বাংলাদেশ ক্রিকেট বঁড় প্যাচের জায়গা!

বিসিবি তখনও যেমন এখনও তেমন। এই তো ২০০০ সালের শুরুর দিকের কথা। বাংলাদেশের ক্রিকেটের একজন কিংবদন্তী খুব ফর্মে থাকলেও জাতীয় দলের সুযোগ পেলেন না। অনুশীলন ম্যাচ তার জন্য এক বড় সুযোগ এনে দিলো। কিন্তু সেখানেও তাঁকে ডাকা হলো না। তিনি তো তাজ্জব!

এক নির্বাচক যিনি তাঁর সাবেক সতীর্থও তাঁকে জিজ্ঞেসও করলেন, কি কারণে দলে নেয়া হয়নি।

‘তোরে নিলে যদি সেঞ্চুরি করে ফেলতি, তখন কি করতাম!’

এখন সেই অনুশীলন ম্যাচটাই যক্ষ্মের ধন নয়। এখন আরো অনেক কিছুই অবলম্বন হওয়ার কথা এ দেশের ক্রিকেটে। জাতীয় লিগ যার অন্যতম। সেখানে তুষার ইমরান অনেক রান করেছেন। অনেক। তাঁর সঙ্গে আরো অনেকেই রান করেন। কিন্তু তুষারের মত পারেন না। বছরের পর বছর সেখানে তিনি রান করেন। সেঞ্চুরি করেন। ম্যাচ সেরা হন। দেখতে দেখতে প্রায় দেড় যুগের ক্যারিয়ারে তাঁর এখন ১১ হাজার রান। এ মৌসুমেও যাঁরা খেলেছেন তাঁর সঙ্গে বা প্রতিপক্ষ হয়ে, তাঁরা তুষারকে রানে আচ্ছাদিত করতে পারেননি। তারপরও তুষার জায়গা পান না।

নূরুল হাসান সোহান হয়তো আরো বিস্মিত। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে অন্যরা যখন যাচ্ছেতাই অবস্থায়, তখন তিনিই হাল ধরার চেষ্টা করেছেন। তিনিও টেস্ট দলে নেই। কেনো নেই?

এই উত্তর তুষার, সোহান কারোরই জানা নেই।

এই হতভাগ্যদের দলে আরেকজন থাকবেন। তিনি নাইম ইসলাম। ঘরোয়া লিগে রান করলে, উইকেট পেলেই যে জাতীয় পর্যায়ে সুযোগ পাওয়ার নিশ্চয়তা নয়, তার বড় আরেক প্রমাণ।

তাহলে এই ক্রিকেটাররা রান করবেন কোথায়? উইকেট পাবেন কোথায়? জাতীয় লিগে করলেও হয় না, বিসিএলে করলেও হয় না। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগেও না। তাহলে থাকে এক বিপিএল! টি টোয়েন্টি ক্রিকেট কি তবে ওয়ানডে আর টেস্ট দলে সুযোগ দেয়ার বড় প্লাটফর্ম?

এই প্রশ্নের উত্তর প্রধান নির্বাচক থেকে শুরু করে বিসিবি প্রধান দিয়েই গেছেন। গণমাধ্যম বিস্মিত হয়েছে কেবল।

ঘরোয়া লিগে রান বা উইকেট নেয়াটা যোগ্যতা যদি না হয়, তবে তার দায়ভার কার ওপর যায়? বিসিবি’র নিশ্চয়! তো নিজেদের টুর্নামেন্ট যদি নিজেদের মন ভরাতে না পারে, তাহলে তো শোকে-দু:খে কাউকে পদত্যাগ করতে দেখলাম না! আবার একই জাতীয় লিগে কেউ মোটামুটি গোছের ক্রিকেটার পারফরর্ম্যান্স করলেও সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন। এবারের টেস্ট স্কোয়াডে জাতীয় লিগে সেরা দশে আছেন তাদের একজনেরই মাত্র জায়গা হয়েছে টেস্ট দলে। তাহলে ঘরের মাঠে ভাল খেলাটা কি তবে পাপ?

এই নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা নিয়ে কেউ কোন কথা বলবেন না। নাজমুল পাপন যদিও ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তুষারকে টেস্ট স্কোয়াডে যদি রাখাও হয় একাদশে খেলার সম্ভাবনা কম। শেষ পর্যন্ত স্কোয়াডেও ডাক পড়েনি! তার মানে এখন নির্বাচক প্যানেলকে চাইলে যে কেউই স্বাধীন বলতে পারেন।

শেষ ওয়ানডের আগে যেমন মাশরাফী বলছিলেন, একাদশে কোন পরিবর্তেনের জন্য টিম ম্যানেজমেন্ট ও নির্বাচকদের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন। কিন্তু মূল একাদশ সব সময় তো অধিনায়কের সিদ্ধান্তেই হবে! নির্বাচকরা আসেন কিভাবে? কোনটা যে ঠিক, কোনটা বেঠিক, এটা আসলে বোঝা কঠিন। কারণ প্রতিটি পদক্ষেপই দ্বিধাযুক্ত।

গণমাধ্যম খুব কাছ থেকে যা দেখে তাতে করে বিশ্লেষণে বেরিয়ে পড়ে অনেক দ্ব্যর্থবোধক ঘটনা। তুষারকে না ডাকায়, নূরুলকে বাদ দেয়ায় এ দেশের ক্রিকেটে কোন ঝড় উঠবে না। কিন্তু পদ্ধতির যে কথাটা বারবার বিসিবি, নির্বাচক, ক্রিকেট অপারেশন্স, এমনকি ক্রিকেটাররাও বলে থাকেন সেটা অনুপস্থিত থাকলে তো অনেক রটনা উঠবে। সবাইকে সন্তুষ্ট করা যায় না একট দল নির্বাচনে। এটা যেমন স্বাভাবিক ব্যাপার। একই সঙ্গে একটা দল নির্বাচনের আগে এতো বিতর্ক জন্ম দেওয়া অস্বাভাবিক।

ক্রিকেট মাঠে নির্বাচকদের মাঝে মধ্যে আমি খুব নাজুক অবস্থায় দেখি। কখনো কখনো অধিনায়ককেও দেখেছি নিজের চাহিদাপত্র অনুযায়ী দল না পেয়ে হতাশ হতে। কিন্তু সম্প্রতি নাজমুল হাসান পাপন ইঙ্গিত দেয়ার পরও তুষারকে স্কোয়াডের বাইরে রাখায় আমি আশাবাদী হতে চেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম সুদিন ফিরছে। নিজেদের মত করে দল সাজাতে পারবেন তাঁরা। কিন্তু সেখানেও তো জাতীয় লিগে হাজার হাজার রানগুলো কোন পাত্তা পায় না।

কথায় আছে, তোমাকে বধিবে যে গোকূলে বাড়িছে সে!

এটা যে কথার কথা নয়, তা সাম্প্রতিক ক্রিকেট ইতিহাসে বাংলাদেশের দ্ব্যর্ধবোধক দৃষ্টিভঙ্গীতে স্পষ্ট। নিজেদের আসর বিসিবি বা নির্বাচক কারো কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হলে, সেই লিগ তাহলে চালানোরই দরকার কি! আর তুষার সহ অন্য ক্রিকেটাররা ঝুড়িঝুড়ি রান করলেও তো সেটা নিশ্চয়তা নয় জাতীয় পর্যায়ে খেলার!

এ এক বড় প্যাঁচের জায়গা! এই গিট্টু খোলার দায়িত্ব যাদের, তাঁরাই তো আবার দাঁড়িয়ে আছেন ঘোর অমবস্যায়। সেই ঘুটঘুটে অন্ধকার দূর হোক।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।