লর্ড অব কর্ডস: দ্য কিউরিয়াস কেস অব সনু নিগম

তখন ১৯৭৭ সাল। সনু নিগম স্টেজে প্রথম উঠেন মাত্র ৪ বছর বয়সে। বাবার সাথে মোহাম্মদ রাফির কিয়া হুয়া তেরা ওয়াদা পারফর্ম করেন। এভাবেই বিভিন্ন বিয়ে, পার্টিতে গান গাওয়া শুরু তাঁর।

১৯৭৩ সালের ৩০ জুলাই হারিয়ানার ফরিদাবাদে জন্মগ্রহণ করেন সনু নিগম। বাবা গানের মানুষ, সনুর ভাষায় মায়ের মিউজিক সেন্স আরও ভালো। এভাবেই ছোট থেকে গানের সাথেই বেড়ে উঠেছেন তিনি।

সনু নিগাম তার সঙ্গীতে যাকে ঈশ্বর মনে করেন, মোহাম্মদ রাফি। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া সনুর একটা ছোট হারমোনিয়াম ছিলো। রেডিও, ক্যাসেটে রাফিজির গান শুনতেন আর হারমোনিয়ামে তুলে ফেলতেন। এভাবেই পরিপক্কতা আসতে শুরু করে। আজকের এই অবস্থানের জন্য নিগাম সবসময় কৃতজ্ঞ মোহাম্মদ রাফির প্রতি। তাই তো তাঁর ঈশ্বর, অনুপ্রেরণা মোহাম্মদ রাফিকে ট্রিবিউট করে একাধিকবার অ্যালবাম, গান করেছেন। সনু নিগামকে অনেকে অবশ্য দ্বিতীয় রাফি বলে থাকে।

১৯৯০ সালে সনু নিগমের বয়স যখন ১৮, তার ক্যারিয়ারের জন্য পুরো পরিবার মুম্বাইয়ে চলে আসে। বলিউডে মেইনস্ট্রিমে আসতে আসতে আরও সাতটা বছর কেটে যায়। ১৯৯৭ সালে ‘বর্ডার’ মুভির সান্দেশ আতে হ্যায় আর পারদেশের এ দিল দিওয়ানা দিয়ে আলোচনায় আসেন।

১৯৯৯ সালে মুক্তি পাওয়া সনু নিগমের নন ফিল্মি অ্যালবাম ‘দিওয়ানা’ সেসময়ের অন্যতম জনপ্রিয় ও বেস্ট সেলিং অ্যালবাম। এরপর ক্যারিয়ার একটু একটু বড় হতে থাকে। কিছু ইংরেজিসহ ডজনখানেক ভাষায় গান করেছেন তিনি। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার, ফিল্মফেয়ারসহ অনেক সম্মাননা আছে তার ঝুলিতে।

যখন ডাবিং এর ট্রেন্ড ছিলো না, যে অভিনেতার প্লে-ব্যাক করা হচ্ছে তার মুখ খোলার ধরণ অনুযায়ী গায়করা কণ্ঠ দিতেন। কণ্ঠ কিন্তু একটাই, শুধু গায়কীটা একটু পাল্টে সুন্দর ভিন্নতা আনা হতো। এই যেমন নিগাম যখন শাহরুখ খানের প্লে-ব্যাক করতেন তখন একরকম, গোবিন্দতে একরকম। কমিক গানগুলোতেও ছিলো মাধুর্যতা। সেসময়ের সব ক্ষেত্রেই দক্ষতা দেখিয়েছেন নিগাম। আবার প্লে-ব্যাকের তুলনায় তাঁর একক অ্যালবামের গানগুলোর আছে বিস্তর পার্থক্য। এসব নানান কারণে তাঁকে অন্যতম ভার্সেটাইল গায়ক হিসেবে পরিচিত করেছে।

সনু নিগমকে বলা হয় লর্ড অব কর্ডস। দ্রুত স্কেল চেঞ্জ করাতে দারুণ পারদর্শী তিনি। শুধু তাঁর গানেই না,  ‍পূর্বসুরী কিংবদন্তিদের ট্রিবিউট পারফরম্যান্সগুলো দেখলেই বোঝা যায় কতটা ভার্সেটাইল তিনি। এক স্টেজেই মোহাম্মাদ রাফি, ভূপেন হাজারিকা, ওস্তাদ সুলতান খানকে ট্রিবিউট করার সময় নিজের স্বকীয়তা বজায় রেখে তাঁদের ফ্লেভারও রাখেন।

স্টেজে কণ্ঠের ব্যালেন্স বজায় রেখে নেচে, লাফিয়ে গাওয়াতে তিনি অতুলনীয় বারবার প্রমাণ করেছেন, করছেন। সঙ্গীতের সরস্বতী খ্যাত লতা মঙ্গেশকর সনু নিগামকে নিয়ে বলেন, ‘তার কণ্ঠস্বর, গায়কী এতটাই সুন্দর; আমার বিশ্বাস সে যেখানেই গাইবে ভালো গাইবে।’

শুধু অসাধারণ গায়কীই না, সনু নিগমকে বেশ কয়েকটা কারণে ভালো লাগে। রিয়ালিটি শো’র হোস্ট থেকে জাজ সবখানেই তাঁর দক্ষতার জুড়ি মেলে। অ্যাওয়ার্ড শো’র হোস্টিংও অনেক এনার্জিটিক। সবচেয়ে ভালো লাগে তাঁর সঙ্গীত নিয়ে ফিলোসোফিকাল কথা আর গান নিয়ে খেলা। বলিপাড়ায় মিমিক্রিকে অন্য পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। গান নিয়ে খেলার আরও কিছু উদাহরণ ৪ মিনিটে ২৭টা গান গাওয়া, পার্টি গানগুলো ক্লাসিকাল/গজল ফরমেটে গাওয়া ইত্যাদি। আবার লিরিক্স পাল্টে অডিয়েন্সের সাথে যোগাযোগ, সূর পাল্টে গাওয়া এসব তো তাঁর নিত্যদিনের ঘটনা।

সিনিয়র আর্টিস্টরা সবসময় তাঁকে স্নেহের দৃষ্টিতে দেখেন। আবার অরিজিৎ, আরমান মালিকসহ এখনকার গায়কদের বড় অংশ তাঁকে আইডল মানে। আছে এক বর্ণাট্য ক্যারিয়ার। তারপরও ২০১০ এর আসতে আসতে বলিউড তাঁকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে৷ রয়ালটি, কপিরাইট নিয়ে মিউজিক কোম্পানিগুলোর সাথে দ্বন্দ্ব শুরু হয় গত দশকের শুরুর থেকে। এক গান থেকে তারা সারাজীবন আয় করছে অথচ মোহাম্মদ আজিজের মতো কিংবদন্তির সংগ্রহে শেষ বয়সে তেমন কিছু থাকছে না।

আর্টিস্টের শো থেকে পার্সেন্টেজ নেওয়া, কনটাক্টে একক আধিপত্যের বিরুদ্ধে সবসময় কণ্ঠ তুলছেন। এখন মিউজিসিয়ানদের উপর কোম্পানিগুলো যেভাবে হস্তক্ষেপ করে তাতে দূরে যেতে বাধ্য করেছে সনুকে। এছাড়াও বলিউডের অনেকে যখন পাকিস্তানি আর্টিস্ট ব্যান করার কথা বলছিলো তখন সনু তাদের পক্ষে বলেছে। একাধিকবার আতিফ আসলামের সাথে শো করেছে, সাপোর্ট দিয়েছেন।

এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার দেশের ধর্ষকটাকে ভাই বলতে হবে অথচ পাকিস্তানের ভালো মানুষটাকে শত্রু ভাবতে হবে দেশপ্রেমের নামে?’ এছাড়াও এখনকার ট্রেন্ড ডাবিং এর বিরোধিতাও করেন তিনি। এক গানে এত কিছু যুক্ত করা যায়, এত অলঙ্কার লাগানো যায় অথচ এসবে মনোযোগ না দিয়ে একই গান কয়েকজনকে দিয়ে গাওয়ানোর পর যারটা ইচ্ছে হচ্ছে ব্যবহার করছে। মূলত এসব কারণে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে অনেক প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে যাচ্ছেন। ফলশ্রুতিতে বলিউডের তার উপর একটা নিরব বয়কট চলছে বহুদিন ধরে। শুধু সনু কেন ইন্ডাস্ট্রির কলুষিতায় পূর্ব প্রজন্মের অনেকেই বলিউড ছেড়েছে।

তিনি গায়ক পরিচয় ছাপিয়ে বিরাট এক এন্টারটেইনার। কৃতজ্ঞতা একটা সুন্দর শৈশব-কৈশোর উপহার দেওয়ার জন্য। বলিউড মিউজিক একদিন স্বমহিমায় ফিরে আসবেন নিশ্চয়ই।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।