শকিং সানডে, টেরিবল টিউসডে এবং অজানা ভবিষ্যত

ঘণ্টা বাজিয়ে যে টেস্ট শুরু হল তার শেষটাও হল ঘণ্টা বাজিয়ে। শুরুর ঘণ্টায় সকলের মুখেই যে হাসি ছিল, এবারের ঘণ্টায় সেই হাসিই মিলিয়ে গেল। এটা যে যেন তেন ঘণ্টা নয়, রীতিমত বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য অশনি সংকেতের ঘণ্টা যেন শোনা গেল সিলেটের আকাশে বাতাসে।

পরিসংখ্যান বলছে ২০১৫ সালের বিশ্বকাপের পর বাংলাদেশ কেবল মাত্র তিনটা টেস্ট জিতেছে গেল পাঁচ বছরে। এর তিনটাই অবশ্য বড় শক্তি – ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া এবং শ্রীলঙ্কা। তবে, এই তিনজয়ে আশাবাদী হওয়ার কোনো মানে নেই। কারণ, শেষ আটটা ইনিংসে বাংলাদেশ কখনোই ২০০-রানের গণ্ডি পার করতে পারেনি। ১১০, ১২৩, ৪৩, ১৪৪, ১৪৯, ১৬৮, ১৪৩, ১৬৯ – এই হল শেষ আট ইনিংসের চিত্র।

দুশ্চিন্তা আরো প্রবল হল শেষ দুই ইনিংসে। কারণ এই দু’টো সংগঠিত হয়েছে দেশের মাটিতে, পরিচিত কন্ডিশনে। সেটাও আবার জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে, যারা কি না এই ম্যাচের আগে গেল পাঁচ বছরে কোনো টেস্টই জিততে পারেনি। আর দেশের বাইরেও সর্বশেষ টেস্ট জিতেছিল সেই ২০০১ সালে।

এই পারফরম্যান্সের ব্যাখ্যা কি? বলতে পারেন, বাংলাদেশ তো নিয়মিত টেস্ট খেলে না। এর জবাবটা জিম্বাবুয়ের উদাহরণ দিয়েই দেওয়া যায়। কারণ, এই সিলেট টেস্টের আগে গেল পাঁচ বছরে তাঁরা খেলেছে মোটে ১২ টা টেস্ট।

তাহলে বাংলাদেশের ঘাটতিটা কোথায়? অবশ্যই ‘টেস্ট মানসিকতা’য়। এই ‘টেস্ট মানসিকতা’ জিনিসটা আগে পরিস্কার করা দরকার। এটা কি কেবল ব্যাটিং অ্যাপ্রোচেই প্রকাশ পায়? উত্তরটা ‘না’। টেস্ট মানসিকতা একটা সার্বিক মনোভাব।

একটু ভেঙে বলি।

টেস্টে এর আগেও ছোট দল ও বড় দলের খেলা হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বড় দল জিতেছে। খেলতে নামার আগে দু’দলই নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে জেনেই মাঠে নেমেছে। বাংলাদেশের ক্রিকেটাররাও এটা জেনেই মাঠে নেমেছেন যে তাঁরা জিম্বাবুয়ের চেয়ে বড় দল। এটা জেনেই মাঠে নামার বস্তু। যতই বলেন মনে রাখবেন না, এটা আসলে মনে রাখতেই হবে।

ছোট দল বলেই তাদের বিপক্ষে আলাদা কিছু জিনিস প্রমান করাটা জরুরী। একটা সময় তো অস্ট্রেলিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকারা টেস্টে জেনেই নামতো যে বাংলাদেশ তাঁদের তুলনায় অনেক ছোট দল। এই এগিয়ে থাকাকে তাঁরা নিজেদের জন্য কোনো ‘প্লাস-পয়েন্ট’ হিসেবে নয় বরং নিজেদেরকে আরেকটু বেশি প্রমাণের সুযোগ হিসেবে দেখেন। কারণ, এই ছোটদলগুলোর সাথে নিজেদের পার্থক্যগুলো আরো বেশি পরিস্কার করার একটা ব্যাপার থাকে এসব ম্যাচগুলোতে। এটাকে বলে মানসিকতা।

টেস্টের স্কোয়াড বা টেস্টের একাদশ নিয়ে বিস্তর কথা হচ্ছে, বিতর্ক হচ্ছে। সেই প্রসঙ্গে গেলাম না। কারণ, দল যাই হোক অন্তত দেশের মাটিতে এসে জিম্বাবুয়ের পক্ষে মুশফিক-রিয়াদদের হারিয়ে দেওয়ার কথা ছিল না।

প্রথম ইনিংসের ব্যাটিং দেখে বাংলাদেশকে অনেক নার্ভাস মনে হয়েছে। বারবার বল রিড করতে ভুল করা, বার বার এজ হওয়া সেসবই প্রমাণ করে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এত নার্ভাসনেসের কারণ কি? প্রথম ইনিংসে ২৮২ রান তো এমন আহামরী কিছু নয়! দলের সেরা ব্যাটসম্যান ছয় নম্বরে কেন ব্যাট করবেন? – এই প্রশ্ন তো আছেই।

দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশকে মনে হয়েছে অতি আত্মবিশ্বাসী। প্রচুর শট খেলার চেষ্টা করেছেন, বলের লাইন না বুঝে রিভার্স সুইপ করতে গিয়েছেন। সেই অতি আত্মবিশ্বাসের মাশুল গুণে ‘অবিবেচক’ ঢঙে আউট হয়েছেন লিটন দাস, ইমরুল কায়েস, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, মুশফিকুর রহিমরা।

আচ্ছা চাপমুক্ত হতে কি কেবল শটই খেলতে হয়? সিঙ্গেল বের করে, ভাল বল দেখে শুনে ছেড়ে দিয়ে, বোলারের কৌশল বারবার ব্যর্থ করে কি চাপমুক্ত হওয়া যায় না? নাকি সেটা বাংলাদেশ দলের ব্যাটসম্যানরা জানেনই না? জানবেনই বা কি করে, দেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এত কিছু বোঝা সুযোগ কোথায়!

এভাবে টেস্ট খেলার মানে নেই। ১৮ বছর ধরে টেস্ট খেলা একটি দলের ব্যাপারে এসব লিখতে লিখতেই লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে যাচ্ছে!

ঢাকা টেস্টে হয়তো এই ফলাফলের পরিবর্তন আসবে। হয়তো বাংলাদেশ জিতেও যাবে। কিন্তু, তারপরও মানসিকতা পাল্টানো না গেলে লম্বা দৌঁড়ে খুব একটা উপকার হবে না বাংলাদেশ ক্রিকেটের!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।