শক্তিমান ‘ক্রাইম মাস্টার’ শক্তি কাপুর

রূপালি পর্দায় খলনায়কের উপস্থিতি মানেই কারণে অকারণে আতঙ্ক ছড়ানো, আর নায়ক-নায়িকার মাঝে অদৃশ্য দেয়াল টেনে দেওয়ার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা। সেই সাথে ছবির শেষের দিকে নায়ক কর্তৃক ‘উত্তম-মধ্যম’ প্রাপ্তি তো আছেই। তবে, এসব কিছু ছাপিয়ে অনেক সময় খলনায়কও হয়ে ওঠতে পারেন হাস্যরসের আধার।

‘ক্রাইম মাস্টার গোগো নাম হ্যায় মেরা, আঁখে নিকালকে গোটিয়া খেলতা হু’—খ্যাত শক্তি কাপুরকেই এর প্রধান উদাহরণ হিসেবে টানা যায়। কিছু কিছু সিনেমাতে তাকে দেখে মনে ভয় তো জাগেইনি, বরং তার কৌতুকপূর্ণ অভিনয়ের জন্য আজও দর্শক মনে জীবন্ত হয়ে আছেন। অবশ্য গালাগালিও হয়তো তিনিই সব থেকে বেশি খেয়েছেন। পর্দায় তার মধ্যে মার্জিত’র ছিটেফোঁটাও দেখা যায় না৷ অত্যন্ত ডার্টি খলনায়ক। এক সময় তিনি পর্দায় এলেই নাকি গালাগালির বন্যা বয়ে যেতো৷ এমনও বলা হতো শক্তি কাপুর কোনো মেয়েকে ছুঁয়ে দিলেই সে প্রেগন্যান্ট হয়ে যাবে!

বাবাকে নিয়ে তাই মেয়ে শ্রদ্ধার রাজ্যের অভিযোগ, ‘কেন তুমি সবার হাতে মার খাও? তুমি নায়ক হতে পারো না?’ একমাত্র মেয়ের এমন অভিযোগ শুনে বাবা হয়তো হেসেই ফেলতেন। আসলে বাস্তব চিত্র বোঝার বয়স তো আর ওই সময় ছোট্ট শ্রদ্ধার ছিলো না।

শক্তি কাপুরের বিখ্যাত যত সংলাপ

‘ক্রাইম মাস্টার গোগো নাম হ্যায় মেরা, আঁখে নিকালকে গোটিয়া খেলতা হো ম্যায়’

‘আয়া হো, কুচ তো লুটকার জাউঙ্গা— খান্দানি চোর হো ম্যায়, খান্দানি— মোগাম্বো কা ভাতিজা, গোগো’

‘জব কোই বাচ্চা নেহি সোতা, তো উসকা মা ক্যাহতি কি… সো যা, সো যা— নেহি তো গোগো আ যায়ে গা’

‘সুরাজ পশ্চিম সে নিকাল সাকতা হ্যায়, চান্দনি আগ বারসা সাকতা হ্যায়, লেকিন তুঝ যেইসা মুজরিম— কাভি নাহি সুধার সাকতা’

‘আবি হামারি এক মোলাকাত আওর হোগি, আওর ওহ তোমহারে লিয়ে আখেরি হোগি!’

বলিউডের এই ক্রাইম মাস্টারের জন্ম ১৯৫৮ সালের তিন সেপ্টেম্বর, দিল্লীর এক পাঞ্জাবি পরিবারে। তার আসল নাম সুনীল সিকান্দারলাল কাপুর। অভিনয়ে আসার পর আরেক অভিনেতা সুনীল দত্ত বড়সড় নামটা বাদ দিয়ে রাখেন ‘শক্তি’। ব্যস, শক্তি কাপুর নামেই তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন।

১৯৭৬ সালে ‘সংগ্রাম’ সিনেমার মধ্য দিয়ে বলিউডে আনুষ্ঠানিক যাত্রা হলেও ৫৮ বছর বয়সী এ অভিনেতা ১৯৮৩ সালে জিতেন্দ্র-শ্রীদেবী অভিনীত ‘হিম্মাতওয়ালা’ এবং সুভাষ ঘাইয়ের ‘হিরো’ ছবিতে প্রধান খলনায়কের ভূমিকায় অভিনয় করে অন্যান্য নির্মাতাদের নজরে আসেন।

এরপর শক্তি কাপুর ক্রমেই বলিউডের অন্যতম পরাক্রমশালী খল-অভিনেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। প্রায় চার দশক ধরে সাতশো’রও বেশি ছবিতে অভিনয় করে নিজস্ব একটা আইডেন্টিটি তৈরী করেছেন। এমন বিরল ঘটনাকে ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে রেকর্ড বলা যেতে পারে। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তিনি অভিনেতা কাদের খানের সঙ্গে জুটি বেঁধে প্রায় শতাধিক চলচ্চিত্রে হাস্যরসাত্মক বা খল-চরিত্রে মানিকজোড় হিসেবে কাজ করেছেন।

ভারতীয় সিনেমার এই কিংবদন্তি শুধু খল চরিত্রেই নয়, বরং কমেডিয়ান বা ‘কমিক ভিলেন’ হিসেবেও সাফল্যের ঝলক দেখিয়েছেন। ‘রাজাবাবু’ ছবির নান্দু, ‘ইনসাফ’–এর ইন্সপেক্টর ভিন্দে, ‘চালবাজ’র বাটুকনাথ, ‘বল রাধা বল’র গুঙ্গা, কিংবা ‘আন্দাজ আপনা আপনা’ ছবির সেই বিখ্যাত ক্রাইম মাস্টার গোগো ১৯৯৫ সালে পেয়েছেন সেরা কমিডিয়ানের পুরস্কারও।

একটা তথ্য দিই, শক্তি কাপুর কিন্তু ঢাকাই সিনেমাতেও অভিনয় করেছেন। ২০০০ সালে সাঈদুর রহমান সাঈদের পরিচালনায় ‘এরই নাম দোস্তী’ ছবিতে রিয়াজ-শাবনূর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন তিনি।

খ্যাতির সাথে সাথে বিড়ম্বনাও থাকে, শক্তি কাপুরও তার ব্যতিক্রম নন। ২০০৫ সালে একটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম শক্তি কাপুরের স্টিং অপারেশন করে তাঁর কাস্টিং কাউচ প্রকাশ্যে আনে। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, এক নারী সাংবাদিক নায়িকা সেজে তাঁর কাছে কাজ চাইতে গেলে তিনি বলছেন, ফিল্মে কাজ করতে চাইলে, কাস্টিং কাউচের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে! তবে তাঁর বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ এবং স্টিং অপারেশনের সব অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে, ওই ভিডিওটা নকল, ট্যাম্পার করে আমার মুখ বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

এ তো গেলো স্টিং অপারেশন কথা, এবার ডার্টি কমপ্লিমেন্ট জানা যাক। এক সাক্ষাৎকারে তার বিরুদ্ধে ওঠা সব থেকে ডার্টি কমপ্লিমেন্ট জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘একবার কেন্দ্রীয় এক নারী মন্ত্রী, নাম না বলাই শ্রেয়, আমাকে ফোন করেছিলেন৷ ব্যস, সবাই বলে বসলো, আমি ওনাকে পটিয়ে ফেলেছি! হু হু করে সেই গুজব ছড়িয়ে পড়ল৷ খুব লজ্জা পেয়েছিলাম৷ আরে উনি আমার মায়ের মতো ইয়ার!’

মেয়ে শ্রদ্ধা নাকি আপনার ভিলেন অবতার একদমই পছন্দ করতেন না? এমনটা প্রশ্ন করলে তিনি বলেন: হ্যাঁ, একদম করতো না৷ তবে, ও আমার কমেডির খুব ভক্ত৷ ‘সত্তে পে সত্তা’ ‘রাজাবাবু’ ‘ক্রাইম মাস্টার গোগো’ ও যে কতবার দেখেছে, তার হিসেব নেই। থ্যাঙ্ক গড! তা না হলে বলতো, ‘পপ, কী যে করলে সারা জীবন’!

আজ বলিউডের এ শক্তিমান অভিনেতার জন্মদিন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ১৯৮২ সালে সঙ্গীতশিল্পী শিভাঙ্গী কাপুরকে বিয়ে করেন। তার দুই সন্তান— ছেলে সিদ্ধান্ত কাপুর একজন অভিনেতা ও সহকারী পরিচালক এবং মেয়ে ‘আশিকি ২’ খ্যাত শ্রদ্ধা কাপুর বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় বলিউড অভিনেত্রী।

মাঝে বি গ্রেড সিনেমায় কাজ করে দুর্নাম ‍কুড়িয়েছিলেন। নারী কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে শিল্পীদের সংগঠন তাঁকে নিষিদ্ধও করে। সব মিলিয়ে এখন খানিকটা নীরব সময় বাধ্য হয়েই কাটাচ্ছেন এই কিংবদন্তি। হতাশার এই মেঘ যত দ্রুত কাটবে ততই মঙ্গল।

 

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।