শো মাস্ট গো অন…

ক্রিকেটারদের দোষ কখনোই দেখি না। একদমই না। আমি সবসময়ই দেখি আমাদের ক্রিকেটাররা সামর্থ্যের চেয়ে বেশী উজার করে দেন, মাঠে। তাদের নিবেদন আর মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা কখনোই উচিৎ নয়। তারা ওভারে ২২ দিলেও না, বারবার একই ভুল করে আউট হলেও না। তাঁরা তাদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চটা দেয়ার চেষ্টা করেন ও দেন।

সমস্যা যেটা হচ্ছে সেটা হলো তাদের যারা গ্রুমিং করার কথা, গাইড করার কথা, সেই ভদ্রমহোদয়রা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন না। ব্যাপারটা ক্লিশে হয়ে যাচ্ছে জানি, তারপরও ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই, নেই, এবং নেই।

হ্যাঁ, ক্রিকেটারদের কোনো ঘাটতি নেই। ঘাটতি পুরোটাই ম্যানেজমেন্টে। সবাই গড গিফটেড ট্যালেন্ট আসবে না আপনার দলে। কিছু সিস্টেম্যাটিক ট্যালেন্ট বা ওয়েল ট্রেইন্ড ট্যালেন্টও দরকার। সেই কাজটা করতে হবে ম্যানেজমেন্টকেই। মুস্তাফিজের মতো ঘিলু বাই বর্ন থাকবে না রুবেল-তাসকিনদের। তাদের যে গতি আছে সেটার সাথে লাইন-লেংথ আর ঘিলুর সমন্বয় করার কথা ম্যানেজমেন্টের। সাব্বিরের স্ট্রাইক রোটেশনে যে সমস্যা আছে সেটা দূর করার দায়িত্ব বর্তায়ও সেই ম্যানেজমেন্টের উপরই। ট্যালেন্ট পেলেই হয় না, সেসবকে ঠিকমতো পরিচর্যা করাও জানতে হয়।

সবাই মাশরাফি হবে না, সাকিব হবে না, তামিম হবে না। এক্সট্রা অর্ডিনারিদের সাথে অর্ডিনারিদের তুলনা হয় না। অর্ডিনারীদের এক্সট্রা অর্ডিনারী লেভেলে নিতে হলে ম্যানেজমেন্টের কিছু কাজ থেকেই যায়। ম্যানেজমেন্ট যে তাদের কাজ থেকে অনেকটা দূরে সরে গেছেন সে কথা না বললেও চলে।

অনেকে বিরক্ত হতে পারেন। বারবার ভাঙা ক্যাসেটের মতো একই রেকর্ড বাজিয়ে যাওয়া। সেই ম্যানেজমেন্টেই ফিরে যাওয়া। এটাই করতে হবে এখন।

দেখুন, ক্রিকেট মাঠে সব ডিসিশান আপনার পক্ষে আসবে তেমন কথা নেই। ডিসিশান মুহূর্তেই নিতে হয় সেখানে। বাইরে থেকে আমরা অনেক কিছুই বলতে পারি। কিন্তু মাঠে যারা খেলছেন ডিসিশান তাদের তখন তখনই নিতে হয়। সাকিবের ডিসিশান নিয়ে তাই প্রশ্ন তুলার উপায় নেই। সাকিব বলেছিলেন, তিনি ১০০টা ডিসিশান নেবেন। সবগুলা পক্ষে নাও আসতে পারে। মানুষ হিসেবে কিছু সিদ্ধান্ত ভুল হবেই। ডিসিশানগুলোর ক্রিকেটীয় ভুলও বের করা যাবে। কিন্তু দিনশেষে এটা নিয়ে কথা বলার কিছু থাকে না আসলে। কারণ সেই সময়ে এর চেয়ে ভালো হয়তো আর কিছু তাঁর মাথায় আসেনি। ব্যাপারটা সামর্থ্যের নয়, ঘাটতির নয়, মানসিকতার নয়, ভুল-ত্রুটির নয়, ইচ্ছে-অনিচ্ছের নয়, সময় ও চাহিদার ব্যাপার।

তখন তাঁর ঠিক যেই কাজটা ভালো মনে হয়েছে তিনি তাই করেছেন। ম্যানেজমেন্ট এই জায়গায় তাঁকে সাহায্য করতে পারেন। তাঁর সিদ্ধান্ত যেনো বিফলে না যায়, তেমন ক্রিকেটার তাঁকে সরবরাহ করতে পারেন। যারা চাপের মুহূর্তে, সময় ও অবস্থা বুঝে অধিনায়কের সিদ্ধান্তকে ঠিক প্রমাণ করতে সক্ষম হবেন।

কোয়ার্টার ফাইনালে উঠা, সেমিফাইনালে উঠা বা ফাইনালে উঠা মানেই যে কাপ জয় নয়, সেই ব্যাপারটাও আমাদের সবার উপলব্ধি করতে হবে। আপনি যদি সব উদযাপন ফাইনালের আগেই সেরে নেন তাহলে তো সমস্যা। সমর্থকদের আরো পরিণত হওয়া দরকার। আমরা পরিণত হলে ম্যানেজমেন্টও পরিণত হতে বাধ্য। ক্রিকেটাররা যথেষ্ট পরিণত, তারপরও তাদেরও আরেকটু সংযত থাকা হয়তো দরকার।

শৈশবে এই ধরণের হার মেনে নেওয়া খুব কষ্টের ছিল। মনে হতো পৃথিবী হয়তো থেমে গেছে এখানেই। সময় ও বয়সের পরিবর্তন হয়তো এখন উপলব্ধি দেয় যে, একটা ম্যাচের হার-এ পৃথিবী থেমে থাকে না। দ্য শো মাস্ট গো অন। তবুও এখনও ঘন্টা কয়েক মুখে কথা যোগায় না। কয়েক দিন লেগে যায় হয়তো ধাক্কাটা কাটিয়ে উঠতে।

যেই ব্যাপারটা আরো বেশী আতংকিত করে তা হলো, এভাবে চলতে থাকলে তো আরো কঠিন সময় আসবে। সেই পিচ্চি থেকে ক্রিকেটটা হাড্ডি মাংসে ঢুকে গেছে, সেই ক্রিকেট নিয়ে যাচ্ছে তাই অবস্থা দেখতে ভালো লাগে না কিছুতেই।

আমি তাই ফিরে যেতে বাধ্য হই, সিস্টেমে, প্রসেসে, ডোমেস্টিকে, ফার্স্ট ক্লাসে, ম্যানেজমেন্টে। ম্যানেজমেন্টের বোধোদয় ছাড়া এই দেশের ক্রিকেটের কোনো উদয় সম্ভব নয়। নিজেদের নতুন পরাশক্তি বলে যে মুখে ফেনা তুলি, ক্রিকেটের নব উত্থান বলে যে আওয়াজ করি, এইসব আসলে অন্তসারশূণ্য। যে পথে বাংলাদেশ ক্রিকেট চলছে তাতে কিছুতেই ক্রিকেটের অগ্রগতি সম্ভব নয়।

ক্রিকেটের ‘সি’ জ্ঞানহীন, হামবড়া, কূপমন্ডুক আর ক্যামেরার ফোকাসলোভীদের দিয়ে আর যাই হোক ক্রিকেট সুরক্ষিত নয়, কক্ষপথে নেই ক্রিকেট। তাদের পরিবর্তন না হলে কিংবা তাদের চরিত্রে পরিবর্তন না এলে অথবা তাদের বোধোদয় না হলে, এই দেশের ক্রিকেট পথ হারাবেই।

হয়তো আশীর্বাদ-ধন্য প্রজন্মের সুবাদে পথ হারানোটা কিছু বিলম্বিত হবে, তবে পথ হারিয়ে অতল গিরিখাদে পড়বেই।

সেজন্যেই বারবার লিখে যাওয়া। অসাঢ় জেনেও লিখে যাওয়া। তাতে যদি ক্রিকেটারদের প্রতি ব্লেইমটা বন্ধ হয়। ম্যানেজমেন্টের ফল্টগুলো দৃষ্টিগোচর হয়। বাংলাদেশ ক্রিকেটকে যদি কক্ষপথে ফেরানোর চেষ্টা শুরু হয়।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।