বাংলাদেশের অক্সিজেন

বিজ্ঞান বলে, মানুষের বেঁচে থাকতে হলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অক্সিজেনের। ছোটবেলায় ‘পরিবেশ পরিচিতি সমাজ’ বইতে পড়েছি মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রধান কয়েকটি মৌলিক অধিকার আবশ্যিক ভাবে প্রয়োজন। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এবং চিকিৎসা।

তবে, বিজ্ঞানীরা যেটা জানেনা, যেটা পরিবেশ পরিচিতি সমাজ বইতে থাকেনা, আমার জীবনের সবচেয়ে বেশি নির্ভেজাল অক্সিজেন এবং সর্বপ্রধান মৌলিক অধিকারের নাম ‘সাকিব আল হাসান’।

ক্রিকেট নিয়ে আমার যাবতীয় আবেগ-অনুভূতির বীজবপণ ২০০৩ সাল থেকে – প্রথম যেদিন বাবা’র সাথে মাঠে খেলা দেখতে যাই। এরপর থেকে এতগুলো বছরে ক্রিকেট আমার রক্তে এমনভাবেই মিশে গেছে, পাগলামো গুলো এতোটাই পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটেছে যে, প্রেমিকার অভাব কখোনই ওভাবে অনুভব করিনি।

ক্রিকেট নিয়ে আমার এতো আবেগ-অনুভূতি সম্পন্ন জীবনে একদিন এক ‘মহানায়ক’ এর আগমন ঘটে। যে নায়কের প্রেমে পড়ি, ত্রিদেশীয় সিরেয়ে অসাধারণ থ্রো-তে শ্রীলঙ্কার ব্যাটসম্যান কে রানআউট করা দেখে, ফাইনালে ওঠাতে ২৫ ওভারের আগেই ম্যাচ জেতার টার্গেট এচিভ করা দেখে।

এক হাতে, দূর্দান্ত অধিনায়কত্বে ব্লাকক্যাপদের প্রথমবারের মতো হোয়াইটওয়াস এবং সিরিজ সেরা হতে দেখে। ২০০৯ সালে ক্যারিবিয়ান সফরে সিরিজ সেরার ভয়ানক মূর্তি দেখে।

এই যে প্রেমে পড়া, এই যে একটা মানুষকে ভালো লেগে যাওয়া, তাঁকে নিয়ে রুপকথার রাজ্যে ঘুরে বেরানো। আমার কৈশর টাকে এতো রাঙিয়ে তোলা, এ স্মৃতি রোমন্থনে তো শুধু সুখ আর সুখই, দু’চোখে ভেসে উঠে, হৃদয়টাকে প্রশান্তিতে ভরিয়ে তোলে।

বছর ঘুরেছে, এই মানুষটার প্রতি প্রেম, ভালোবাসা, আবেগ, অনুভূতি যেমন বেড়েছে এই মানুষটাও নিজেকে ছাড়িয়ে গিয়েছেন দিনে দিনে। বাগানের সবথেকে আকর্ষনীয় ফুলের মতো সুবাতাস ছড়িয়েছেন দেশের ক্রিকেটে, প্রশান্তির অন্যতম উপকরণ হয়ে ঠাণ্ডা করেছেন লাখো ভক্তের তৃষ্ণার্ত হৃদয়।

২০১২ থেকে ২০১৭ – এই মানুষটাকে কতবার চোখের সামনে পেয়েছি ইয়ত্তা নেই। যখনই সামনে দিয়ে গিয়েছেন, একটা বারও মুখ ফুটে বলতে পারিনি, ‘আপনাকে ভালোবাসি…!’

মনে হতো, আমার ভেতর দিয়ে যেনো হাজার ভোল্টের বিদ্যুতের প্রবাহ বয়ে যাচ্ছে, এক অজানা শিহরণে ভেতরটা কেঁপে উঠতো। মানুষটার সামনে সদ্যজাত শিশুর মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছাড়া আর কিছুই করার শক্তিটা তখনও অর্জন করতে পারিনি।

একটা সময় টিভির সামনে বসে থাকতাম। সাদাকালো টিভিতে খেলার চ্যানেল বলতে টেন স্পোর্টস অন্যতম ভরসা।মারুতি-সুজুকি প্রেজেন্টস টপ টেন বোলার, ব্যাটসম্যান, অল-রাউন্ডারের তালিকা দেখাতো প্রতি ঘন্টায়। চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করতাম এটার। ১০ নম্বরে যদি বাংলাদেশ এর কাউকে দেখতাম কি যে প্রশান্তি বয়ে যেতো ভেতরটায়… আহা!

১০ নম্বরে বাংলাদেশের কাউকে দেখার জন্য অপেক্ষারত জাতিকে এই মানুষটা দেখালেন এক নম্বরের নামের পাশের পতাকাটাও লাল-সবুজের হওয়া সম্ভব।

উঁনি শুধু দেখিয়েই শান্ত থাকেননি, বছরের পর বছর এই সেরাদের তালিকায় থেকে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করে লাল-সবুজের পতাকা ওড়াচ্ছেন, দেশ থেকে দেশান্তরে – কাউন্টি থেকে বিগব্যাশ, আইপিএল থেকে সিপিএল।

বিশ্বের এ প্রান্ত থেকে ঐ প্রান্ত ‘দিস ইস সাকিব আল হাসান ফ্রম বাংলাদেশ’ ধ্বনি টা যতবার উচ্চারিত হয়, গর্বে বুঁকের ছাতিটা অনেক বড় হয়ে যায়, অনেক বড়।

ভদ্রলোকের সাখে এখনও যখন দেখা হয়, ভালোভাবে কথা বলতে পারিনা। শুধু তাঁর প্রশ্নের উত্তরটা দিয়ে আগের মতই ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকি, বলতে পারিনা তাকে কতটা ভালবাসি।

এই মানুষটাকে নিয়ে আমি যখনই কিছু লিখতে যাই, চোখের পানি অজান্তেই চোখ বেয়ে গালে যায়গা করে। এতো আবেগ-ভালোবাসা যেই মানুষটার প্রতি সেই মানুষটাকে সৃষ্টিকর্তা সবসময় ভালো রাখুক, সুস্থ রাখুক।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।