অমুকেরাও তো তমুক করেছে!

১.

ধানমন্ডির ওইদিকে একবার সম্ভবত কোন এক ওষুধের দোকানে ভেজাল ওষুধ পাইছিল ভ্রাম্যমাণ আদালত। সেই অভিযানের প্রতিবাদ জানায়ে ওষুধের দোকানিরা দোকান বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিছিল।

২.

সিলেট রুটে বাসের চাপায় একবার এক শিক্ষার্থী মারা যাওয়ায় ড্রাইভার গ্রেফতার হইছিল। কেন তারে গ্রেফতার করা হইলো, এইটার প্রতিবাদে মালিক সমিতি ওই রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দিছিল।

৩.

কয়েকদিন আগেই পুরান ঢাকায় রাসায়নিক পণ্যের গুদাম ও কারখানা উচ্ছেদে টাস্কফোর্স অভিযান চালাইছিল। সেই অভিযানে একজোট হয়ে বাঁধা দিছিল রাসায়নিক ব্যবসায়ীরা।

এইবার পুরান ঢাকার এক রাসায়নিক ব্যবসায়ীকে ১ আর ২ নং ঘটনাটা দেখান। নিশ্চিতভাবেই সে বলবে, ‘ওষুধের দোকানদারগুলা বদের হাড্ডি। আর ড্রাইভারগুলা তো অমানুষ। এদের কাছে মানুষের জানের দাম নাই।’

কোন এক বাস ড্রাইভাকে ১ আর ৩ নং ঘটনাটা দেখান। নিশ্চিতভাবেই সে বলবে, ‘ওষুধের দোকানদারগুলা তো বদের হাড্ডি। আর পুরান ঢাকার রাসায়নিক ব্যবসায়ীরা তো টাকা ছাড়া কিছুই বুঝে না। এদের কাছে মানুষের জানের দাম নাই।’

কোন এক ভেজাল ওষুধ বেচা লোকেরে ২ আর ৩ নং ঘটনাটা দেখান। তার প্রতিক্রিয়া হবে, ‘ড্রাইভারগুলা তো অমানুষ। আর ওষুধের দোকানদারগুলা বদের হাড্ডি। এদের কাছে মানুষের জানের দাম নাই।’

এই তিনটা সেক্টর হচ্ছে তিনটা উদাহরণ। এরকম আরও অনেকগুলা পয়েন্ট যোগ করা যায়। এবং নিজের সেক্টর বাদ দিয়ে বাকি সেক্টরগুলার অবস্থা কাউকে দেখালে সে একইরকম প্রতিক্রিয়া দেখাবে। বাকি সেক্টরগুলা যে ঠিক নাই, সেইখানে যে আসলে নানান অনিয়ম, এইসব অকপটে স্বীকার করার মতো লোকের অভাব নাই দেশে।

স্বীকার তো করলো, এইবার তার সেক্টরের অপকর্মগুলা একটু উল্লেখ করেন। দেখবেন, তেড়ে আসছে। এবং সর্বাগ্রে যে যুক্তিটা দিবে সেইটা হলো, ‘অমুকেরাও তো তমুক করেছে। তাদেরকে কিছু বলতে পারেন না?’

বাসওয়ালা ৫ টাকা বেশি ভাড়া চেয়ে যুক্তি দেয়, ‘রিকশাওয়ালা ২০ টাকা বেশি চাইলে তো কিছু কন না!’ রিকশাওয়ালা ২০ টাকা বেশি চেয়ে যুক্তি দেয়, ‘সিঞ্জিওয়ালা মিটারে ৫০ টাকা বেশি চাইলে তো কিছু কইতে পারেন না!’

মানে অন্যে চুরি করতেছে মানেই আমার চুরি করা জায়েজ। অন্যে আকাম করতেছে মানেই আমার আকাম করাটাও দোষের না। অন্যে অনিয়ম করতেছে মানেই আমিও অনিয়ম করার অধিকার পেয়ে গেলাম। এই দেশের বেশিরভাগ পেশার মানুষের মন-মানসিকতাই এইরকম।

এরা অন্য কোন পেশার মানুষদের সাধারণত প্রফেশনালের কাতারে ফেলতেই রাজি না। ইঞ্জিনিয়াররা ডাক্তারদের খুব একটা ভালো চোখে দেখে না, ডাক্তারদের কাছে আবার ইঞ্জিনিয়ারিং একটা তেজপাতা টাইপ ব্যাপার। এই দুই পেশার লোকেদের কাছে বাকি সব পেশার তেমন কোন বেইলই নাই। বাকি সব পেশার মানুষদের কাছে আবার ডাক্তাররা কসাই, ইঞ্জিনিয়াররা ঘুষখোর, উকিলরা রক্তচোষা ব্লা ব্লা ব্লা। কিন্তু এদের সবার মধ্যে একটা ঐক্য আছে। যখনই নিজেদের পেশার অনিয়মগুলা সামনে আনা হয়, তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অন্য পেশার অনিয়মগুলা দিয়েই এরা সেগুলোকে জায়েজ করে।

গল্পের রাজা নাকি সব প্রজাদেরকে তার পুকুরে এক ঘটি করে দুধ ঢালতে বলেছিলেন। সব প্রজাই চিন্তা করেছিল, বাকি সবাই তো দুধই ঢালবে, আমি এক ঘটি জল ঢাললে সেইটা বুঝা যাবে না। এই চিন্তা করে সবাই এক ঘটি জল ঢেলেছিল। দুধের পুকুর হবার বদলে সেটা জলের পুকুরই হয়েছিল।

এই দেশেও সব প্রফেশনের মানুষই ভাবে – বাকি সবাই সোজা পথে থাকুক, আমি একটু বাঁকা পথ নিলে কীই বা ক্ষতি? একই চিন্তা সবাই করায় কারোরই আর সোজা পথে থাকা হয় না। নচিকেতার ভাষায় –

সোজা পথ পোড়ে পায়ে, সোজা পথে কেউ চলেনা

বাঁকা পথ জ্যাম হরদম, জমজমাট ভিড় কমে না!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।