আট কোটি মানুষের ঘৃণার পাত্র হয়েছিলেন তিনি!

৭৩ বছর আগের কথা!

রানী ভিক্টোরিয়ার নাতি লর্ড মাউন্ডব্যাটেন ভারতবর্ষের শেষ ভাইসরয়, তখন সেখানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রদীপ নিভু নিভু করে জ্বলছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাসা বেঁধেছে ভারতের বুকে। কংগ্রেস শুরু থেকেই অখণ্ড ভারতের স্বাধীনতার দাবিতে অটল ছিলো।

আর মুসলিম লীগ দ্বি-জাতি তত্ত্ব আঁকড়ে ধরে ভারতীয় মুসলমানদের আলাদা এক রাষ্ট্র পাকিস্তানের দাবি থেকে একচুল নড়বার জন্যও প্রস্তুত নয়। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আর এর ফলে উদ্ভুত সকল সমস্যা এড়াতে মাউন্টব্যাটেন তাই দ্বারস্থ হচ্ছিলেন ভারতীয় রাজনীতিবিদদের কাছে।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মাউন্টব্যাটেনকে সরাসরি প্রস্তাব দিলেন এক জীবন্ত ব্যবচ্ছেদের। কিন্তু এই সার্জিক্যাল অপারেশনের আগে রোগীকে যে অ্যানেস্থেশিয়া দিয়ে অজ্ঞান করতে হবে, সেটা করবে কে?

এর জন্য এক কাজ করলেন মাউন্ডব্যাটেন! তিনি ধরে আনলেন সিরিল র‍্যাডক্লিফ নামের এক ভদ্রলোককে ভারতবাসীকে অ্যানেস্থেশিয়া দেয়ার জন্য।

ভদ্রলোক ব্রিটেনের চ্যান্সারি বারের দক্ষ আইনজীবী ছিলেন। ব্রিটেনে তাঁর আইনি সাফল্য আর খ্যাতি ছিলো অনেক। কিন্তু ভারতের ব্যাপারে আগ্রহ কিংবা অভিজ্ঞতা কোনোটাই ছিলো না এই আইনজীবীর।

আইন বিষয়ক কাজের বাইরে অভিজ্ঞতা বলতে তার ঝুলিতে ছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনের তথ্য মন্ত্রণালয়ের ডিরেক্টর জেনারেল হিসেবে কাজ করা। র‍্যাডক্লিফকে সীমান্ত নির্ধারণ কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলো!

এতো বড় দেশভাগের দায়িত্ব একা এক ব্যক্তির কাঁধে দেওয়া সমীচীন হবে কিনা, তা নিয়ে বেশ চিন্তায় ছিলেন মাউন্টব্যাটেন। তবে এই ব্যাপারে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তাকে পরামর্শ দিলেন, একজন চেয়ারম্যান হলে তিনি সঠিকভাবে দুই সীমান্তের লাভ-ক্ষতির ব্যাপারটি বুঝতে পারবেন এবং যথাযথ সমাধানও দিতে পারবেন।

কিন্তু ৪০ কোটি জনগণের এই ভারতবর্ষকে ভাগ করতে মাত্র ৫ সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছিল এই আইনজীবীকে! বিশাল ব্রিটিশ ভারতের ভৌগোলিক অবস্থা সম্পর্কে দূরে থাক, যে দেশকে তার কাছ কেটেকুটে দুভাগে ভাগ করার জন্য দেওয়া হলো, তার ঠিকঠাক মানচিত্রটিও তিনি পেলেন না।

এ ধরনের কাজে পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া র‍্যাডক্লিফ কাজ শেষ করার সময় পেলেন মাত্র ৫ সপ্তাহ। বহু বছরের পুরাতন সেই মানচিত্রের সামনে বসে ধর্মকে সামনে রেখে লাইন টানা শুরু করলে যে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে এই বিষয়ের ন্যূনতম কোনো ধারণাও ছিলো না।

বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে নানা ঝক্কি ঝামেলা পেরিয়ে ১৯৪৭ সালের ১২ আগস্ট সিরিল র‍্যাডক্লিফ তার রিপোর্ট তৈরি করেন। তিনি ঘোষণা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত, কিন্তু মাউন্টব্যাটেন তা পিছিয়ে দিলেন।

১৪ আগস্ট পাকিস্তানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হলো, ১৫ আগস্ট ভারতের হাতে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, দুই দেশের মানুষ যখন স্বাধীনতার উল্লাস করছে, তারা তখনো জানে না, কোথায় তাদের সীমান্ত শেষ আর কোথায় তার শুরু।

১৭ আগস্ট প্রকাশিত হলো বহুল প্রত্যাশিত সেই র‍্যাডক্লিফের সীমান্ত কমিশনের রিপোর্টের গেজেটেড কপি। ভারতভাগের আসল ভয়াবহতার শুরু সেদিন থেকেই।

ধীরে ধীরে সারা ভারত জুড়ে ব্যবচ্ছেদ শুরু হয়ে গেলো। সরকারি গেজেট থেকে জেলা-থানা গড়িয়ে যতই গ্রাম অবধি সেই সীমান্ত কমিশনের রিপোর্ট যেতে শুরু করলো, ততই যেন সাধারণ মানুষের হাহাকার বাড়তে লাগলো।

এবার বলি সীমানা নির্ধারন কমিটির কথা- কমিটিকে যেসব দলিলপত্র, বই, ম্যাপ দেয়া হয়েছিল; র‍্যাডক্লিফের নিজের ভাষাতেই, যেগুলো ছিলো ভুল তথ্যে ভরা, অনেক পুরোনো পরিসংখ্যানে ভরা, এবং মিথ্যে তথ্যে ভরা কাগজপত্র। যা পড়ে এবং যার সাহায্য নিয়ে তার কোনো লাভই হয়নি।

দলে তিনি ছাড়া মানুষ চারজন। দুইজন ভারতের পক্ষের ও দুইজন পাকিস্তানের পক্ষের। ভারতের পক্ষে ছিলেন- মেহের চন্দ্র মহাজন ও তেজা সিং। পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন- দিন মোহাম্মদ ও মোহাম্মদ মুনীর।

তারা প্রত্যেকেই ছিলেন সে সময়ে বিভিন্ন কোর্টের বিচারক। এদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ দেশের স্বার্থ নিয়ে বেশি ব্যস্ত ছিলেন, সীমান্তের সুষ্ঠু বন্টনের দিকে নজর ছিলোনা কারোরই। তবে এদের মধ্যে মেহের চন্দ্র মহাজন ছিলেন বেশ নিরপেক্ষ। ভৌগোলিক ও আইনী জ্ঞান দিয়ে তিনি র‍্যাডক্লিফকে অনেকটাই সাহায্য করেছিলেন। নাহলে সীমান্তের কাঁটাছেড়া আরেকটু বিচ্ছিরি হতেই পারতো!

এই কমিশনের মেম্বারদের সমস্যা ছিলো, তারা কাজ করার চেয়ে কাজ পণ্ড করতেন বেশি। কারণ, প্রথমত, এরা চাইছিলেন, নিজ নিজ দেশের সীমানা বাড়াতে এবং প্রতিপক্ষ দেশ যাতে কম পায়, সে চেষ্টা করতে।

মতের মিল তাদের মোটেও হচ্ছিলো না। সিদ্ধান্ত তাই র‍্যাডক্লিফকেই নিতে হচ্ছিলো অধিকাংশ সময়ে। তাছাড়া এরা কাজ করার চেয়ে কাজে বিঘ্নও ঘটাচ্ছিলেন বেশি।

একটা ঘটনা বললে সেটা বুঝতে সুবিধে হবে। দার্জিলিং’কে যখন ভারতের অংশ করা হচ্ছে, তখন পাকিস্তানপন্থী বাউন্ডারি কমিশনের একজন মেম্বার র‍্যাডক্লিফের সাথে গোপনে দেখা করেন এবং বলেন, দার্জিলিং কে পাকিস্তানের অংশ করে দিতে।

কারণ, তার পরিবার প্রত্যেকবার গরমের সময়ে দার্জিলিং যায়। এখন দার্জিলিং যদি ভারতের অংশ হয়, তাদের খুব সমস্যা হবে!

এর মধ্যে আরো কিছু মজার ঘটনা ঘটেছিলো। র‍্যাডক্লিফ ভারতকে ‘লাহোর’ প্রায় দিয়েই দিচ্ছিলেন। কারণ লাহোরে হিন্দু ও শিখরা ছিলো সংখ্যাগরিষ্ঠ। আর তাকে সীমান্ত ভাগ করতে বলা হয়েছে ধর্মেরই ভিত্তিতে।

পরে তার টনক নড়লো, ভারতকে কলকাতা দেয়া হয়েছে। আরেকটা বড় শহর ভারতকে দেয়া হলে, সেটা অবিচার হবে। তাই লাহোর চলে যায় পাকিস্তানের মধ্যে। জিন্নাহ সহ উচ্চপদস্থ অনেক মুসলিম নেতাই এই সিদ্ধান্তে খুশি হয়েছিলেন তখন।

র‍্যাডক্লিফ লাইন আঁকার পর কি হলো— লাখ লাখ মানুষ ঘরছাড়া হওয়ার পাশাপাশি শুরু হয় রক্তাক্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। মানুষ, মানুষকে স্রেফ কচুকাটার মতন ছিন্নভিন্ন করে, জবাই করে, জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলে।

কৃষণ চন্দর, খুশবন্ত সিং, সাদত হোসেন মান্টোর বইগুলো পড়লে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার খুব ভালো ধারণা পাওয়া যাবে। লাখ লাখ মানুষ মারা যায়, আহত হয়, অজস্র নারী ধর্ষিত হয় এই ‘র‍্যাডক্লিফ লাইন’ ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার জের ধরে।

শুধু ব্রিটিশ হিসেব অনুযায়ী, ভারত জুড়ে তখন ৬০০ শরণার্থী শিবির গড়ে ওঠে। প্রকৃত সংখ্যা হয়তো ছাড়িয়ে গেছে হাজারের কোঠাও। এই শিবিরগুলোতে মানুষেরা এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাবার সময় কিংবা নতুন দেশে গিয়ে আশ্রয় নেয়। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আর এই স্থানান্তরের সময় কম করে হলেও ৭০,০০০ নারী শিকার হয়েছেন যৌন নিপীড়নের। অনেক ধর্মীয় আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো।

সাধের ঘরবাড়ি, সহায় সম্বল, জমিজমার উপর দিয়ে যেন র‍্যাডক্লিফ লাইনের স্টীম রোলার চলে গেলো। সীমান্ত পারাপার আর দুপাশে শত সহস্র স্থানে ছড়িয়ে ধর্মীয় সহিংসতা ৫ থেকে ১০ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

তাড়াহুড়োর সীমান্ত এতো মানুষের মৃত্যু বয়ে আনতে পারে, ব্যাপারটি মোটেই হয়তো প্রত্যাশিত ব্যাপার ছিলো না র‍্যাডক্লিফের কাছে। পাশাপাশি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের জনসংখ্যার সঠিক বণ্টন নিয়ে ধারণা না থাকায় এতো বিপুল পরিমাণ মানুষের যে বাস্তুচ্যুতি ঘটতে পারে, তা কল্পনার বাইরেই থেকে যায় সীমান্ত কমিশনের।

এর মধ্যেই র‍্যাডক্লিফ চলে যান লন্ডনে। যাওয়ার আগে নিজের সব নথিপত্র পুড়িয়ে দিয়ে যান তিনি। তিনি বুঝতে পারছিলেন, তার ভুলের মাশুল দিচ্ছে গোটা উপমহাদেশ। তাকে নাইট গ্রান্ড ক্রস অফ দি অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার দেয়া হয়। সেটা তিনি গ্রহণ করলেও তাকে দেয়া তিন হাজার পাউন্ডের বেতন তিনি প্রত্যাখান করেন। তিনি বলেন, ‘আট কোটি মানুষ ঘৃণার দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, আমি এটা নিতে পারছি না।’

আশি মিলিয়ন মানুষের দেশ নির্ধারণের ভার, সময় দেয়া হলো ৫ সপ্তাহ। ইতিহাস কি বলে- দোষটা কি শুধুই র‍্যাডক্লিফের!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।