শুভ মঙ্গল জ্যাদা সাবধান: মাস এন্টারটেইনার, ক্লাস এন্টারটেইনার নয়

সমকাম নিয়ে অনেক হিন্দি ছবি বলিউডে হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না বিষয়টি যথেষ্ট সংবেদনশীল এবং এর জন্য পরিশীলিত ট্রিটমেন্ট এর প্রয়োজন। না হলে ছবিটি একটি চটুল রসের ছবিতে অথবা দুর্বোধ্য আর্ট ফিল্ম পর্যায়ের ছবিতে পর্যবসিত হয় সাধারণ মানুষের চোখে। ‘শুভ মঙ্গল জ্যাদা সাবধান’ আমার চোখে প্রথম ঘরানার ছবি! আসুন, রিভিউ শুরু করি!

সমকাম নিয়ে আমার পছন্দের অনেক ছবি আছে যার মধ্যে ‘মাই ব্রাদার নিখিল’ অন্যতম। এছাড়াও কৌশিক গাঙ্গুলি এর পরিচালনায় ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’ ও আমার খারাপ লাগেনি। আর এই শুভ মঙ্গল ছবিটি হলো দুটি সমকামী ছেলে এর প্রেমের গল্প যা কিনা হাসির মোড়কে তৈরি করা হয়েছে। এক কথায় রোম্যান্টিক কমেডি এবং আমার চোখে সাধারণ মানের একটি ছবি।

বলিউডের বিখ্যাত ছবি ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’ যারা দেখেছেন তারা জানেন ছবিটিতে একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে এর দেখা হয় বিদেশে। তারপর তাদের মধ্যে প্রেম হয় এবং তারা স্বদেশে ফিরে আসে। মেয়েটির বাবা অত্যন্ত কড়া এবং মেয়েটির বিয়ে অন্যত্র ঠিক করে। এরপর নায়ক সেই বিয়ে বাড়িতে এসে সকলের মন জয় করে। এবং অবশেষে প্রায় শেষ দৃশ্যে সেই কড়া বাবার ও মন জয় করে ফেলে। সেই বাবাই তার মেয়ে কে ছেলেটির হাতে তুলে দেয় এবং ছেলেটি তার দুলহানিয়া কে নিয়ে ট্রেনে করে ফিরে যায়। এই ছবিটি একটি ল্যান্ডমার্ক ছবি বলিউডে যেটি বহুল সমাদৃত এবং অনেকের চোখে প্রেমের প্রতীক স্বরূপ হয়ে রয়েছে। আমারও ছবিটি বেশ লেগেছে এবং অনেকবারই দেখেছি।

পরবর্তীকালে ‘হামটি শর্মা কি দুলহানিয়া’ নামে আরও একটি ছবি তৈরি হয় যেটি প্রায় একই ধরনের গল্প নিয়ে এবং সেখানে শাহরুখ কাজলের পরবর্তী জেনারেশন কিভাবে একই ঘটনার সম্মুখীন হয় এবং বিভিন্ন পারিবারিক বাধা বিপত্তি কাটিয়ে শ্বশুরের মন জয় করে অবশেষে ছেলেটি তার বউকে নিয়ে নিজের বাড়িতে আসে সেই সব মিলিয়ে একটা সুন্দর রোমান্টিক কমেডি। সেই ছবিটি ও বেশ ছিল।

এবার আসি আয়ুষ্মান এর শুভ মঙ্গল ছবিটি নিয়ে।

এখানে আয়ুষ্মান খুরানা এবং আরো একটি ছেলে দুজন একে অপরকে ভালোবাসে এবং ছেলেটির বোনের বিয়ে বাড়িতে আয়ুষ্মান আসে। সেখানে নাচাগানা হয়, হৈ-হুল্লোড় হয়, মজা হয় এবং দুটি ছেলে একে অপরকে চুমু পর্যন্ত খেয়ে ফেলে। মজার বিষয় ছেলেটির বাবা চুমু খাওয়া দেখে ফেলে এবং দেখে বমি করে ফেলে এবং অজ্ঞান হয়ে যায়।

তারপরের ঘটনা সামান্যই। আয়ুষ্মান এবং তার প্রেমিক এই দুজনে মিলে বাড়ির লোকের মন জয় করার চেষ্টা করে চলে এবং অবশেষে যথারীতি বাড়ির লোকে রাজি হয়ে যায়। গল্পের শেষ সিনে দিলওয়ালে দুলহানিয়া এর মতন ট্রেনে আয়ুষ্মান দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে আছে। আর তার বন্ধু ছুটে আসছে। গল্প শেষ!

পুরো গল্পটাই হাসির মোড়কে এবং সেটা পরিচালক ভাবনা চিন্তা করেই করেছেন। উদ্দেশ্য কি? খুব সিম্পল। যেহেতু গল্পের থিম অ্যাডাল্ট এবং সেটা সকলের কাছে পৌঁছানো খুব প্রয়োজন বলে পরিচালক মনে করেছেন সেজন্য তিনি একটি মাস এন্টারটেইনার ফরম্যাটকে অর্থাৎ সহজ বাংলায় বললে জন মনোরঞ্জনকারী একটি ছবির মাধ্যমে এরকম একটি সিরিয়াস গুরুগম্ভীর বিষয়কে তুলে ধরতে চেয়েছেন। কিন্তু এখানেই আমার মনে হয়েছে এই ছবির ‘অসাফল্য’।

দুই পুরুষের প্রেম দেখতে আমাদের অধিকাংশ মানুষের চোখ এবং মন এখন ও কিন্তু অভ্যস্ত নয়। সেখানে দিলওয়ালে দুলহানিয়া এর মত টিপিক্যাল এবং প্রচলিত ফরম্যাট প্রয়োগ করলে একটা মনোগ্রাহী না হবার সম্ভাবনাই বেশি থাকে বোধ হয়।

এ প্রসঙ্গে নিজের মত বলি। আমি কিন্তু গে বা লেসবিয়ান মুভমেন্ট এর বিরুদ্ধে নই। আমি নিজে সমকামী না হলেও একটি সমকামী পুরুষের প্রেম এবং ব্যথা কে নিজের মত করে হলেও অনুভব করতে পারি এবং তার প্রতি সহমর্মিতা পোষণ করি। কিন্তু তার মানে এটা নয় যে একটি সমকামী পুরুষের প্রেমের ছবি হলেই সেটাকে বাহবা দিয়ে দেব। ছবিটিকে গল্প, চরিত্রায়ন, ক্যামেরা, সম্পাদনা, সঙ্গীত এবং আরো অনেকগুলো মাপকাঠিতে বিচার করার পরেই যদি মনে হয় ছবিটি ভালো তবেই ভালো বলবো, নচেৎ কিন্তু নয়!

অনেকেই মনে করতে পারেন ছবিটি প্রগতিশীল কন্টেন্ট ধর্মী আর তাই যে বা যারা ছবিটিকে খারাপ বলবেন তারা হয়তো প্রগতিশীল নন। এ ধারণা নিতান্তই খেলো, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এই ছবি টেকনিক্যালি যথেষ্ট দুর্বল তার মূল কারণ ছবির কনটেন্টের সঙ্গে থিম এর অসাযুজ্য। কনটেন্ট অ্যাডাল্ট অথচ থিম অত্যন্ত লঘু রসের হাসির। এর ফলে যা হবার তাই হয়েছে! একটি অত্যন্ত সিরিয়াস বিষয় হাসি মজার মধ্যে পর্যবসিত হয়েছে এবং তার ফলে আমার ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয় সমকামী প্রেমের যে অভিব্যক্তি বা বেদনা বা সংগ্রাম, সেটা তার মর্যাদা হারিয়েছে।

চরিত্রায়ন প্রসঙ্গে বলি। কোন চরিত্রই আমার মনে দাগ কাটতে পারেনি। এমনকি আয়ুষ্মান খুরানা ও নয়। গজরাজ রাও এবং নীনা গুপ্তা অত্যন্ত শক্তিশালী অভিনেতা ও অভিনেত্রী। কিন্তু এই গল্পের স্ক্রিপ্ট তাদের বিশেষ কিছু করার অবকাশ রাখে নি এবং যতটুকু ছিল সেটাও ওই লঘু রসের মধ্যে হওয়ার ফলে ব্যক্তিগত ভাবে আমার মনে অন্তত প্রভাব ফেলেনি। লঘু রস আমি পছন্দ করি কিন্তু জলে দুধ মেশানো আর দুধে জল মেশানো এর ফারাক টাও বোধ হয় বোঝা দরকার। দ্বিতীয়টা প্রয়োজন কিন্তু প্রথমটা অপরিমিতিবোধ!

অনেকগুলো গান আছে যেগুলো একটাও আহামরি কিছু নয়। গানগুলোকে বাদ দিলে গল্পের বোধ হয় কোনো ক্ষতি ই হত না।

আলো, আর্ট ডিরেকশন, সেট, কস্টিউম এবং এডিট সব মিলিয়ে যথেষ্ট প্রফেশনাল এবং সেখানে পরিচালক যথেষ্ট পেশাদারি মনোভাব নিয়ে কাজ করেছেন বোঝা যায়। কস্টিউম এর একটা উদাহরণ দিই। অনেকেই হয়তো জানেন ৩৭৭ ধারার যে পরিবর্তন সুপ্রিম কোর্ট ঘটায় এবং যেখানে সমকামকে অপরাধ হিসেবে গণ্য না করার মান্যতা দেওয়া হয় সেটি একটি দীর্ঘদিন ধরে চলা মুভমেন্টের ফল। এই মুভমেন্ট এর প্রতীক ছিল রামধনু পতাকা বা রেনবো ফ্ল্যাগ। গল্পের একটি সিনে দেখা যায় আয়ুষ্মান খালি গায়ে ওই রামধনুর পতাকা জড়িয়ে নাচ করছে। সিনটা আমার খারাপ লাগেনি।

যাই হোক, এই সব মিলিয়ে ছবিটি যথেষ্টই হালকা রসের এবং মনে দাগ না কাটার মতন একটি ছবি, অন্তত আমার চোখে। দেখতে চাইলে দেখতেই পারেন। আমার তরফ থেকে রেটিং দশে পাঁচ।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।