন উচ্চতায় উঠবে। নইলে আবার পেছন থেকে শুরু!

ক্রিজের ব্যবহার মাহমুদউল্লাহও বেশ ভালো করেছেন। সুইং হচ্ছে না, ফুল লেংথ বল বেশি করবে না বুঝেই ক্রিজের অনেক ডিপে গিয়ে ব্যাট করতে পেরেছেন। তাতে শর্ট বল খেলা সহজ হয়েছে। ওয়ানডে সিরিজে বলের কাছেই পা যাচ্ছিল না তার, বিশেষ করে লকি ফার্গুসনের গতিময় বলে শরীরের দূর থেকে খেলেছেন বারবার। তার মানের একজন ব্যাটসম্যানকে ওভাবে ভড়কে যেতে দেখা ছিল হতাশার।

আজকে নিজের সত্যিকার জাত আরেকবার দেখিয়েছেন। টড অ্যাস্টলের প্রথম ওভারেই যে দুটি চার মারলেন, আহ! পিউর ক্লাস! সেঞ্চুরির পর ওয়েগনার-বোল্টের বলে যে শটগুলো যতটা অথোরিটি নিয়ে খেলেছেন, অসাধারণ। প্রতিটি শটে নিজের ব্যাটসম্যানশীপের ছাপ রেখেছেন। আমার মঝে মাঝে মনে হয়, তিনি এখনও নিজের সামর্থ্য, নিজের মান পুরো বুঝে উঠতে পারেন না। বুঝলে আজকের মতোই আরও আত্মবিশ্বাসী থাকতেন বেশির ভাগ দিন।

তার টেস্ট ক্যারিয়ারটা বিবর্ণ থেকে গেলে নিজের প্রতি বড্ড অবিচার করা হবে। এখন সাজাতে শুরু করেছেন, সাদা পোশাকে নিশ্চয়ই আরও রঙিন হয়ে উঠবেন।

তামিমকে নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই। ওয়েলিংটন ও ক্রাইস্টচার্চেও উইকেট সাধারণত শুরুর সময়টা কাটাতে পারলে ব্যাটিংয়ের জন্য দারুণ হয়। আমি তামিমের কাছে আরও ২টি সেঞ্চুরি চাই। সিম্পল।

তিন সেঞ্চুরির পরও আমরা ইনিংসে হেরেছি। দল যেন সেটি ভুলে না যায়, ঢাল না বানায়। করার আছে অনেক কিছু!

– ফেসবুক ওয়াল থেকে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।