সাপলুডু: দেশীয় বাস্তবতায় সেরা থ্রিলার

যদি এক লাইনে বলতে বলেন, তাহলে বলবো – ‘বাংলাদেশি সিনেমা ইন্ডাষ্ট্রির চলমান বাস্তবতা, সমস্যা ও সীমাবদ্ধতার হিসাব মাথায় রাখলে ‘সাপলুডু’ একটি দারুণ প্রচেষ্টা। বাংলাদেশের মানদণ্ডে চমৎকার একটি থ্রিলার ছবি।’

‘আয়নাবাজি’ যদি হয় শিল্পমান ও অভিনব কনসেপ্টের জন্য সেরা, ‘ঢাকা অ্যাট্যাক’ যদি হয় সফল অ্যাকশন প্যাকড ও টেকনোলজিক্যালি সেরা, ‘দেবী’ যদি হয় হাইলি হাইপড ও সফল মার্কেটিং আর টোটাল টিম ওয়ার্কের জন্য সেরা তাহলে ‘সাপলুডু’-কে কিসের জন্য মনে রাখতে হবে? এটিকে মনে রাখবেন বাংলাদেশের বাস্তবতায় পারফেক্ট থ্রিলার চরিত্রের ছবি হিসেবে।

থ্রিলার যদি হয় শুরু থেকে শেষ অবধি অব্যাহত রোমাঞ্চ ও উত্তেজনা ধরে রাখা, রহস্যকে শেষ অবধি জিইয়ে রাখা, মুভির মোড় বা মোচড় অক্ষুন্ন রেখে এগিয়ে যাওয়া, যথাযথ ট্যুইস্ট ধরে রাখা তাহলে ‘সাপলুডু’ হলো বাংলাদেশের বাস্তবতায় পারফেক্ট থ্রিলার।
গল্প বা টেকনিক্যাল দিক দিয়ে (যান্ত্রিক ও এক্সপার্ট কলাকুশলীর হিসেব ধরে) হয়তো ফাঁক-ফোকর ছিলো, ক্লাইম্যাক্স ট্যুইষ্টটা হয়তো অনুমানযোগ্য ছিলো, ছোটখাট ভুলত্রুটি ও প্লটহোল হয়তো ছিলো।

কিন্তু নানান ঘটনার ঘনঘটায়, বিভিন্ন চরিত্রের নানামূখী উপস্থাপন, সিকোয়েন্সগুলোকে টানটান রাখার অব্যাহত রাখার প্রচেষ্টা দিয়ে মুভিটা নিজেকে পরিপূর্ন থ্রিলার চরিত্রে রাখতে পেরেছে। এক্ষেত্রে দু-তিনটি উদাহরণ দিতে পারি। যেমন- ছবির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অনেকটা সময় একটা বন বা জঙ্গলকে পটভূমিতে রাখা হয়েছে। আর সেটা করাই হয়েছে থ্রিলের আবহ ধরে রাখার জন্য। কারণ ওই লোকেশনে থ্রিলটা ভালো জমে। আর পরিচালক নিজেদের সীমাবদ্ধতা জেনেই এটার সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছেন।

বিরতির পর মুভির সেকেন্ড হাফে মারজুক রাসেল, শতাব্দী ওয়াদুদ সহ দুটো নারী চরিত্রের ক্যামিও উপস্থিতি রয়েছে। মনোযোগ দিলেই বোঝা যায় গল্পের বিস্তারে এই চরিত্রগুলোর ও তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোকে না রাখলেও কিছুই যায় আসতো না। অর্থাৎ মূল গল্পের সাথে এগুলোর সম্পৃক্ততার অসামঞ্জস্যতা রয়েছে।

চিত্রনাট্যে এই চরিত্রগুলো ও ঘটনাক্রমের অন্তর্ভূক্তি হয়েছে মুভির মিষ্ট্রিয়াস ও থ্রিলিং আবহকে ধরে রেখে সামনে এগুনোর জন্য। ইচ্ছে করলেই বাড়তি গান, কিছু মেলোড্রামা, বাড়তি অ্যাকশন দৃশ্যের অবতাড়ণা করে এই অংশটুকু কভার করা যেতো। কিন্তু নির্মাতা চেয়েছেনই ছবিটার থ্রিলার আবহটা ধরে রাখতে তাই তিনি ওই চরিত্রগুলো আর তাদের ঘিরে তৈরী ঘটনাগুলোর উপর জোর দিয়েছেন।

এই ক্ষেত্রে স্বল্বসময়ের উপস্থিতিতেও অভিনয়ের জন্য সেরা লোকগুলোকে বাছাই করেছেন। তাদের কষ্টিউম, মেকআপ, চরিত্রের বৈচিত্র্যময়তায় থ্রিলটাকে ধরে রেখে দর্শকদের চমক দিয়ে গেছেন। জাহিদ হাসান, তারিক আনাম, সালাহউদ্দিন লাভলু, শুভ, মিম সহ প্রধান চরিত্রগুলোর এন্ট্রি সিনগুলোকেও তাই চমকপ্রদ রাখার কৌশল নিয়েছেন। ইন্টারভেল সিন কিংবা শেষের ক্রেডিট টেলপ সিনেও তাই ছিলো ট্যুইষ্ট ধরে রাখার কৌশল।

যদি গল্প, নির্মান কৌশল আর প্রেজেন্টেশানে থ্রিল দেওয়াই হয় থ্রিলার মুভির মূল বৈশিষ্ট্য তাহলে বাংলাদেশি ছবি হিসেবে ‘সাপলুডু’ হলো অন্যতম পারফেক্ট থ্রিলার।

অভিনয়ে টপ টু বটম সেরাদের নিয়ে কাজ করা হয়েছে। তাই কারুরই অভিনয়ে খামতি দেখাটা ঠিক হবে না। সম্পূর্ন দেশীয় লোকেশনে নির্মিত মুভি সেই হিসেবে সিনেমাটোগ্রাফি মন্দ ছিলো না। কালার গ্রেডিংটায় আপত্তি আছে। একটা পরিশ্রমী ও আন্তরিক কাজে কালার গ্রেডিংটার জন্য অনেক ভালো দৃশ্যায়নও হয়তো চোখ এড়িয়ে গেছে।

ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দারুণ ছিলো, গানগুলোও ছিলো চমৎকার। এডিটিং ও ক্যামেরা ওয়ার্ক মোটামোটি ভালোই বলা যায়। সাউন্ড ও লাইটিং বেশ ভালোই বলবো। তবে কোরিওগ্রাফি ও মারপিটের দৃশ্যগুলো সুবিধার ছিলো না। এই জায়গাগুলোতে কবে যে আমাদের ইন্ডাষ্ট্রি দক্ষ ও পেশাদার লোকবল পাবে? একই আফসোস কতদিন যে থাকবে ভিএফএক্সের ক্ষেত্রে কে জানে!

পরিচালক গোলাম সোহরাব দোদুলকে নিশঙ্কচিত্তে পিঠে চাপরে দেওয়াই যায় একটা পরিপূর্ন থ্রিলার প্যাকড দেবার দুরন্ত ও দূর্দান্ত প্রচেষ্টার জন্য! হলফ করে বলা যায় – সাকিবের ‘পাসওয়ার্ড’ থেকে শতগুন ভালো একটা প্রচেষ্টা হলো ‘সাপলুডু’। কিন্তু, তাঁর স্টারডম শ্রমজীবি, খেটে খাওয়া সাধারণ দর্শকের মধ্যে বেশী। যেই শ্রেণীর দর্শকরা হলে গিয়ে মুভিটা একটু বেশি দেখেন।

আরেফিন শুভর ‘সাপলুডু’ ছবিটাকে এগিয়ে নিতে হলে ইন্টারনেটে অভ্যস্থ, শিক্ষিত ও রুচিশীল দর্শকদেরই এগিয়ে আসতে হবে। আপনি এই মুভিটা যদি প্রথমবার একা দেখেন তবে দ্বিতীয়বার বন্ধুদের সাথে দেখতে গেলে বোরিং হবেন না এটুকু বলা যেতেই পারে।

প্রথম দিনের প্রথম শো শেষে হল থেকে বেরিয়ে আসছি। দুজন কিশোর বয়সী দর্শক কথা বলছে। তাদের একজন আরেকজনকে বলছে – ‘সিনেমাটাত কিন্তু দারুণ প্যাঁচগোছ আছে। ভালাই লাগলো। কি কস?’ বাংলাদেশের থ্রিলার হিসেবে ‘সাপলুডু’ হয়তো এ জায়গাটাতেই সফল!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।