আইজ শেখসাব স্বাধীন ডিক্লার দিব!

১.

…শাহেদ রেসকোর্সের দিকে এগুচ্ছে। শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্সের ময়দানে ভাষণ দেবেন। তিনি কী বলেন তা শোনা অতি জরুরি। ঘরে বসেও শোনা যেত, রেডিওতেও ভাষণ প্রচার করা হবে। তবে কিছুই বলা যায়না। হঠাত হয়তো ভাষণ বন্ধ করে ইয়াহিয়া খান রাস্তায় মিলিটারি নামিয়ে দিবে। সেই প্রস্তুতি তাদের নেওয়া আছে। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর বদল হয়েছে। ভাইস এডমিরাল এস এম আহসানের বদলে নতুন গভর্নর হয়ে এসেছে লেফট্যানেন্ট জেনারেল টিক্কা খান, নামটাই তো ভয়াবহ। ইয়াহিয়া তাকে শুধু শুধু নিয়ে আসছে না। তার মাথায় অন্য পরিকল্পনা। যে কোনদিন এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে। কী ভয়ংকর যে হবে সে দিন কে জানে! ডুমস ডে। দেশের বেশিরভাগ মানুষ ডুমস ডের ব্যাপারটা বুঝতে পারছে না। তারা কল্পনা করছে স্বাধীন দেশে বাস করছে। স্বাধীনতা এত সস্তা না।

রেসকোর্সের ময়দানে মানুষের স্রোত নেমেছে। তারা চুপচাপ চলে আসছে না। স্লোগান দিতে দিতে আসছে — ‘বীর বাঙালী অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘ভুট্টোর মুখে লাথি মারো, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘পরিষদ না রাজপথ – রাজপথ রাজপথ’, ‘তোমার আমার ঠিকানা – পদ্মা মেঘনা যমুনা’। ঢাকায় যত মানুষ ছিলো সবাই বোধহয় চলে এসেছে। লাখ লাখ মানুষ। যেদিকে চোখ যায় শুধু মানুষের মাথা …..পৃথিবীর কোথাও কি এত মানুষ কখনো একত্রিত হয়েছে?

ভাষণ শুরু হবার আগে দুটো হেলিকপ্টার উড়ে গেলো। মানুষের সমুদ্রে একটা ঢেউ উঠলো। চাপা আতঙ্কের ঢেউ। শাহেদের পাশে বুড়োমত একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে, তাঁর হাতে একটা ছাতা। ছাতাটাকে লাঠির মত বাগিয়ে ধরে আছে সে, যেন এক্ষুণি যুদ্ধ শুরু হবে। সে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়বে ছাতা হাতে। বুড়ো শাহেদের দিকে তাকিয়ে হাসি হাসি মুখে বললো, আইজ শেখসাব স্বাধীন ডিক্লার দিব…

মাঝে মাঝে শেখ মুজিব দম নেওয়ার জন্যে থামছেন আর তখনই আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে ধ্বনি উঠছে – জয় বাংলা! জয় বাংলা!

– জোছনা ও জননীর গল্প

হুমায়ূন আহমেদ

(পৃষ্ঠা ১০৪-১০৫) 

২.

ব্যাঙ্গমা বলে, ‘দেশ স্বাধীন হইবো, যুদ্ধ কইরা। সেই যুদ্ধের সময় মুজিবর আর একলা একটা মানুষ থাকবো না, সাড়ে সাত কোটি মুজিবর হইয়া যাইবো। ওই রকম মানুষ যদি সাড়ে সাত কোটি হয়, তার মানে কি দাঁড়ায় তুমি বুঝলা?’

সাড়ে সাত কোটি আগুন-মানুষ!

– যারা ভোর এনেছিল

আনিসুল হক

৩.

…লক্ষ লক্ষ মানুষ তাকিয়ে আকাশের দিকে তাক করা একটা তর্জনির দিকে। শেখ মুজিবের তর্জনি। ঐ তর্জনিই তখন সংবিধান। ওই তর্জনি যা বলবে তাই করতে প্রস্তুত প্রতিটি মানুষ। শেখ মুজিব তাঁর ফরিদপুরের আঞ্চলিক বয়ানে বলেন, ‘কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না, মনে রাখবা রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেব…’। শেখ মুজিব ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে বললেন, বললেন যার কাছে যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত থাকতে। সবশেষে বললেন, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।

শেখ মুজিব যখন এ ভাষণ দিচ্ছেন তখন বিমানে করে ঢাকায় নামছেন ইয়াহিয়ার পাঠানো পূর্ব পাকিস্তানের নতুন গভর্নর জেনারেল টিক্কা খান। তাঁর সঙ্গে আছে জেনারেল রাও ফরমান আলীও। বিমান যখন বেশ নিচু দিয়ে যাচ্ছে তখন তারা দেখতে পেলো রেসকোর্সের ঐ বিশাল জনসমুদ্র। টিক্কা খান ভুরু কুচকালেন। রাও ফরমান আলী অনেকদিন ধরেই আছে ঢাকায়, তিনি টিক্কা খানের দিকে ঘুরে বলেন, God Damn this is what is going on in Dhaka! Things are getting Complicated.

– ক্রাচের কর্নেল

শাহাদুজ্জামান

৪.

বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্য চর্যাপদ নয়, বৈষ্ণবগীতিকা নয়, সোনার তরী কিংবা গীতাঞ্জলি কোনটা নয়, বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্য গীতি হল – ‘আর দাবায়া রাখতে পারবা না’

আহমদ ছফা

৫.

আজ থেকে অনেক অনেক দিন পর হয়তো কোন পিতা তাঁর শিশু পুত্রকে বলবেন – জানো খোকা! আমাদের দেশে একজন মানুষ জন্ম নিয়েছিলেন, যার দৃঢ়তা ছিলো, তেজ ছিলো আর ছিল অসংখ্য দুর্বলতা। কিন্তু মানুষটির হৃদয় ছিল, ভালোবাসতে জানতো। দিবসের উজ্জ্বল সূর্যালোকে যে বস্তু চিক চিক করে জ্বলে তা হল মানুষটির সাহস। আর জ্যোৎস্নারাতে রুপালী কিরণ ধারায় মায়ের স্নেহের মত যে বস্তু আমাদের অন্তরে শান্তি ও নিশ্চয়তার বোধ জাগিয়ে তুলে তা হলো তাঁর ভালবাসা। জানো খোকা তাঁর নাম? শেখ মুজিবুর রহমান।

– আহমেদ ছফা

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।