সিভ্যুলেশন: বদলে যান, বদলে দিন

বাংলাদেশে গত ছয় মাসে আমাদের ৫৯২ টি ধর্ষণের খবর দেখতে হয়েছে নিউজ পেপারে বা টেলিভিশনের মাধ্যমে। দুই বছরের শিশু থেকে ৫০ বছরের নারী কেউই নিরাপদ নয় মানুষ নামের ওসব জানোয়ারদের হাত এবং কুদৃষ্টি থেকে। চলচ্চিত্র শুধুমাত্র বিনোদন মাধ্যম নয়, এর মাধ্যমে পরিবর্তন করা যায় সমাজ, বদলে দেয়া যায় সামাজিক মূল্যবোধ, মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া যায় নতুন আলো সেই দৃষ্টিভঙ্গী থেকেই তৈরি হয়েছিল প্লাটফর্ম আই স্ট্যান্ড ফর উইম্যান।

গুণী নির্মাতা আফজাল হোসেন মুন্না এই ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজন করেন। চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি তার কাছের মানুষদের নারীর প্রতি সহিংসতা এবং অত্যাচারের নানা কাহিনী শর্টফিল্মের মাধ্যমে তুলে ধরার আহবান জানান। অনেকেই এই চ্যালেঞ্জে সাড়া দেন যার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু নির্মাতাদের সাথে একই পেক্ষাপটে চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য ঝাপিড়ে পড়েছিলেন তারা। প্রতিটি গল্পের চরিত্র ভিন্ন ছিল এবং তাদের চারপাশের কাহিনীও ভিন্ন কিন্তু গল্পের মধ্যে একটি জিনিস কমন সেটি হচ্ছে নারী।

নারীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গী, সমাজের উচ্চস্তর থেকে নিম্নস্তরের নারীদের প্রতিদিনকার জীবনটাই যে যুদ্ধের এবং সংগ্রামের তা নান্দনিক ভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন সেই নির্মাতারা। শর্ট ফিল্ম বা ছোট গল্পের মধ্য দিয়ে নারীর প্রতি সহিংসতা এবং অমানবিকতার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছিল সাধারণত মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য।

এরই ধারাবাহিকতায় ‘আই স্ট্যান্ড ফর উইম্যান’-এর প্রিমিয়ার শো হয়ে গিয়েছিল পাঁচ মাস আগে। জাতীয় গণগ্রন্থাগার মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল প্রিমিয়ার অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে এই আয়োজনের সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও সাধারন দর্শকদের সমাগম ঘটেছিল। কানায় কানায় পরিপূর্ণ মিলনায়তনে উপস্থিত সকলে মন্ত্রমুগ্ধের মতো অবলোকন করেছিল নারীদের সচেতনতা এবং বাস্তবতার মিশেলে নির্মান করা এই শর্টফিল্মগুলো।

এক একটি গল্প যেন আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া নিত্যদিনের ঘটনা। আমাদের সাধারন মানুষদের খুব চেনা খুব দেখা সেসব গল্প ১৫/২০ মিনিটের জন্য আমাদের নিয়ে গিয়েছিল এক অদ্ভুত জগতে। সেদিন প্রদর্শনী শেষে সকলের প্রশংসায় ভেসেছিলেন নির্মাতা থেকে শুরু করে তারকা শিল্পী বা টেকনিশিয়ান বা সিনেমাটোগ্রাফার।  তবে আক্ষেপ এবং প্রশ্ন ছিল সবাই কবে এবং কিভাবে একটি প্রতিবাদের জায়গা থেকে নির্মিত এসব গল্প যা নারীর প্রতি বৈষম্য বা ভিন্ন মতামত রাখা সমাজ ব্যবস্থার চিত্রটি বৃহৎ পরিসরে দেখতে পাবে।

সম্প্রতি বায়োস্কোপ অরিজিনালে এই শর্টফিল্ম গুলোর মধ্যে থেকে চারটি গল্প বাছাই করে ‘সিভ্যুলেশন’ নামে একটি ফিল্ম মুক্তি দেয়া হয়েছে৷ রিলিজ দেয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই রেটিং এ দুই নাম্বার জায়গা দখল করেছে ‘সিভ্যুলেশন’। এটির রেটিং ছিল ৩.৬।  এবং মোস্ট পপুলার ক্যাটাগরিতে তিন নাম্বার জায়গা নিশ্চিত করেছে এটি। যে চারটি ছবিকে ‘অমনিবাস’ ক্যাটাগরিতে দেখা যাচ্ছে, সেগুলো হলো প্রতীক সরকারের ‘বন্দিনী’ সাকী ফারজানার ‘দ্য পার্ক দ্য বেঞ্চ অ্যান্ড দ্য গার্ল’, আশিকুর রহমানের ‘অসম্ভাবিত’ এবং আফজাল হোসেন মুন্নার ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য গার্ল’।

বায়োস্কোপে প্রচারের পর বেশ ভালো সাড়া পাচ্ছেন নির্মাতারা। তাদের গল্প বলার মুন্সিয়ানা, প্রতিটি অভিনেতা-অভিনেত্রীর দক্ষ এবং নিজেকে উজার করে দেয়া অভিনয়, ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর, ক্যামেরার কাজ সবই প্রশংসা পাচ্ছে। বাংলাদেশের এই সময়ের অন্যতম সেরা জনপ্রিয় অভিনেত্রী তিশা হোক, বা দক্ষ এবং জনপ্রিয় মৌসুমী হামিদ,  শক্তিশালী অভিনেতা শতাব্দী ওয়াদুদ, বা নবাগতা শারমিন আঁখি অথবা বেঞ্চে বসা সেই শক্ত মনের মেয়েটি সকলেই যার যার জায়গা থেকে নিজের সেরাটাই দিয়েছেন।

সম্প্রতি এই আয়োজনের মুল উদ্যোক্তা আফজাল হোসেন মুন্না বলেন, ‘এই ছবিগুলো তে আমাদের সমাজের নারীদের ক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া নানা গল্প তুলে ধরা হয়েছে শর্ট ফিল্ম এর মাধ্যমে। সমাজের প্রতিটি উচ্চবিত্ত মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত সব জায়গায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের নারীদের প্রতি যে সহিংসতা বা নিপীড়ন হয় তা তুলে ধরার চেস্টা করেছি আমরা। এসব বন্ধ করার জন্য সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে নারীদেরকেই। সচেতন এবং আত্নবিশ্বাসী হয়ে উঠতে হবে তাঁদের।’

আফজাল হোসেন মুন্না আরো জানান, গত বছর ছবিগুলো প্রদর্শনের পর আমরা বেশ সাড়া পেয়েছিলাম আমরা চেয়েছিলাম ছবিগুলো দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বিদ্যালয় কলেজ এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক মাধ্যমে প্রদর্শন করতে তবে একটু দেরি করে হলেও বায়োস্কপে ছবিগুলো মুক্তি পাওয়ায় তার দেশের সব প্রান্তের দর্শক দেখতে পারবেন শুধু দেশেই নয় বাইরের দেশের বাঙালি এবং বাংলা ভাষায় যারা কথা বলেন তারাও এবার আমাদের এই মুভমেন্টে সামিল হতে পারবেন। এটা আমাদের জন্য আনন্দের এবং অনেক বড় প্রাপ্তির। আগামী দিনেও এই উদ্যোগ থেমে থাকবে না কয়েকদিনের মধ্যেই আন্দোলন নিয়ে তিনি তার পরবর্তী প্রকল্পের ঘোষণা দিবেন বলে জানান এই গুনী নির্মাতা।

বাজেট স্বল্পতা বা ভালো গল্পের কাজ হয়না বলে যারা বাংলা নাটক, টেলিফিল্ম বা সিনেমাকে তাচ্ছিল্য করে আসছেন তাদের জন্য এই সময়ের অন্যতম ভালো গল্পের এবং ভালো নির্মানের একটি সুন্দর উদাহরণ ‘সিভ্যুলেশন’। এই ছোট সিনেমা বা স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবিগুলো প্রমান করে যদি আন্তরিকতার সাথে পুরো টিম মিলে ভিন্নধর্মী ভালো কিছু করতে চায় তাহলে সেটি সম্ভব। সামনের দিনগুলোতে এরকম আরো অনেক সুন্দর গল্পের সুন্দর সিনেমা আমরা দেখতে পাবো সেটাই কামনা। নতুন কিন্তু মেধাবী নির্মাতারা তাদের মুন্সিয়ানা দিয়ে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের গণ্ডী ছাড়িয়ে পূর্নদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রেও তুলে ধরবেন এই দেশের মানুষের গল্প, সমাজের গল্প এমনটাই আশা করছেন তাঁদের শুভাকাঙ্ক্ষীরা।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।