সিল্ক স্মিতা: দ্য সাউদার্ন সাইরেন কিংবা বিতর্কের রানী

১৯৯৫ সালের মালায়ালাম হিট ছবি ‘স্পাডিকাম’। কঠোর এক অংক শিক্ষকের বখে যাওয়া ছেলের চরিত্র করেছিলেন মোহনলাল। একটা দৃশ্য এমন ছিল – হাতকড়ি পরিয়ে মোহনলালকে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। সাথে ছিলেন মোহনলালের সঙ্গী সিল্ক স্মিতা। স্মিতার হাত জড়িয়ে ধরে মোহনলাল যখন বাবার সামনে বুক চিঁতিয়ে বের হয়ে যাচ্ছিলেন, তখন প্রতিটি সিনেমার শোতেই উল্লাসে ফেটে পড়ছিল দর্শকরা।

না, সেই উচ্ছ্বাস সুপারস্টার মোহনলালের জন্য ছিল না, দর্শকরা চিৎকারের ভাষা ছিল – ‘সিলুক্কু! সিলুক্কু!’ ঠিক এর পরের বছরই যখন, চেন্নাইয়ের বাড়িতে অনেকটা নিভৃতেই যখন জীবন নদীর ওপারে চলে যান, তখনও দর্শকদের সেই চিৎকার সেই আগ্রহ এক বিন্দুও ম্লান হয়নি।

স্মিতার বায়োপিক ‘ডার্টি পিকচার’ বের হয় ২০১১ সালে। যারা সিল্ককে চিনতেন, তাঁদের দাবী ছিল বিদ্যা বালান চরিত্রটির সাথে মানাতে পারেননি। আসলে, অন্য কোনো অভিনেত্রীই নাকি চাইলেই সিল্ক স্মিতা হতে পারেননি। তিনি আবেদনময়ী, কিন্তু অশ্লীল নন। তিনি ভঙ্গুর, কিন্তু তেজদীপ্ত। তিনি হলেন পানশালার ওই নর্তকী যিনি প্রয়োজনে নায়ককে বাঁচাতে গুলিটা নেবেন নিজের বুকে।

যতক্ষণ তিনি পর্দায় থাকতেন, হলের পুরুষরা নাকি চোখের পাতায় ফেলতেন না। আসলে সেটাই তো ছিল সিল্কের কাজ। তিনি কোমড় দোলাবেন, চোখের পাতা নাচাবেন। তার সাথে সাথে নাচবে পুরুষের মন। এর জন্য সিল্কের সংগ্রামটাও কম ছিল না। নিয়মিত যোগবব্যায়াম করে ফিট থাকতেন।

সিনেমা বিষয়ক ঐতিহাসিক থিওডর ভাস্করণ বলেন, ‘পুরুষের চোখকে আরাম দেওয়াটাই তামিল ছবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। আর এর পুরো দায়িত্বটা ওই সময় স্মিতাই পালন করতো।’ স্মিতা অভিনয়ের দিক থেকে খুব বড় কোনো প্রতিভা ছিলেন না, কিন্তু যখন কাজটা কেবলই আবেদন বাড়ানোর ছিল, তখন সেখানে তাঁর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না।

পরিচালক বালু মহেন্দ্র একবার বলেছিলেন, ‘স্মিতা যদি বলতো – চলো মন্দিরে যাই, সেটাও শুনতে খুব সেক্সি শোনাতো। পর্দার ভেতরে ও বাইরে – সব জায়গাতেই ও খুব কম কথা বলতো। কিন্তু, সব সময়ই ঠোঁটটা কেমন করে যেন বাঁকিয়ে রাখতো।’

তামিল চলচ্চিত্র বিশ্লেষক মোহন ভি রমন বলেন, ‘এমন কোনো ফ্রেম খুঁজে পাওয়া মুশকিল যেখানে স্মিতা নিজের ঠোঁট নিয়ে কোনো কারিশমা করেননি। ঠোঁট তাঁকে আরো বেশি জাদুকরী করতো, আর চোখগুলো টানতো চুম্বকের মত।’

স্মিতা প্রথম ‘সিল্ক’ নামটি পান পানশালার নর্তকীর চরিত্র করে। সেটা ছিল তাঁর প্রথম তামিল ছবি, ১৯৭৯ সালের ‘ভান্ডি চাক্কিরাম’। রমন মনে করেন, নামটা স্মিতার সাথে খুব যায়। কারণ, আক্ষরিক অর্থেই সিল্কের মত চকচকে ছিলেন তিনি। তাঁর প্রথম দিককার ছবি পি ভারতিরাজা’র ‘আলাইগাল ওইভাথিলাই’ (১৯৮১) ও বালু মহেন্দ্র’র ‘মুনড্রাম পিরাই’ (১৯৮২) দেখলেই সেটা বোঝা যায়। মুনড্রাম পুরাই পরে বলিউডে সাদমা নামে রিমেক হয় বলিউডে। সেখানেও সিল্ক ছিলেন। এর বাদেও বলিউডে ‘জানি দোস্ত’-এর মত কিছু ছবি করেন তিনি।

এরোটিক আর্টিস্ট হিসেবে স্মিতা চূড়ায় উঠেন ১৯৮৯ সালের মালায়ালাম ছবি ‘লায়ানাম’-এর মধ্য দিয়ে। সেখানে তিনি এক কিশোরের সাথে শারীরিক সম্পর্কে জড়ান। ২০০২ সালে স্মিতার মৃত্যুর ছয় বছর পর ছবিটি হিন্দি ভাষায় ডাবিং করে ‘রেশমা  কি কাহানি’ নামে মুক্তি দেওয়া হয়। তখনও ছবিটা আলোড়ন তুলেছিল।

আসলে যৌনতা ব্যাপারটা একদম শৈশব থেকেই জড়িয়ে আছে স্মিতার সাথে। বিজয়ালক্ষ্মী নাম নিয়ে তিনি ১৯৬০ সালের দুই ডিসেম্বর জন্ম নেন অন্ধ্র প্রদেশে। পরিবারের আর্থিক টানাপোড়েনে নিজের বাবা-মা’ই তাকে চেন্নাই পাঠিয়ে দেয়। এলাকার বখাটেরাও উত্যক্ত করতো। চেন্নাইয়ের কোডামবাক্কামে তিনি থাকতেন খালার সাথে। কলিউডে মেক-আপ অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলেন। সেখানে তিনি ঘুরে বেড়াতেন, কিন্তু খুব কমই পরিচালক বা অভিনেতাদের দেখা মিলতো।

তাঁর আবিস্কার বলা হয় ‘ইস্টম্যান’ অ্যান্টনিকে। এই মালায়ালাম নির্মাতা তাকে চেন্নাইয়ের নন্ডেস্ক্রিপ্ট অ্যাপার্টমেন্টে তাকে দেখেন। অ্যান্টনি ১৯৭৯ সালের ছবি ‘ইনায়ে ঠেডি’র জন্য নতুন মুখ খুঁজছিলেন। মেয়েরা একগাদা মেক-আপ লাগিয়ে অ্যান্টনির কাছে এসেছিল, কাউকেই তাই এই নির্মাতার মনে ধরছিল না। অ্যান্টনি স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘তখনই এক বন্ধু আমাকে মেয়েটির কথা বলে। আমি ওর বাসায় যাই। ও থাকতো ওর খালার সাথে। ১৯ বছর বয়সী সেই মেয়েটি হাফ-শাড়ি পরে একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসেছিল।’

সিল্কের প্রথম ফটো শুটটা কোনো মেক আপ ছাড়াই হয়েছিল। হোটেল রুমে বসে সিল্কের প্রিন্ট করা ছবিগুলো হাতে নিয়ে দ্বিধায় ভুগছিলেন অ্যান্টনি। তিনি বলেন, ‘ওর চোখগুলো সুন্দর ছিল। কিন্তু, আসলেই কাস্ট করবো কি না ভেবে পাচ্ছিলাম না। পরে একটা সিনেমা দেখি। ওর ছবিগুলো আবারো দেখি। পরদিন ওকে আমি সাইন করি।’

প্রথমে স্মিতার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘বিজয়বালা’। যদিও, অ্যান্টনি বার বার তাঁকে ‘স্মিতা’ বলার জন্য জোর দিচ্ছিলেন। ইনায়ে ঠেডি-তে স্মিতা একজন যৌনকর্মীর চরিত্র করেন। সেখানে দেখানো হয় যে শেষ অবধি সে নিজের ভালবাসার মানুষকে বিয়ে করতে পারে। অ্যান্টনি বলেন, ‘ওখানে একটা দৃশ্য ছিল। স্মিতা ঘুম থেকে জেগে উঠেন। ওর চেয়ে ছবিতে ওর কোনো আবেদনময়ী দৃশ্য ছিল না। আমি তখনও ভাবতেও পারিনি যে, ওর কালক্রমে পর্দায় এমন একজন সিডাকট্রেস হয়ে উঠবেন।’

‘সাউদার্ন সাইরেন’ খ্যাত সিল্ক ছিলেন খুবই সাহসী ও সপ্রতিভ। বিখ্যাত ছিলেন নিজের প্রাণবন্ত অবতার ও আঙ্গিক সৌন্দর্য্যের জন্য। পর্দায় যেকোনো পোশাকে আসতেই তাঁর মধ্যে কোনো দ্বিধা ছিল না। ৮০ ও ৯০-এর দশকে তিনি ছিলেন দক্ষিণী ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অবিসংবাদিত আধুনিকতার প্রতীক। কেবল তিনি আছেন বলেই ছবি টিকে যেত – এমন অসংখ্য নজীর আছে।

মোহন রমন বলেন, ‘নাচের ক্ষেত্রে যেকোনো স্টেপ করার সাহস ও দেখাতে পারতো। স্টেপগুলো এমন যে অন্য কেউ করলে অশ্লীল লাগবে। কিন্তু, স্মিতা করতো বলেই যেন, সেগুলো ছিল অন্যরকম মোহনীয়।’

স্মিতা ছিলেন ভারতের সিনেমাজগতের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত চরিত্র। ৭০ টিরও বেশি ছবিতে কাজ করার পর চেন্নাইয়ের অ্যাপার্টমেন্টে ১৯৯৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর তিনি আত্মহত্যা করেন। সিলিং ফ্যানে শাড়ি বেঁধে ঝুলে গিয়েছিলেন। কেন? প্রেমে ব্যর্থতা, আর্থিক ভাবে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া কিংবা অতিরিক্ত অ্যালকোহলে আসক্তি – অনেকগুলো কারণ সামনে চলে আসে।

চলচ্চিত্র লেখক পি কে শ্রীনিবাসন বলেন, ‘অনেক প্রযোজককে দেউলিয়া হওয়ার দুয়ার থেকে ফিরিয়েছেন স্মিতা। যখন তাদের সামনে আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোনো রাস্তা খোলা ছিল না, তখন কোনো একটা ড্যান্স নাম্বার বা আইটেম গান করে তরুণ, যুবকদের হলে টেনে এনেছেন স্মিতা। কিন্তু, যখন স্মিতার নিজের দরকার ছিল, তখন ও কাউকে পাশে পায়নি।’

স্মিতার পর এসেছিলেন শাকিলা। ভাবা হচ্ছিল, নতুন স্মিতা হবেন এই শাকিলা। কিন্তু, অর্ধযুগের চেষ্টায় সিল্কের ধারের কাছেও পৌঁছাতে পারেননি তিনি। সবাই তো আর সিলুক্কু হতে পারে না!

– টাইমস অব ইন্ডিয়া অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।