শোলে: সিনেমা নয়, যেন এক মহাকাব্য

‘শোলে’ – যার বাংলা অর্থ হল ‘অঙ্গার’। ১৯৭৫ সালে রমেশ সিপ্পি ওয়েষ্টার্ন ধাঁচে যে হিন্দি রিভেঞ্জ অ্যাকশন-অ্যাডভেঞ্চার ছবিটি তৈরী করেন তা শুধু বলিউড নয় গোটা উপমহাদেশেরে সিনেমা জগতের গতিপথকেই বদলে দেয়। প্রায় ৪৩ বছর আগে উপমহাদেশের দর্শকদের বিনোদন ভাবনায় ‘শোলে’ যে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিলো তার অঙ্গারের তাপদাহ আজোও সমানভাবে বিচ্চুরিত হচ্ছে।

দুই সাধারণ আউট ল’ বীরু ও জয়কে (ধর্মেন্দ্র ও অমিতাভ বচ্চন) দিয়ে ঠাকুর নামক এক প্রাক্তন পুলিশ অফিসার ভয়ঙ্কর ডাকাত সর্দার গব্বর সিং (আমজাদ খান) ও তার দলকে পরাভূত করবার প্রচেষ্টাকে ঘিরে এই বলিউডি ক্ল্যাসিকটির গল্প এগিয়ে যায়। হলিউডের ওয়েষ্টার্ন মুভি ‘ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’, ‘ওয়ানস আপন এ টাইম ইন ওয়েষ্ট’, ‘বুচ ক্যাসিডি অ্যান্ড দ্য স্যান্ডান্স কিড’ ইত্যাদি মুভির ছায়া অনুসরণে ‘শোলে’ মুভিটি নির্মিত হয়।

‘শোলে’কে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং ধ্রুপদী চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়ে থাকে। ২০০২ সালে ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউট প্রকাশিত সর্বকালের ‘শীর্ষ দশটি ভারতীয় চলচ্চিত্র’ তালিকাতে এটি প্রথম স্থান পায়। ২০০৫ সালে ৫০তম ফিল্মফেয়ার পুরস্কারের বিচারকগণ এটিকে ‘৫০ বছরের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র’ বলে অভিহিত করেন।

কর্ণাটকের দক্ষিণে রামনগরের এক পাহাড়ি পাথুরে এলাকায় প্রযোজক জেপি সিপ্পি প্রায় আড়াই বছর ধরে মুভিটির শ্যূটিং করেন। বিগ ক্যানভাসে তৈরী এই মুভিটির নির্মান ব্যায়ও ছিলো অনেক। মধ্য ৭০-এর দশকে প্রায় ৩০ মিলিয়ন ভারতীয় রুপি ব্যয় বর্তমান সময়ের হিসাবে কত দাঁড়াতে পারে তা ভাবতেও অবাক লাগে। এর চেয়েও অবাক করা বিষয় হলো এর ব্যবসায়িক সাফল্য। নির্মান ব্যায়ের প্রায় ৫ গুন বেশী আয় করে মুভিটি!

অথচ প্রথম রিলিজের পর ‘শোলে’ নেতিবাচক সমালোচনা ও একটু কড়াধাঁচের বাণিজ্যিক প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হয়েছিলো। জেপি সিপ্পির এত বেশি বাজেটের মুভি এত টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে কোনোও হল মালিকই ছবি চালানোর ঝুঁকি নিতে চাইছিলেন না।

কোনো উপায় না পেয়ে জেপি তার এক হল মালিক বন্ধুকে অনুনয়-বিনয় করে মুভিটি চালাতে রাজি করান। তবে বন্ধু তাকে শর্ত দেন কেবলমাত্র ছবিটি তাঁর হলে চললেই তিনি রয়্যালিটি দেবেন, অন্যথায় নয়। শর্তে রাজি হন সিপ্পি। প্রথম দু’দিন প্রতিটি শোতে বিশজনেরও কম দর্শক ছবিটা দেখেন। এভাবে দ্বিতীয় সপ্তাহে গিয়ে দর্শকরা ভীড় করতে থাকেন। তখন অন্যান্য হলেও ছবির বুকিং দেওয়া শুরু হয়। তারপরে তো ইতিহাসই ঘটে গেলো!

দর্শকদের মুখে মুখে ছড়িয়ে গিয়ে তা বক্স অফিসে সাফল্য অর্জন করলো। এটি ভারতের অনেক প্রেক্ষাগৃহে একটানা প্রদর্শনীর নতুন রেকর্ড গড়ে এবং মুম্বাইয়ের মিনের্ভা থিয়েটারে তা চলে টানা পাঁচ বছরের বেশি! অনেক মুভি মার্কেন্ট অ্যানালাইসারের মতে, মুদ্রাস্ফীতি আর সে সময়ের হল সংখ্যা ও টাকার মান হিসেব করলে শোলেই হলো সবচেয়ে বেশি উপার্জনকারী ভারতীয় চলচ্চিত্র।

রাহুল দেববর্মণের তৈরি চলচ্চিত্রের মূল সাউন্ডট্র্যাক, এবং সংলাপ (পৃথকভাবে প্রকাশিত) একত্রে বিক্রির নতুন রেকর্ড গড়ে। চলচ্চিত্রের সংলাপগুলো এবং কয়েকটি চরিত্র খুবই জনপ্রিয় হয়। যা ভারতের সাংস্কৃতির অনুষঙ্গ হয়ে উঠে। মানুষের নিত্যদিনকার ভাষায় সংযুক্ত হয়ে পড়ে মুভির অনেক সংলাপ। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে থ্রিডি ফরম্যাটে শোলে মুক্তি দেয়া হয়। যার ফলে নতুন জেনারেশন মুভিটিকে অন্য মাত্রায় চেনার সুযোগ পায়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। অখ্যাত এক ছোট্ট গ্রাম রামগড়ের গল্প বদলে দিল বলিউডের ইতিহাস। ‘ঠাকুর’-এর ডাকে ‘জয়’ আর ‘বীরু’ নামে দুই তরুণের ডাকাত ধরার সে গল্প হয়ে বলিউডের নতুন ইতিহাসই তৈরি করল। উঁচু মানের নির্মান শৈলী, অনবদ্য চিত্রনাট্ট্য, সিক্যুয়েন্স, সংলাপ, সঙ্গীত, সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা অ্যাকশন আর অভিনেতা-অভিনেত্রীদের দুর্দান্ত অভিনয় এই মুভিকে কাল্ট পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

ঠাকুর বলদেব চরিত্রে সঞ্জীব কুমার, তার বিধবা ছেলের বউয়ের চরিত্রে জয়া ভাদুরী, জয় চরিত্রে অমিতাভ বচ্চন, গব্বার সিং চরিত্রে আমজাদ খান প্রমূখদের অন্তর্মূখী ও নৈর্বেক্তিক অভিনয় মুভিটির প্রাণ। সবাইকে টেক্কা দিয়ে এই মুভির অভিনয়ের কারনেই পরবর্তীতে সেরার আসনে চলে যান অমিতাভ বচ্চন ও আমজাদ খান।

অথচ ‘শোলে’ থেকে প্রায় বাদ পড়তে বসেছিলেন আমজাদ খান। কারণ গাব্বার সিংয়ের চরিত্রের জন্য আমজাদ খানের গলার আওয়াজ চিতনাট্ট্যকার জাভেদ আখতারের প্রথমে পছন্দ হয়নি। আমজাদের গলা গাব্বারের চরিত্রের তুলনায় নাকি অনেক সরু ছিল। গাব্বারের চরিত্রে পরিচালকের প্রথম পছন্দ ছিলেন ড্যানি ডেনজোঙপা। তবে, একই সময়ে আফগানিস্তানে ফিরোজ খানের ‘ধর্মাত্মা’ ছবির শ্যুটিংয়ে ব্যস্ত ছিলেন তিনি।

অপরদিকে জয়ের চরিত্রের জন্য রমেশ সিপ্পির প্রথম পছন্দ ছিলেন শত্রুঘ্ন সিন্‌হা। কিন্তু অমিতাভ বচ্চন প্রযোজকদের বুঝিয়েছিলেন উনিই এই চরিত্রের জন্য সেরা। আর বলার অপেক্ষা থাকে না বিগ বি সে কথা প্রমাণও করেছিলন। জয়ের চরিত্রের জন্য অমিতাভকে নেওয়ার কথা প্রযোজকদের প্রথম বলেন আরেক চিত্রনাট্ট্যকার সেলিম খান। প্রথমে তারা রাজি না হলেও ‘জাঞ্জির’-এর সাফল্যের কথা মাথায় রেখে জয়ের চরিত্রে অমিতাভকে নির্বাচিত করা হয়।

জাভেদ আখতার আমজাদের ‘অ্যায় মেরে ওয়াতন কে লোগোঁ’ নামের একটি নাটক দেখেছিলেন। সেখানে আমজাদের অভিনয় দেখেই তাকে গব্বর চরিত্রের জন্য পছন্দ করেন তিনি। বীরু চরিত্রে ধর্মেন্দ্রর আর বাসন্তি চরিত্রে হেমা মালিনির প্রগলভ অভিনয় ছিলো চরিত্র উপযোগী।

সেলিম-জাভেদ জুটির চিত্রনাট্ট্য ছিলো অসাধারন। মাত্র ৮ সিকোয়েন্স উপস্থিতিতে গব্বার সিংয়ের ভয়ঙ্করতা, ঠাকুর বলদেবের হাতকাটার পর মূহুর্তে বাতাসে উড়া চাদর সরে যাওয়ার দৃশ্যে মুভির ইন্টারভেল সিন, গব্বারের প্রথম উপস্থিতির আগে নানান শব্দ ও কর্মাকান্ডে গ্রামের পরিবেশ ও পরবর্তীতে তা থমকে যাওয়, ঠাকুরের পরিবারের সবাইকে মেরে ফেলার আগের-পরের দৃশ্য ইত্যাদি অনেক সিকোয়েন্স কালজয়ী হয়ে রয়েছে। অমিতাভ-জয়ার নীরব প্রেমের আবহ তৈরীর মতো অনেক ভিন্নমাত্রার কাজে কুশলতা দেখিয়েছেন সেলিম-জাভেদ।

মুভির মিউজিক স্কোরে আর, ডি বর্মনের মতো গ্রেট কম্পোজার তার সেরাটা দিয়েছেন। প্রমাণ হিসেবে এই মুভির মেহবুবা, ইয়ে দোস্তি ইত্যাদি গানের সময় উত্তীর্ন জনপ্রিয়তাই প্রমান।

আর সংলাপ? তা তো দীর্ঘদিন ধরে দর্শকদের মুখে মুখেই ফিরেছে! শোলের কিছু হিট ডায়লগ মনে পড়ে কি? ‘কিতনে আদমি থে?’, ‘তুমহারা নাম কেয়া হেয় বাসান্তী?’, ‘ইয়ে হাত মুঝে দেদে ঠাকুর!’, ‘তেরা কেয়া হো গা রে কালিয়া?’, ‘এক এক কো চুনচুন করে মারুঙ্গা’ – ইত্যাদি তো রীতিমত ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়ে ফেলেছে।

সিনেমাটির আরো কয়েকটি অজানা অধ্যায়ের কথা না বললেই নয়।

ছবি মুক্তির চার মাস আগে বিয়ে করেছিলেন জয়া-অমিতাভ। এমনকি শ্যুটিং চলাকালে সন্তান সম্ভবা ছিলেন জয়া। অন্যদিকে এই সিনেমা মুক্তির পাঁচ বছর পর বিয়ে করেন ধর্মেন্দ্র-হেমা। তবে, এই ছবিরই আরেক কুশীলব সঞ্জীব কুমার শ্যুটিং শুরুর আগে হেমাকে বিয়ের জন্য প্রস্তাব করেছিলেন। বলাই বাহুল্য সঞ্জীবকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন হেমা।

সিনেমার আইকনিক গান ‘ইয়েহ দোস্তি হাম নেহি তোড়েঙ্গে’র শ্যুটিং করতেই নাকি পাক্কা ২১ দিন লেগেছিল।

২০০৭ সালে রাম গোপাল ভার্মা শোলে’র রিমেক করেছিলেন। ছবির নাম দেন ‘আগ’। তাতে মূল ছবির অমিতাভ বচ্চন ছাড়াও অজয় দেবগন, সুস্মিতা সেন ও দক্ষিণের সুপার স্টার মোহন লাল ছিলেন। ছবিটি বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে। এর আগে ১৯৯১ সালে ‘রামগড় কি শোলে’ নামে একটি প্যারোডি ছবি বানানো হয়েছিল। মজার ব্যাপার হল এখানেও গাব্বারের চরিত্রে আমজাদ খানই ছিলেন।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।