স্বপ্নের ঘর: একটি প্রশংসনীয় প্রচেষ্টা

বাংলাদেশে হরর জনরা নিয়ে কাজ হয় না বললেই চলে। সেদিক থেকে ‘স্বপ্নের ঘর’ সিনেমাটি আরো আলোচনার দাবী রাখে। অথচ, স্যোশাল মিডিয়া বা গণমাধ্যম – কোথাওই সিনেমাটি নিয়ে খুব বেশি আলোচনা দেখলাম না। হয়তো, এর পেছনে ছবিটির দায়সারা প্রচারণাই দায়ী।

তানিম রংহমান অংশু ছোট পর্দার বেশ জনপ্রিয় পরিচালক, আমারও বেশ পছন্দের একজন পরিচালক। ওনার কাজ গুলো আমার কাছে বেশ ইউনিক লাগে, বিশেষ করে তাঁর এডিটিং সেন্স অসাধারণ। তানিম রহমান টানা পাঁচ বছর ভিডিও এডিটিংয়ের কাজ করেছেন এখনো করছেন।

বাবা আনিসুর রহমান ছিলেন এখন সংগীত পরিচালক। সে সুবাদে গানের ব্যাপারেও তাঁর ভালোই দক্ষতা রয়েছে। অনেকে হয়তো তাঁর মিউজিক ভিডিও গুলো দেখেছেন। আমি হলফ করে বলতে পারি তাঁর কাজ খুব কম মানুষ অপছন্দের তালিকায় রাখে। অনেক আগে থেকেই শোনা যাচ্ছিলো অংশু ভাই চলচ্চিত্র নির্মাণে আসবেন। বলতে বলতে এসেই পরলেন আর তৈরি করলেন ‘স্বপ্নের ঘর’।

এর আগে আমাদের ভালো মানের হরর ফিল্ম বলতে ‘রাজবাড়ি’ই ছিলো তাও বেশ আগের তৈরি তাই অনেকে জানেই না! তবে ‘স্বপ্নের ঘর’ আপনাকে দারুণ একটি অনুভূতি দেবে এতোটুকু নিশ্চিত। যদিও গল্পের সাথে অনেকেই পরিচিত হতে পারেন কিন্তু এই ফিল্মের মূল রসদই হলো এর স্মার্ট নির্মাণ। সিনেমাটি তৈরি হয়েছে একটি বিদেশী উপন্যাসের উপর নির্ভর করে। ফিল্মের চিত্রনাট্য এবং সংলাপ লিখেছেন দেশের জনপ্রিয় অনুবাদক অনীশ দাশ অপু।

অভিনয় সংক্ষেপ

  • আনিসুর রহমান মিলন (সীমান্ত)

বেশ শক্ত-পক্ত অভিনেতা তিনি, বরাবরই সে তাঁর অভিনয় দিয়ে কাজ করে এসেছেন ইন্ডাস্ট্রিতে। শেষবার ‘পোড়ামন’ সিনেমায় তাকে দেখে কিছুটা হলেও ধারণা পেয়েছিলাম ইনি চলচ্চিত্রে নিয়মিত হলে ভালোই কিছুই হবে। এই সিনেমায় প্রতিটা ধাপে তিনি নিজের নামের সার্থকতা রেখেছেন তবে আমার মনে হচ্ছে মিলন সাহেব এন্টি হিরোর ক্যারেক্টারটা বেশ ভালো করতে পারবেন। দেশের পরিচালকরা তাঁকে চাইলেই দারুণ কাজে লাগাতে পারবেন।

  • জাকিয়া বারী মম (মারিয়া)

সিনেমার মূল আকর্ষণ ছিলো মম কে ঘিরেই। মম আসলেই বহুমুখী অভিনয় দক্ষতাসম্পন্ন একজন অভিনেত্রী তা বারংবার দেখা যাচ্ছে। যারা মমর দারুচিনি দীপ,ছুঁয়ে দিলে মন এবং দহন দেখেছেন তারা হয়তো বুঝে গিয়েছেন। আশা করছি উনার আরো ভালো কিছু কাজ আমরা পাবো। একজন গৃহিণী, একজন ভীতসন্ত্রস্ত জন্মদাত্রী মা হিসেবে বেশ দারুণ লাগলো এছাড়া হঠাৎ করেই এমন ভয়ের কারণই যে তিনিই হবেন ভাবতেই পারিনি।

  • কাজী নওশাবা (মিসেস ডি সুজা)

ফিল্মে তাকে দেখা যাবে বেশ আবেদনময়ী নারী হিসেবে। তিনি যথেষ্ট প্রতিভাবান অভিনেত্রী। শুধুমাত্র ভালো নার্সিং হলেই একজন জাত অভিনেত্রী আমরা পেয়ে যাবো, বিশ্বাস না হলে ‘ঢাকা অ্যাট্যাক’ দেখুন।

  • শিমুল খান (রবার্ট ডি সুজা)

একজন লেখক থেকে চলচ্চিত্র পাড়ার পরিচিত মুখ শিমুল খান। তবে তাঁকে নেতিবাচক চরিত্রেই বেশি দেখা গেছে। বলা যায়, এই জায়গাটায় তিনি নিজের আলাদা একটা স্থান করে নিয়েছেন। তাঁকে দিয়ে আরো ভাল কিছু করানো যায়। নিশ্চয়ই বিষয়টা পরিচালকরা মাথায় রাখবেন।

যদিও প্রথম থেকেই আমি ফিল্মের মূল আকর্ষণ মমকেই ধরেছি, কিন্তু আকর্ষণের সবটুকু আলোর সাথে নিজেকে ভালো মিলিয়ে নিয়েছেন শিমুল খান। সবচেয়ে বেশি দারুণ লেগেছে তাঁর ডায়লগ ডেলিভারি, বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিলো ডায়লগ গুলো। একদম পাঁকা ভিলেন বলা যায়। এছাড়া তাঁর এক্সপ্রেশন গুলো ছিলো অসাধারণ।

বর্তমানে বাংলাদেশের অধিকাংশ সিনেমার নামের সাথে গল্পের কোনো যোগসূত্র নেই বললেই চলে। তবে, এই সিনেমাটি নামের সাথে গল্পের দারুণ যৌক্তিকতা রয়েছে তো চলুন গল্পের কিছু অংশ শুনে নেই।

  • কাহিনী সংক্ষেপ

ঢালিউড ইন্ডাস্ট্রির একজন পরিশ্রমী অভিনেতা সীমান্ত। নিজেকে প্রমাণ করার জন্য পরিশ্রমের কোনো অবকাশ তিনি রাখেন নি কিন্তু ভাগ্যের প্রতিকূল সময়ের জন্য তিনি পারছেন না নিজের লক্ষ্যভেদ করতে। এদিকে তাঁর স্ত্রী মারিয়া’র অনেক দিনের শখ নিজেদের একটি ঘর হবে, খুব সুন্দর ঘর যেখানে থাকতে পারবেন নিজেদের মতন করে।

ঘটনাচক্রে মারিয়া এবং সীমান্ত একটি বাড়িতে যান একজনের হারিয়ে যাওয়া পার্স ফেরত দেবার জন্য, কথার প্রসঙ্গে উঠে আসে তাদের একটি ভালো বাসা দরকার তখনই সে বাড়ির মালিক রর্বাট ডি সুজা তাদের খালি  পরে থাকা একটি ফ্ল্যাট দেখার কথা বলেন। দেখার সাথে সাথেই তাদের পছন্দও হয়ে যায়। সে বাড়িতে এই দম্পতি উঠেও পড়েন। এটাই হল তাঁদের ‘স্বপ্নের ঘর’।

  • যা কিছু ভালো লেগেছে

– বাজেট একটা বড় ব্যাপার তারপরেও ভিএফএক্স বেশ ভালোই লাগলো বিশেষ করে হুট করে আসা মুখাবয়ব গুলো।

– ড্রোনশট গুলো দারুণ লাগলো বিশেষ করে রাতের গুলো।

– মেকআপ ভালোই লাগলো বিশেষ করে আলো আধারের বেলায় একদম ন্যাচারাল ভাবটা ফুটে উঠেছে।

– সবশেষে বাড়ি-ঘরের সেট খুব বেশি অসাধারণ লেগেছে একদম একটা ভুতুড়ে ভাব।

  • যা কিছু ভালো লাগেনি

– একজন সুপারস্টার উল্লেখ করার দরকার ছিলো না! যেখানে সে বাড়ি ভাড়ার কথা চিন্তা করে!

– প্রেগন্যান্ট অবস্থায় মমর লুক চাইলেই আরো বাস্তবিক করতে পারতো! যেখানে আমরা ৯০ দশকেও প্রেগন্যান্ট অবস্থার বাস্তবিক রুপ পেয়েছি সেখানে এটা তো ২০১৮ সাল!

– একদম দরকার ছিলো না ফাইটিং সিন গুলোর, অন্যভাবেও ব্যাপারটা তুলে ধরা যেতো! ফিল্মের সবচেয়ে দুর্বল দিক এর ফাইটিং সিনগুলোই।

– রাতের দৃশ্যগুলোর কিছু কিছু জায়গায় বেশ নয়েজ দেখা গেছে, যার দিকে নজর দেবার দরকার ছিলো।

হরর জনরা হিসেবে ‘স্বপ্নের ঘর’ বেশ প্রশংসনীয় একটা প্রচেষ্টা ছিল। যেকোনো হরর সিনেমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর লাইটিং, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, লোকেশন এবং ভিএফএক্স। ক্লাইম্যাক্স দৃশ্যগুলোতে ভিএফএক্সের কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও সব মিলিয়ে সিনেমাটি দেখতে ভালই।

আশা করছি আপনাদেরও ভালো লাগবে। অনেক তো হলিউড,বলিউডের হরর ফিল্ম দেখলেন এবার আমাদের দেশের হরর ফিল্ম দেখেন আশা করছি নিরাশ হবেন না, একদম পয়সা উসুল হবে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।