মুছে যাওয়া স্মৃতি, নিভে যাওয়া ‘আগুন’

‘ও আমার বন্ধু গো চিরসাথী পথ চলার, তোমারই জন্য গড়েছি আমি মঞ্জিল ভালোবাসার’ – ১৯৯৩ সালের সাড়া জাগানো ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার সুবাদে তুমুল জনপ্রিয়তা পাওয়া একটি গান। সিনেমায় অভিনয় করে আপামর দর্শকদের বিমোহিত করেছিলেন দুই নবাগত সালমান শাহ ও মৌসুমী।

এই ছবিতেই কন্ঠ সম্রাজ্ঞী রুনা লায়লার সাথে প্লে-ব্যাকে অভিষেক ঘটে এক তরুণ গায়কের। প্রথম প্লেব্যাকেই বাজিমাৎ। বাংলা সিনেমার গানের জগতে প্রবেশ করলো তারুণ্য যুগ। পরবর্তীতে বেশ কয়েক বছর ধরে প্লে-ব্যাকে সমধুর কন্ঠে দর্শকদের মুগ্ধ করা এই গায়ক হচ্ছেন আমাদের সবার সুপরিচিত কন্ঠশিল্পী আগুন। পুরো নাম খান আসিফুর রহমান আগুন।

‘আমার স্বপ্নগুলো কেন এমন মনে হয়, মনটা কেন বারবার ভেঙে যায়’ – প্রয়াত আইয়ুব বাচ্চুর সুরে নিজের লিখা ও কন্ঠে ‘কত দু:খে আছি’ অ্যালব্যামের এই গানটি গেয়ে নিজের প্রতিভার আরেকবার জানান দিয়েছিলেন তিনি। আধুনিক গানের ইতিহাসে এই গানটি এক ভিন্নমাত্রা যোগ করেছিল।

‘পৃথিবীতে সুখ বলে যদি কিছু থেকে থাকে’ –  জীবন সংসার সিনেমার এই গানটি জায়গা করে নিয়েছে কালজয়ী গানের তালিকায়। প্রথম সিনেমার দারুণ সাফল্যের পরেই সালমান শাহর সাথে বেশ জনপ্রিয় জুটি তৈরি হয়। ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘তুমি আমার’, ‘বিক্ষোভ’, ‘সুজন সখী’-সহ সালমানের প্রায় সব ছবিতেই তিনি বেশ কয়েকটি সিনেমায় গান করেন।

‘মাথায় পড়েছি সাদা ক্যাপ, হাতে আছে অজানা এক শহরেরও ম্যাপ’ – হুমায়ূন আহমেদের ‘দুই দুয়ারী’ সিনেমার এক অবিস্মরণীয় গান এটি। আগুন জাতীয় পুরস্কার এই গান দিয়েই পেতে পারতেন কিন্তু পাননি। রিয়াজের ঠোঁটেই ‘হৃদয়ের আয়না’ সিনেমার ‘কেন আঁখি ছলছল’ গানটাও বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। এছাড়া পাগল মন সিনেমার গানগুলো দর্শকমহলে বেশ সাড়া পায়।

‘ও আমার জন্মভূমি’ –  ‘এখনো অনেক রাত’ সিনেমার এই গানের জন্য বাচসাস পুরস্কার লাভ করেন। এই সিনেমাতেই তিনি প্রথম অভিনয় করেন। পরবর্তীতে ‘ঘেটুপুত্র কমলা’, ‘৭১ এর মা জননী’, ‘অমি ও আইসক্রিমওয়ালা’ ছবিতে অভিনয় করেন। এছাড়া জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক ‘রঙের মানুষ’ সহ অনেক নাটকেই অভিনয় করেছেন। সর্বশেষ ২০১৬ সালে আরিফ খান পরিচালিত শ্রাবণ এসেছিল গান হয়ে টেলিফিল্মে অভিনয় করেন।

‘পুত কইরা দিমু আমি পুত কইরা দিমু’ ডিপজলের ঠোটে এই অশ্লীল গানসহ এইরকম গান গেয়েই রোমান্টিক গানের সু-প্রতিষ্ঠিত গায়ক হয়েও যেন এক নিমিষেই হয়ে গেলেন চটুল অশ্লীল গানের গায়ক। পরপর বেশ কয়েকটা এই একই রকম গানে কণ্ঠ দিতে থাকেন। এক সময় গ্রহণযোগ্যতা কমে যেতে থাকে। নিজেও অনিয়মিত হয়ে পড়েন প্লে-ব্যাক থেকে।

দেশের বিখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব খান আতাউর রহমান ও কন্ঠশিল্পী নীলুফার ইয়াসমিন দম্পতির একমাত্র ছেলে তিনি। কিংবদন্তি গায়িকা সাবিনা ইয়াসমিন ও ফরিদা ইয়াসমিন সম্পর্কে আপন খালা হন, আর রুমানা ইসলাম বোন হন। ছোটবেলা থেকেই সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে পরিচিত ছিলেন। আশির দশকের শেষে ‘স্যাডেন’ ব্যান্ডে যুক্ত হন, বছর পাঁচেক পর আবার ছেড়েও দেন। এখন পর্যন্ত ১৫ টি অ্যালব্যাম বেরিয়েছে, রবীন্দ্র সঙ্গীতও গেয়েছেন।

বাংলা সিনেমার গানের জগত থেকে ছিটকে পড়া এই গায়ককে নিয়ে আক্ষেপ ও আফসোস। সর্বশেষ অ্যালবাম ‘কাঁচের দেয়াল’ বাজারে আসার পরও কেটে গেছে তিন বছর। আগুনের নাম এখনো শোনা যায় কখনো কখনো, কিন্তু আগুনের সেই উত্তাপটা আর টের পাওয়া যায় না।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।