সাকিইইইইব সাকিব! সাকিইইইইইব সাকিব!

২০৩৫ বিশ্বকাপ। ফাইনাল ম্যাচ। বাংলাদেশ বনাম ভারত। মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়াম। দ্বিতীয় ইনিংস। শেষ ওভার।

জয়ের জন্য ভারতের লাগে ৬ বলে ১৬ রান। হাতে ২ উইকেট। ১২২ বলে ১৩৬ রানের পুঁজি নিয়ে ক্রিজে আছেন সময়ের সেরা তরুণ ব্যাটসম্যান অজয় কুমার আর ২২ বলে ৩৬ করা পেশিবহুল হার্ডহিটার পেস অলরাউন্ডার জাসবিন্দর সিং! বাংলাদেশ এই মুহূর্তে থেমে আছে। থেমে আছে মানুষ, দপ্তর, দলিল, থেমে আছে দেশ।

কাঁচাপাকা অগোছালো চুলের মানুষটা ধীরে ধীরে ড্রেসিংরুম থেকে বেরোলেন। ডাগ আউটে বাউন্ডারির একদম কোণায় এসে স্থির দাঁড়িয়ে আছেন। মুখে হাত। ক্যামেরা বারবার তাঁর দিকে ফোকাস করা হচ্ছে। বরাবরের মতই নিরুত্তাপ মুখ। বেঞ্চের প্লেয়াররা অসহায়ের মত একবার মাঠে দেখছে। একবার তাদের কোচকে দেখছে। তারা জানে এই নিরুত্তাপ মানুষটার মস্তিষ্ক তখন কম্পিউটারের চেয়ে দ্রুতগতিতে চলছে।

বাংলাদেশ তো বটেই সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারদের একজন তাদের এই কোচ, নিজের শেষ বিশ্বকাপে ২০২৩ সালে বাংলাদেশকে ফাইনালে নিয়ে গেছিলেন। প্রবল লড়াই করে হেরেছিলেন এই ভারতের সাথেই। এরপর অবসরে যান। ২০৩১ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের চরম ভরাডুবির পর কোচ হয়ে আসেন তিনি।

এরপর থেকে ম্যাজিকের পর ম্যাজিক দেখিয়ে চলেছেন। নিজের হাতে এই দলটাকে গড়ে তুলেছেন। চরম ক্যালকুলেটিভ, প্রফেশনাল, ঠান্ডা মাথার। এক কথা বারবার বলেন না, কিন্তু যা বলেন একদম মাথায় গেঁথে থাকার মত করে বলেন।

তাঁর ব্যক্তিত্বের সামনেই খেলোয়াড়রা এক্সট্রা পরিশ্রম করতে আর নিয়ম মানতে বাধ্য হয়। প্রয়োজনমাফিক যেমন কঠোর হতে পারেন, তেমনই খেলোয়াড়ি জীবনের নানান অভিজ্ঞতা আর ঘুরে দাঁড়াবার গল্প বলে ছেলেদের উজ্জীবিত করতেও জুড়ি নেই। কত কিছু যে দেখেছেন লোকটা জীবনে!

কতো যে সহ্য করেছেন। কিন্তু বারবার ফিরে এসেছে আর সবাইকে চুপ করিয়ে দিয়েছেন ব্যাট দ্বারা, বল দ্বারা। যৌবনে মাঠে যেভাবে ক্রিকেট খেলতেন এখনও সেভাবেই খেলেন, তবে তা খেলেন মাথায়; মস্তিষ্কে! ম্যাচ রীডিং আর ট্যাকটিকাল ডিসিশনে কোচের জুড়ি নেই। তাঁর কোচিং ক্যারিশমাতেই বাংলাদেশ ঘরের মাঠের এই বিশ্বকাপে এখনও পর্যন্ত অপরাজিত হয়ে ফাইনালে উঠেছে! হইচই পড়ে গেছে! ইতিহাসে প্রথম বোধহয় একটা দলে খেলোয়াড়দেও চেয়ে প্রধান কোচই বড় সেলিব্রেটি!

কিন্তু আজ অবশ্য কিছুতেই কিছু আসে যায় না! আজ সব শেষ বিন্দুতে মিলবে! এই ছয়টা বলের উপর নির্ভর করছে কোচ হিসাবে তাঁর সাফল্য ব্যর্থতা, বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা জয়। হবে কি? কোচের উদ্বিগ্ন চোখ।

৫০ তম ওভারের শুরু। অধিনায়ক জুয়েল বল দিলেন ফাস্ট বোলার মতিউরের হাতে।

মুচকি হাসলেন মধ্যবয়স্ক কোচ। এই ক্যাপ্টেন ছোকরাটা তাঁকে নিজের বাবার মত মানে। তিনিও নিজের মত করে গড়ে তুলতে চেয়েছেন ছেলেটাকে। বারবার করে শিক্ষা দিয়েছেন যেন তাঁর ভুলগুলো সে না করে।

জুয়েল ভুল করেনি। মতিউর আজ ৯ ওভারে ৬৩ দিলেও সারা টুর্নামেন্টে ছিল বাংলাদেশের বেস্ট পেসার। বিশেষ করে ডেথে। আজও দুই উইকেট নিয়েছে! অন্য সব পেসারদের কোটা শেষ। স্পেশালিস্ট শুধু সেই আছে। পার্ট টাইম পেসার শফিককে কে বল দেওয়া যায়। কিন্তু জুয়েল তা দেয়নি, আস্থা রেখেছে মতিউরে। কারণ কোচ তাঁকে একবার শুনিয়েছিলেন শ্রীলঙ্কার প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামের এক অন্ধকার রাতের গল্প…

৪৯.১… প্রথম বলেই অফস্টাম্পের বাইরে জুসি হাফ ভলি দিলেন পেসার মতিউর। অজয় কুমার ফাস্ট হ্যান্ডে কভার ড্রাইভ করে গুলির মত বল পাঠিয়ে দিলেন বাউন্ডারিতে। এক রানই হত, ফিল্ডারের ফাম্বলে দুই রান নিলেন। বাউন্ডারিও হতে পারতো। হাফ ছেড়ে বাচল বাংলাদেশ!

পরের বল শর্ট, ইনসাইড আউট খেললেন অজয়, কানেক্ট ঠিকমত না করায় বল আকাশে উঠে নো ম্যানস ল্যান্ডে পড়ল! আবারো দুই রান!

মধ্যবয়স্ক কোচ নীরবতা ভঙ্গ করলেন। ক্যামেরায় সারাদেশ দেখল জোরে চিৎকার করে মতিউরকে ডাকলেন কোচ। হাতের ইশারায় বুঝালেন, ‘keep your head in the game lad!’

পরের বলটা ভালোই ছিল। দুর্দান্ত ইয়র্কার! কিন্তু মডার্ন ক্রিকেট। ব্যাটসম্যানদের সব পালোয়ানি! স্কুপের মত কিছু একটা খেলে দিলেন অজয়! সারাদেশ শূন্য চোখে দেখল থার্ডম্যান দিয়ে গড়াতে গড়াতে বল যাচ্ছে সীমানার বাইরে! পেস বোলার এজন্যই কেউ হতে চায়না!

হতাশায় ঘামে ক্লান্তিতে মতিউর বেঞ্চে ইশারা করে পানি ডাকলেন। মাঠে ক্যাপ্টেন্সহ চার পাচজনের মিটিং। পানি নিয়ে যাওয়ার পথে ছোকরাটাকে কাছে ডাক দিলেন কোচ। কিছু নির্দেশনা দিয়ে দিলেন। যা জায়গামত পৌঁছে গেল।

পরের বল! এবং এবার এজড এন্ড টেইকেন! অফ স্টাম্পের ওয়াইডিশ অঞ্চলে মতিউরের স্লোয়ার বল ডেসপারেটলি তারা করতে গিয়ে থিক এজ দিয়ে কিপার কে ক্যাচ দিলেন অজয় কুমার!

কোচ মুচকি হাসলেন। তাঁর পরিকল্পনা কাজে লেগেছে। এখন এরা যেকোনো বল মারতে যাবে এবং এটারই ফায়দা উঠাতে হত!

২ বল… ৮ রান! মাঠে নামলেন কুলজিত সিং! কিন্তু তিনি নন স্ট্রাইকে এখন, মারকুটে জাসবিন্দর স্ট্রাইকে। পায়ের উপর করা বলটাকে অবলীলায় ফ্লিক করে ডিপ স্কয়ার লেগের ফাঁকা টায় পাঠিয়ে দিলেন। ওয়ান বাউন্স ফোর!

হায় খোদা! মাটি কাপছে কাঁচাপাকা চুলের মধ্যবয়স্ক লোকটার পায়ের নিচে! কি হবে এখন? একটা সামান্যতম ভুল কি এখন তিলতিল করে গড়ে তোলা এই দলটার সমস্ত কষ্ট পরিশ্রম অনর্থক হয়ে যাবে? ১ বলে ৪ নেওয়াও বেশিরভাগ সময় ইজি না! কিন্তু কিন্তু… আবার যদি মতিউর মার ঠ্যাকাতে ওয়াইড ইয়র্কার দেয়? সেটায় যদি আবার বাউন্ডারি হয়? ঠিক সেই রাতটার মত? যে রাতে তাঁর সামনে ঠিক এই পরিস্থিতিই ছিল?

১৭ বছর আগের রাতটার শেষ ওভারের প্রতিটা মুহূর্ত তাঁর চোখের সামনে দিয়ে এক নিমেষে চলে গেল! ‘এবার যাতে ওই ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর না হয়! হে খোদা তুমি আমার প্রার্থনা শোন, বাংলাদেশ কে জিতায়ে দাও। উপরওয়াল সহায় হও…’

শেষ বল!

‘AND HE’S BOWLED HIM!! OH MY GOD WHAT AN EPOCH MAKING DELIVERY!! IT WAS FULL AND STRAIGHT, A BIT OF REVERSE AND BROKE THE MIDDLE STUMP! HISTORY HAS BEEN CREATED AND BANGLADESH HAVE WON THEIR FIRST EVER WORLD CUP!’

ধারাভাষ্যকক্ষে তামিম ইকবাল খান চোখে পানি নিয়ে পাগলের মত চেঁচিয়ে চলেছে! পাশে বসা দু,জন তাঁকে থামাচ্ছেন না! মিটি মিটি হেসে চলেছেন! তামিম না, সারা বাংলাদেশ পাগল হয়ে গেছে! এই রাতটা আর যাই হোক, তাঁদের কেউ থামাতে পারবে না।

বেঞ্চের সব প্লেয়াররা উঠে তাঁর পাশে আগেই দাঁড়িয়েছিল, স্টাম্প ভাঙ্গা মাত্র তাদের নিয়ে ছুট লাগালেন কাঁচাপাকা চুলের কোচ! সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে দ্রুতগতির দৌড়টা দিয়ে খেলোয়াড়দের আগে তিনি পৌঁছে গেলেন মাঠের মাঝখানে মতিউর কে ঘিরে হইহই করতে থাকা শীষ্যদের কাছে!

উন্মাদের মত ঝাঁপিয়ে পড়লেন মতিউরের উপর! বুকে জড়িয়ে ধরে বেশ কয়েক সেকেন্ড কাঁদলেন অধিনায়ক জুয়েলকে নিয়ে! প্লেয়াররা মাঠের মাঝখানে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, উল্লাস করতে ভুলে গেছে! সারাজীবন নিজের আবেগ অনুভুতিকে পেশাদারিত্বের খোলসে আটকে রাখা কোচ আজ তাদের বয়সে নেমে এসেছেন! হয়ত এখন তিনি এখানে নেই! চলে গেছেন সেই ২০১২ এশিয়া কাপে, অথবা ২০১৬’র সেই এশিয়া কাপ ফাইনালে!

কনফেত্তি উড়ছে, আতশবাজি ফুটছে! মাঠে নেমে এসেছেন বোর্ড পরিচালক মাশরাফি বিন মুর্তজা, পেস বোলিং কোচ মুস্তাফিজ স্পিন কোচ আব্দুর রাজ্জাক! তামিম ইকবাল ধারাভাষ্য কক্ষ থেকে অস্থিরভাবে চেচাচ্ছেন, মাঠে যেতে পারছেন না! তারা সবাই তো একই গাছের ফুল ছিলেন একসময়! আজ আবার তাদের যৌবনে ফিরে এসেছে! সকলে মাঠে এসেছেন খেলোয়াড়দের তো বটেই, তাদের সাবেক সতীর্থকেও অভিনন্দন জানাতে!

মধ্যবয়স্ক কোচ ততক্ষনে আর এক জায়গায় স্থির নেই! খেলোয়াড়রা তাঁকে কাঁধে তুলে নিয়েছে! সারা মাঠ ঘুরছে! অশ্রুসজল চোখে তিনি মনে করছেন তাঁর খেলোয়াড়ি জীবনটা! সেইই মাগুরা, টেপ টেনিস টুর্নামেন্ট, বড় হাতার সোয়েটার, বাবার ব্যাট কেটে ফেলা, ২০০৬ এর ১৮ বছর বয়সী বালকটা, ২০০৯ সালে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারের স্বীকৃতি, ক্যাপ্টেন্সি, সেই নিউজিল্যান্ড বাংলাওয়াশ, ২০১২ এশিয়া কাপ, সেই কার্ডিফের মহাকাব্যিক সেঞ্চুরি… আরও কতো কি!

কতো সংগ্রাম, কতো গৌরব, কতো অপমান… আজ সব শেষ হল, পূর্ণতা পেল তাঁর জীবন! খেলোয়াড় না হোক, কোচ হিসেবেই সই… বাংলাদেশকে কিছু দিতে পেরেছেন তিনি।

অভূতপূর্ব একটা ঘটনা ঘটছে স্টেডিয়ামে! ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ চ্যান্ট শেষ… নতুন চ্যান্ট শুরু হয়েছে, তাও আবার কোন প্লেয়ার নয়! কোচকে নিয়ে! সারা শেরেবাংলা স্টেডিয়াম গাইছে!

সাকিইইইইব সাকিব!

সাকিইইইইইব সাকিব!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।