শকুন্তলা দেবী: এক মানব কম্পিউটারের ইতিবৃত্ত

শকুন্তলা দেবী। ১৯২৯ সালের ৪ নভেম্বর বেঙ্গালুরুর এক কন্নড় ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম। তার বাবা ছিলেন সার্কাসে। কখনো ট্র্যাপিজ আর্টিস্টের কাজ করতেন, কখনো সিংহের খেলা দেখাতেন, কখনো দড়ির উপর দিয়ে হেঁটে যেতেন, আবার কখনো জাদু দেখাতেন। শকুন্তলার যখন বয়স মাত্র তিন, তখন তাকে তাসের খেলা দেখাতে গিয়ে তার বাবা আবিষ্কার করেন, তার মেয়ের মধ্যেও রয়েছে এক বিস্ময়কর জাদুময় ক্ষমতা। মনে মনেই যেকোনো গাণিতিক সমস্যার নিখুঁত সমাধান করে দিতে পারেন শকুন্তলা।

মেয়ের এই ক্ষমতার সদ্ব্যবহার করতে বিন্দুমাত্র ভুল করেননি তার বাবা। নিজে সার্কাসের কাজ ছেড়ে দিয়ে, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে মেয়েকে দিয়ে গণিতের জাদু দেখাতে শুরু করেন তিনি। এক পর্যায়ে বিভিন্ন স্কুল, ক্লাব ইত্যাদি থেকে শোয়ের জন্য ডাকও আসতে থাকে শকুন্তলার। মাত্র ছয় বছর বয়সেই তিনি মাইসোর বিশ্ববিদ্যালয়েও শো করে ফেলেন, যদিও নিজে কোনোদিন পাননি সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভের সুযোগ।

১৯৪৪ সালে, পনের বছর বয়সে বাবার সাথে লন্ডনে চলে যান শকুন্তলা। সেখানেও তাঁর জাদুকরী দক্ষতার জানান দিতে থাকেন তিনি। এবং এক পর্যায়ে তার নামডাক ছড়িয়ে পড়ে গোটা বিশ্বব্যাপী। পুরো পঞ্চাশের দশক জুড়ে তিনি ইউরোপের নানা দেশে ট্যুর করেন শোয়ের জন্য। বিভিন্ন টিভি শোতেও অংশ নেন, এমনকি ১৯৭৭ সালে সাউদার্ন মেথোডিস্ট ইউনিভার্সিটিতে হারিয়ে দেন তৎকালীন শ্রেষ্ঠ কম্পিউটার ইউনিভ্যাক ১১০১-কেও।

একটি ২০১ অঙ্কবিশিষ্ট সংখ্যার ২৩তম রুট তিনি ৫০ সেকেন্ডের মধ্যে বের করে ফেলেন। অথচ ইউনিভ্যাক কম্পিউটারে ওই জটিল গণনার জন্য একটি বিশেষ প্রোগ্রাম পর্যন্ত লিখতে হয়েছিল। তারপরও কম্পিউটার হার মানে শকুন্তলার গতির কাছে। এভাবে শকুন্তলা পেয়ে যান ‘মানব কম্পিউটার’ আখ্যা।

১৯৮০ সালের ১৮ জুন তাকে দুইটি ১৩ অঙ্কবিশিষ্ট সংখ্যার গুণফল বের করতে দেয়া হয়, যা তিনি মাত্র ২৮ সেকেন্ডের মধ্যেই মনে মনে সমাধান করে মুখে বলে দেন। এজন্য ১৯৮২ সালে গিনেজ বুক অভ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসেও ওঠে তার নাম।

ইন্দিরা গান্ধী একবার শকুন্তলাকে বলেছিলেন, ‘শকুন্তলা, বিশ্বব্যাপী আমার অনেক অ্যাম্বাসাডর রয়েছে, কিন্তু তুমি হলে আমার সবচেয়ে স্পেশাল অ্যাম্বাসাডর। কেননা তুমি তোমার গাণিতিক দক্ষতার সাহায্যে অনেক বন্ধুর মন জয় করতে পারো।’

তবে চমকপ্রদ বিষয় হলো, শকুন্তলা একপর্যায় এই ইন্দিরা গান্ধীরই বিরোধিতা করে বসেন। ১৯৮০ সালের লোকসভা নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মুম্বাই দক্ষিণ এবং মেদাক থেকে তিনি ভোটে দাঁড়ান। এর মধ্যে মেদাকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন স্বয়ং ইন্দিরা গান্ধী। শকুন্তলা বলেছিলেন, ‘মিসেস গান্ধী মেদাকের জনগণকে বোকা বানিয়ে চলেছে। আমি এই মানুষগুলোকে তাঁর হাত থেকে রক্ষা করতে চাই।’

দুঃখজনকভাবে, মেদাকের ওই নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয় হয় তার। মাত্র ১.৪৭ শতাংশ (৬৫১৪) ভোট পেয়ে তিনি নবম স্থান লাভ করেন।

ব্যক্তিজীবনে শকুন্তলা বিয়ে করেছিলেন কলকাতার এক আইএএস (ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস) অফিসার পরিতোষ ব্যানার্জিকে। এই বিয়ের জন্য ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতে ফিরে আসেন তিনি। এই দম্পতির একটি কন্যাসন্তান হয়, যার নাম অনুপমা ব্যানার্জি। কিন্তু ১৯৭৯ সালে ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে তাঁদের।

 

একজন মেন্টাল ক্যালকুলেটর ছাড়াও শকুন্তলা ছিলেন একজন প্রখ্যাত জ্যোতিষী। এছাড়া বেশ কিছু বইও লেখেন তিনি। এর মধ্যে রান্নার বই কিংবা উপন্যাস যেমন ছিল, তেমন ছিল প্রবন্ধের বইও। বিশেষ করে ‘দ্য ওয়ার্ল্ড অব হোমোসেক্সুয়ালস’ নামক তার একটি বই সবচেয়ে বেশি আলোচিত। ভারতে সমকামিতা বিষয়ক প্রথম বই সেটি, যার জন্য তাকে তুমুল সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়।

পরবর্তীতে ‘ফর স্ট্রেইটস অনলি’ নামক এক তথ্যচিত্রে শকুন্তলা দাবি করেন যে এই বিষয়ে তাঁর আগ্রহ জন্মানোর মূল কারণ তার প্রাক্তন স্বামীর সমকামিতা। এজন্যই তার মনে আকাঙ্ক্ষা জন্মে সমকামিতার বিষয়টিকে আরো গভীরভাবে উপলব্ধি করার।

২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে শ্বাসযন্ত্রীয় সমস্যার কারণে শকুন্তলাকে ব্যাঙ্গালোরের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে জানা যায় যে তার কিডনির জটিলতা এবং হৃদরোগও রয়েছে। শেষ পর্যন্ত ওই হাসপাতালেই ২১ এপ্রিল, ৮৩ বছর বয়সে, তাঁর মৃত্যু হয়।

২০২০ সালের ৩১ জুলাই অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওতে মুক্তি পেয়েছে শকুন্তলা দেবীর বায়োপিক ‘শকুন্তলা দেবী’, যেখানে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী অভিনেত্রী বিদ্যা বালান। আনু মেনন পরিচালিত এই ছবিতে আরো অভিনয় করেছেন যিশু সেনগুপ্ত, সানিয়া মালহোত্রা এবং অমিত সাধ।

বাস্তবের শকুন্তলা দেবী

এই ছবিতে শকুন্তলার গণিতের জাদুকর হওয়া থেকে শুরু করে বিশ্বব্যাপী নামডাক ছড়িয়ে পড়ার বিষয়গুলো সবিস্তারে উঠে এলেও, তার বই লিখে বিতর্কিত হওয়া কিংবা নির্বাচনে ভরাডুবির বিষয়গুলোকে সামান্য উল্লেখের পরেই পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে। বরং এই ছবিতে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে শকুন্তলার সাথে তার মেয়ে অনুপমার সম্পর্কের টানাপোড়েন।

ছোটবেলায় বিনা চিকিৎসায় মারা যান শকুন্তলার ছোটবোন। তার চিকিৎসার কোনো চেষ্টাই করা হয়নি, কেননা পরিবারের জন্য ওই বোন ছিলেন কেবলই বোঝা। এছাড়া শকুন্তলার বাবা তাকে স্কুলে না পাঠিয়ে তাকে দিয়ে কেবল শো করিয়ে বেড়াতেন, তাকে সোনার ডিম পাড়া হাঁসের মতো ব্যবহার করতেন। সেই সময়গুলোতে তার মা সবকিছু দেখেও চুপ করে থাকতেন, স্বামীর মুখের উপর কিছুই বলতেন না। ফলে মায়ের প্রতি শকুন্তলার ছিল প্রচণ্ড রাগ, যা সময়ের সাথে সাথে ঘৃণায় রূপ নেয়।

শকুন্তলা চেয়েছিলেন একজন স্বাধীন ও স্বাবলম্বী নারী হিসেবে বাঁচতে, এবং কখনো তার মায়ের মতো না হয়ে যেতে। কিন্তু এক পর্যায়ে দেখা যায় নিজের মেয়েও শকুন্তলাকে ঠিক সেভাবেই ঘৃণা করছেন, যেভাবে শকুন্তলা একসময় ঘৃণা করতেন তার মাকে। এমনকি ঘটনা এতদূর গড়ায় যে শকুন্তলার মেয়ে অনুপমা তাঁর মায়ের নামে আদালতে ক্রিমিনাল কেস পর্যন্ত করে বসেন, যার ফলে শকুন্তলার জেলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

কোন ঘটনাক্রমের প্রভাবে মা-মেয়ের সম্পর্ক এতটা তিক্ততায় রূপ নেয়, এবং সেখানে শকুন্তলার ভূমিকা ঠিক কী ছিল, সেসব প্রশ্নের জবাব পেতে দেখে নিতে পারেন ছবিটি।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।