লোখান্ডওয়ালা শ্যুটআউট: আন্ডারওয়ার্ল্ডের মসনদ কাঁপানো এনকাউন্টার

১৯৮৫ থেকে ১৯৯৫ – এই সময়টাকে বলা হয় মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই দশকে ডঙরির ডন করিম লালার দীর্ঘদিনের বানানো সাম্রাজ্য ভেঙে যায়। ‘বড় ভাই’ খ্যাত ভারাদারাজন মুদালিয়ারের শেষের সূচনা হয়ে যায়, হাজী মাস্তানের পতন হয়। এর চেয়েও বড় ব্যাপার এই সময়ে উত্থান হয় দাউদ ইব্রাহিম ও তাঁর এককালের ঘনিষ্ট সহচর ছোটা রাজনের। আর অরুণ গাওলির সাথে এই সময়ে দাউদের ধুন্ধুমার সব দ্বন্দ্বের কথাও ওই সময় বেশ আলোচনার রসদ যোগাতো।

সময়টা ছিল রক্তাক্ত সব গ্যাঙ ওয়ারের। সম্মুক যুদ্ধে অসংখ্য নামকরা গ্যাঙস্টারের মৃত্যুর খবর শোনা যেত। অপরাধ দমনে কাউন্টার ফোর্সেরও জন্ম হয়ে যায়। এই সময়েই ভারত এনকাউন্টার স্পেশালিস্টদের উত্থান দেখে, যাদের নির্ভুল নিশানায় হত সন্ত্রাস দমন।

তবে, মুম্বাইয়ে ওই সময় এসব পুলিশ, আন্ডারওয়ার্ল্ড কিংবা রাজনৈতিক দলের ভূমিকা নিয়ে অনেক রকম বিতর্কও ছিল। অনেকেই বলেন, এই তিনটি পক্ষই নাকি একে ওপরের হয়ে কাজ করতো। বলা ভাল, এক পক্ষ আরেক পক্ষকে দিয়ে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করতো। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে জিততে বা রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারে সন্ত্রাসকে হাতিয়ার বানাতো। সন্ত্রাসী কমিয়ে ফেলতে কখনো পুলিশ গ্যাঙগুলোর মধ্যে লড়াই বাঁধিয়ে দিত। আবার শত্রু গ্যাঙের বিরুদ্ধেও কখনো অন্য কোনো গ্যাঙের পুলিশ লেলিয়ে দেওয়ার খবর পাওয়া যেত।

ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ওপর আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রভাব বাড়তে থাকে। চাঁদাবাজির জন্য ফোন আসা বাড়তে থাকে। নিজেদের নিরাপত্তার খাতিরেই বড় বড় ব্যবসায়ী ও সিনেমার তারকারা ‍মুদালিয়ার, লালা কিংবা দাউদের দরজায় কড়া নাড়তে থাকেন। যারা এর বাইরে গিয়েছেন, তাঁদেরই বিপদে পড়তে হয়েছে। কেউ কেউ তো প্রাণও হারিয়েছেন।

গ্যাঙ লিডারদের প্রতিপত্তি মুম্বাই ছাপিয়ে আহমেদাবাদ, হায়দারাবাদ, ব্যাঙ্গালুরু, কলকাতা কিংবা ভুপাল অবধি বিস্তৃত হয়। বেশ প্রভাবশালীরা তো দুবাই, দক্ষিণ আফ্রিকা এমনকি লন্ডনেও নিজেদের ‘দোকান’ খুলে বসেন। বন্দুক ধরার জন্য গ্যাঙগুলোর বিস্তর জনসম্পদের প্রয়োজন হয়। তারা হাত বাড়ায় অশিক্ষিত, বেকার ও  উচ্চাভিলাষী তরুণদের দিকে। চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে ছোট শহরের তরুণরাও গ্যাঙে ভিড়তে থাকে, স্বপ্ন দেখতে থাকে বড় গ্যাঙস্টার হওয়ার।

তেমনই কয়েকজন যুবক ছিলেন দিলিপ বুয়া, অনিল পাওয়ার, রাজু পুজারি, অশোক নাদকার্নি ও মায়া ডোলাস। লম্বা সময় ধরে তারা ছিলেন দাউদ ইব্রাহিমের শার্পশ্যুটার। অপরাধ দমনে মুম্বাই পুলিশ গুলির জবাব গুলিতে দেওয়ারই সিদ্ধান্ত নেই। তারই অংশ হিসেবে এই পাঁচজন-সহ মোট সাতজন লোখান্ডওয়ালা শ্যুটআউটে মারা যান।

  • দ্য ফাইনাল স্ট্রাইক

১৬ নভেম্বর, ১৯৯১। বেলা তখন সাড়ে ১২ টা। অ্যান্টি টেরোরিস্ট স্কোয়াডের অফিসার ইন চার্জ ও পুলিশের অ্যাডিশনাল কমিশনার আফতাব আহমেদ খানের নির্দেশে সাদা পোশাকের পুলিশ স্বাতি অ্যাপার্টমেন্টসের নিচ তলার ফ্ল্যাটের দিকে কড়া নজর রাখছিলেন।

স্বাতি বিল্ডিংয়ের বর্তমান অবস্থা।

বেলা একটা বেজে ২০ মিনিটের দিকে থেকে ইন্সপেক্টর এম.আই. কাভির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটা অ্যান্টি টেরোরিস্ট স্কোয়াড পৌঁছায়।  প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল সাব-ইন্সপেক্টর জেড.এম. ধারালকে সাথে নিয়ে তিনি দরজা নক করে পাঁচ গ্যাঙস্টারকে আত্মসমর্পন করতে বলবেন। কভার করবেন ইন্সপেক্টর আম্বাদাস পোতে ও কন্সটেবলরা।

সাড়ে একটা নাগাদ ইন্সপেক্টর কাভি দরজায় কড়া নাড়েন। রাইফেল নিয়ে পুলিশদের স্বাগত জানাতে তৈরি ছিলেন মায়া-বুয়ারা। একটা গুলি ধারালের বুকে লাগে, আরেকটা লাগে কাভির বাম কনুইতে।

বাধ্য হয়েই তখন অতিরিক্ত লোকবলের প্রয়োজন পড়ে। দু’টা নাগাদ স্বয়ং এটিএস চিফ আফতাব আহমেদ খান অতিরিক্ত লোকবল নিয়ে হাজির হয়ে যান। স্পেশাল রিজার্ভ পুলিশের একটা ফোর্সকেও ডেকে পাঠানো হয়।

পুলিশ নিজেদের দ্বিতীয় আক্রমণ শুরু করে আড়াইটায়। তিনজন প্রথম দফায় মারা যান। দিলীপ বুয়া তিন তলায় গিয়ে ফায়ারিং শুরু করেন। মায়া ডোলাস একে৪৭ দিয়ে তখন ক্রমাগত গুলিবর্ষণ করে যাচ্ছেন।

এটিসি চিফ আফতাব আহমেদ খান

পৌনে তিনটায় ঘটনাস্থলে আসেন এসিপি গোবসে। তিনি খানকে মিশন বাতিল করতে পারেন। তার দাবী ছিল, এর ফলে বাকি গ্যাঙস্টাররা আত্মসমর্পন করবেন। খান অবশ্য সেই ‘অনুরোধ’ রাখেননি। বরং তাঁর দলকে দু’পাশ থেকে ক্রমাগত গুলি বর্ষণ করার নির্দেশ দেন। ঘণ্টাব্যাপী দু’পক্ষের লড়াই চলে। বেলা চারটা নাগাদ গোলাগুলির আওয়াজ কমে আসতে থাকে।

মায়া একটা সময় পর্যন্ত ভেতর থেকে বেশ গালিগালাজ করছিলেন। কিন্তু, মজুদ শেষ হওয়ার পর তিনি যখনই না বের হয়ে আত্মসমপর্ণ করতে উদ্যত হন, তখনই তাকে শত-শত গুলি দিয়ে বরণ করে দেওয়া হয়। পায়ে গুলি লাগার পরও অনেকটা সময় বুয়া পুলিশের সাথে টক্কর দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু শেষ অবধি তারও একই পরিণতি হয়।

সাড়ে চারটা নাগাদ আনুষ্ঠানিক ভাবে ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে লোমহর্ষক ও সবচেয়ে আলোচিত-সমালোচিত এনকাউন্টার শেষ হয়।

  • বিতর্ক ও নিষ্পত্তি

মিডিয়া ফলাও করে এই শ্যুটআউটের খবর প্রচার করেছিল। যদিও, তারা মায়াকেই সবচেয়ে বড় গ্যাঙস্টার বলে দাবী করেছিলেন। যদিও, আফতাব আহমেদ খান পরবর্তীতে বলেন, ‘মায়া স্রেফ বেপরোয়া আর খিস্তিবাজ। কিন্তু, দিলীপ ছিল ঠাণ্ডা মেজাজের। ট্রিগারে আঙুল থাকার সময় মায়ার মত চাইলেই ওর মনোযোগ অন্য কোথাও সরানো যেত না।’

মায়া ডোলাস

এখানেই শেষ নয়, এই এনকাউন্টারকে ঘিরে বিতর্কের কোনো শেষ নেই। এটিএস এই ঘটনায় ৪৫০ রাউন্ড গুলি ব্যবহার করে। এজন্য তাদের বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রিয়াল তদন্ত করা হয়। ঘটনার সময় নাকি মায়ার কাছে ৭০ লাখ রুপি ছিল। এই অর্থ নাকি পুলিশই আত্মসাৎ করে। এটিএস চিফ আফতাব আহমেদ খানের বিরুদ্ধে পিটিশন দাখিল করা হয়।

আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন ছোটা রাজন এই ঘটনার পর বেশ সরব ছিলেন। তিনি এটাকে ‘সাজানো এনকাউন্টার’ হিসেবে আখ্যা দেন। দাবী করেন, এর পুরোটাই নাকি হয়েছে দাউদের কর্মচারী সামির শাহ’র মদদে। খানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আসে। যদিও, কোনো অভিযোগই প্রমাণ করা যায়নি। সব বিতর্কের পর এটাই সত্য ছিল যে – এই এনকাউন্টারে মুহূর্তের মধ্যে কেঁপে উঠেছিল আন্ডারওয়ার্ল্ডের মসনদ!

  • খানের পরিণতি

খানের পরিবর্তী জীবনটা সুখকর ছিল না। ১৯৯২-৯৩ সালের মুম্বাই দাঙ্গার সময় তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ১৯৯৫ সালে শিব সেনা সমর্থিত বিজেপি দল সরকার গঠন করে। খানের ওপর শিব সেনার রাগটাও পুরনো। কারণ, লোখান্ডওয়ালার সেই ফ্ল্যাটটার মালিক নাকি ছিলেন দলের নেতা ও গ্যাঙস্টার গোপাল রাজওয়ানি। খানকে প্রমোশন না দিয়ে নাগপুরে বদলী করে দেওয়া হয়।

ক্ষোভে ১৯৯৬ সালে পুলিশের চাকরী ছেড়ে ছেলের সাথে একটা সিকিউরিটি এজেন্সি খোলেন খান। এখনো তাঁর সেই কোম্পানি টিকে আছে। খান পরে রাজনীতিতে নামেন। জনতা দলের হয়ে ১৯৯৮ সালে মুম্বাই থেকে নির্বাচনেও দাঁড়ান।

২০০৭ সালে লোখান্ডওয়ালা এনকাউন্টারের ওপর ভিত্তি করে ‘শ্যুটআউট অ্যাট লোখান্ডওয়ালা’ নামের একটা সিনেমা আসে বলিউডে। স্বয়ং সঞ্জয় দত্ত করেন আফতাব আহমেদের চরিত্র। মায়ার চরিত্রে বিবেক ওবেরয় ও দিলীপের চরিত্রে তুষার কাপুর ছিলেন।

মায়া’র মা রত্নাপ্রভা ডোলাসের চরিত্র করেন অমৃতা সিং। মজার ব্যাপার হল আফতাব আহমেদ নিজেও এই সিনেমায় ছোট একটা চরিত্র করেন। চরিত্রটি ছিল পুলিশ কমিশনার কৃষ্ণমুর্তির। শ্যুটিংয়ের জন্য নির্মাতা আসল স্বাতি বিল্ডিং পাননি। এজন্য ফিল্ম সিটিতে ৫০ লাখ রুপি খরচ করে সাতটি ভবন, রাস্তা বানানো হয়। সেটটা আক্ষরিক অর্থেই ১৯৯১ সালের স্বাতি বিল্ডিংয়ের মত ছিল।

পর্দার মায়া ডোলাস

– ডিএনএ, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও টাইমস অব ইন্ডিয়া অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।