এই কাঁটাগুলোই একদিন বিশ্বকাপের ফুল হয়ে ফুটবে

ক্রিকেট বেশির ভাগ সময়ই জীবনের মতো। কখনও দেবে, কখনও কেড়ে নেবে।

এই টুর্নামেন্টে দুটি রুদ্ধশ্বাস ম্যাচ জিতেছে বাংলাদেশ। ৩৫ হাজার দর্শককে স্তব্ধ করে, দুইশর বেশি রান তাড়া করে নিজেদের সামর্থ্যের সীমানা বাড়িয়ে জিতেছে। গগণবিদারী চিৎকার ও উত্তেজনায় ফুটতে থাকা গ্যালারির সামনে শেষ ওভারের ছক্কায় জিতেছে। ক্রিকেট হয়ত ভেবেছে, একই দলের তিনটি এমন জয় বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যায়!

আগের ম্যাচে শ্রীলঙ্কান ব্যাটিং শুরুতে ধুঁকল। পরে ১৬০ রানের লক্ষ্য দিল। ফাইনালে বাংলাদেশের ব্যাটিং শুরুতে ভুগল। পরে একইরকম লক্ষ্য ছিল। রান তাড়ায় আগের দিন ওপেনিংয়ে তামিম হাফসেঞ্চুরি করল। শেষ দিকে রিয়াদ অসাধারণ ইনিংসে জেতাল। ফাইনালে রোহিত ফিফটি করল। কার্তিক অভাবনীয় ইনিংস খেলে জেতাল।

এভাবেই কখনও মিলবে অভাবনীয় উচ্ছ্বাস, কখনও অসহনীয় বেদনা।

ক্রিকেট বেশির ভাগ সময়ই জীবনের মতো। সাফল্য ও ব্যর্থতার ব্যবধান কখনও কখনও খুব সূক্ষ্ম।

৩ ওভারে ১৩ রান দিয়ে রুবেল নায়ক হওয়ার অপেক্ষায়। কে জানত, বাকি ১ ওভারেই জীবন হয়ে উঠবে দূর্বিসহ!

ওই ওভারের ভেতরের কথাও ভাবুন। প্রথম বলটি লো ফুলটস। কয়েক ইঞ্চি পেছনে থাকলে হয়ত ইয়র্কার হতো। তৃতীয় বলের ছক্কার বলটি কয়েক ইঞ্চি সামনে থাকলে হয়ত ইয়র্কার হতো। সাফল্য-ব্যর্থতার ব্যবধান কখনও ওই ইঞ্চিখানেক। সৌম্যর অসাধারণ শেষ ওভারটির ক্ষেত্রেও সত্যি। একটি বল, ইঞ্চিখানেক এদিক-সেদিক থাকলেও হয়ত বাংলাদেশই জিতত!

ক্যারিয়ারের শুরুতে রুবেলের মুরালি-শিক্ষা হয়েছিল। রুবেল পরে কাইল মিলসের স্টাম্প উপড়ে আনন্দে ভেসেছেন, ভাসিয়েছেন। নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করছেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই জয়ে উড়েছেন। আরও অনেক অনেকবার শেষের দাবী মিটিয়েছেন অধিনায়কের আস্থা হয়ে। এবার রুবেলের কার্তিক-শিক্ষা হলো। নিশ্চয়ই আবার কোনো মিলস, আরেকটি হ্যাটট্রিক বা বড় কোনো মঞ্চে এমন কোনো ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া হয়ত রুবেলের ছোবলের অপেক্ষায়।

এই ম্যাচে শেষ সময়ে বোলিংয়ে যে বিশাল হৃদয়র প্রমাণ রেখেছেন, এটিই হয়ত এখন থেকে সৌম্যকে সত্যিকারের অলরাউন্ডার হওয়ার পথে এগিয়ে নেবে।

ক্রিকেটের কাছে তো দিনেশ কার্তিকেরও তো কিছু পাওনা ছিল। একজন ধোনির আড়ালে থেকেই কেটে গেল ক্যারিয়ারে বেশির ভাগ। তার পরও হাড় ভাঙা খাটুনি, নিবেদন আর হার না মানসিকতা দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়া, একটু উন্নতির চেষ্টায় অনেকটা ঘাম ঝরানো, বারবার বাদ পড়েও পারফরম্যান্স দিয়ে আবার ফেরা… কিছু পুরস্কার তো প্রাপ্য!

এদিন হয়ত কার্তিকের প্রাপ্তির মঞ্চই সাজানো হয়েছিল যত্ন করে। শেষের নায়কের চরিত্র এদিন শুধু তার জন্যই বরাদ্দ ছিল। নইলে প্রথম বলেই লো ফুল টসে ছক্কার মারার দু:সাধ্য কাজ, দ্বিতীয় ছক্কায় কবজির মোচড়ে আসুরিক শক্তি, শেষ বলের ছক্কাটিরও কোনো রকমে সীমানা পার হওয়া, এসব যেন হওয়ারই কথা ছিল।
কার্তিকের এটি এক জীবনের ইনিংস!

৯ বছরে আমাদের ৫টি ফাইনাল হারের বিষাদময় প্রহরগুলিও একদিন আনন্দের অভয়ারণ্য হয়ে উঠবে।

২০০৭ বিশ্বকাপ, ২০০৯ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, ২০১১ বিশ্বকাপ, ২০১২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ… এই ফাইনালগুলো টানা হেরেছিল মাহেলা-সাঙ্গা-মালিঙ্গার শ্রীলঙ্কা। ক্রিকেট তাদের ফিরিয়ে দিয়েছে এক মাসের মধ্যে দুটি ট্রফি। ২০১২ এশিয়া কাপ এবং টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। মাহেলা-সাঙ্গাদের ক্যারিয়ারে অপূর্ণতা ঘোচানো একমাত্র বিশ্বকাপ।

আমাদের ফাইনাল হারের কাঁটাগুলোও একদিন হয়ত বিশ্বকাপের ফুল হয় ফুটবে!

– ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।