আসুন, বদহজমের কারণ খুঁজি

হুমায়ুন ফরীদিকে মনে আছে? উনি বেনামে একটা ছবি প্রযোজনা করেছিলেন। পরিচালক নিয়েছিলেন শহিদুল ইসলাম খোকন কে। কাস্টিং করেছিলেন টিভির বিখ্যাত ট্রায়াঙ্গল কে (আফজাল-সুবর্ণা -ফরিদী)। ছবিটা করতে গিয়ে অর্থ সঙ্কটে পড়েন। শেষ মেশ বাড়ি বিক্রি করেন। বাড়িটা মিনু ভাবির (প্রথম স্ত্রী, দেবযানীর মা) শেষ স্মৃতি ছিলো। ভেবেছিলেন, স্মৃতি দিয়ে কি হবে। ছবিটা মুক্তি দেন। ছবিটা ফ্লপ হলো। শিক্ষা পেলেন, কমার্শিয়াল ছবি ভিন্ন জিনিস।

খলিল রোজী একটা ছবি প্রযোজনা করেছিলেন। এই ঘর এই সংসার। কাস্টিং হিসেবে সালমান শাহ ছিলো, ছবিটা করতে গিয়েও নিজেদের বাড়ি বিক্রি করা লেগেছিল। সালমান শাহকে নেয়া সত্ত্বেও ছবিটা ফ্লপ করে। উনারা শিক্ষা পেলেন, কমার্শিয়াল ছবি ভিন্ন জিনিস।

আম জনতা যখন ছবি দেখে, ছবিতে নায়ক হিসেবে নিজেকে কল্পনা করে। নায়কের বড় হওয়া, প্রেমে পড়া, শত্রুকে মার দেয়া, সব কিছুতেই নিজেকে কল্পনা করে নেয়। একইভাবে নায়িকা কেও। এজন্যই বেশির ভাগ ছবিতে নায়ক কে গরিব আর নায়িকা কে বড় লোক দেখানো হয়। খুব কমন কমার্শিয়াল ছবির ফর্মুলা। যখনই আপনি এর বাইরে যাবেন, তখনি ধরা খাবেন। মাস পিপল ওই ছবি দেখে না।

তার মানে মাস পিপল কমার্শিয়াল মশলাদার ছবি দেখে। তাহলে ছবি বানাবার সময় মাথায় এটা রাখতে হবে। এখন মশলা যোগ করতে গিয়ে যদি মাথায় ইংল্যান্ড আর হাতে ব্রাজিলের পতাকা লাগাই তাহলে কেমন হয়? কিংবা কৃশ ও মাঘাধিরা দুইটার ফ্লেভার একসাথে ঢুকালে?

আমাদের বাজেট কম। সব সুপার হিরোকে আলাদা ভাবে কপি করে ছবি তৈরী সম্ভব না, তাই চাহিদা মেটাতে সব গুলা একটার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া অন্যায় কিছু না। মেনে নেয়া যায়। মাস পিপল খাবে এটা। আর নকল সব জায়গাতেই হয়। কোরিয়ান ছবিকে হলিউড ছবিকে কাট টু কাট নকল করছে বলিউড। সো আমরা করতেই পারি। দোষের কিছু নেই।

আচ্ছা জন আব্রাহামের একটা হিন্দি ছবি ছিলো, রকি হান্ডসাম, যেটা কোরিয়ান একটা ছবি থেকে কপি করা। এখন কল্পনা করুন, আব্রাহাম এর জায়গায় গোবিন্দ যদি ছবিটা করে? কিংবা ইরফান খান ? এর মানে হচ্ছে কাস্টিং গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের মনসুর খান কে মনে আছে? নায়ক আমির খান এর কাজিন। উনি ‘কেয়ামাত সে কেয়ামাত’ তাক ছবির পরিচালক ছিলেন। উনি সোহানুর রহমান সোহান এর পরিচালনায় কেয়ামত থেকে কেয়ামত ছবিটা দেখে শুধু অবাকই হননি। হাতে লেখা একটা প্রশংসা পত্র পাঠিয়েছিলেন। উনি স্বীকার করেছেন। সোহান এর পরিচালনা, নিজের চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে।

সোহান খুশি হয়ে, তিন বছর চেষ্টা করে আবার বাংলা রিমেক করেন ‘সাজান’-এর। এবার কিন্তু চরম অপমান শুনেন, কাস্টিং নিয়ে। এর মানে হচ্ছে, পরিচালক বা কাস্টিং দুইটাই গুরুত্বপূর্ণ, রিমেক বা নকল বা কপি ছবিতে।

উত্তম আকাশ সাহেব, ভালো মানের পরিচালক। তাঁর ‘কে অপরাধী’ অন্যতম ভালো ছবি। ওনার কাস্টিং সেন্স অনেক ভালো। সে সেসময়ে অনেক ভালো মানের ছবি বানিয়েছেন, এবং দর্শক টেনেছে। এতদিন পরে এসে সেই দর্শক গুলো কিন্তু বুড়ো হয়ে গেছে। নতুন দর্শক এসেছে, নতুন মন মানসিকতা নিয়ে। এদের এক চোখ হলিউড, এক চোখ বলিউডের ছবি দেখে অভ্যস্ত। এতদিন পর এসে পরিচালক যদি সেই আগের মন মানসিকতা নিয়ে ছবি বানান, তাহলে ব্যাপারটা নিতান্তই হাস্যকর হয়ে যাবে। উনার মত অভিজ্ঞ মানুষের দ্বারা এমন পরিচালনা নিতান্তই পীড়াদায়ক।

দু’টো মন্তব্য বেশ দেখলাম। শাকিব এমন ছবি করেছে কেন? প্রযোজকদের চাপে পরে? এখনো রুচি চেঞ্জ হয় নাই, আগের মত আছে?

আসলে প্রযোজকদের চাপে পরে শাহরুখ খানও নগ্ন দৃশে অভিনয় করেছিলেন। সেখানে শাকিব করতেই পারে। কিন্তু কস্টিউমের ব্যাপারটা? এটা তো প্রযোজক সম্পূর্ণ ছেড়ে দেন অভিনেতার উপরে। অভিনেতা শক্ত প্রতিবাদ জানালে পরিবর্তনে বাধ্য হন। কিন্তু, টিজার এ যা দেখা গেলো, শাকিব স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই অভিনয় করে গেছেন। তাঁকে এখন এক নাম্বার নায়ক বলা হয়। একটা বলয় তৈরী হয়েছে তাকে ঘিরে। এই সময়টা হচ্ছে বাছবিচারের সময়। এখন সেটা না করে সব যদি গিলে তাহলে শেষমেশ তাঁর নিজেরই ক্ষতি।

ছবি মুক্তির আগেই বিশাল লেখা হয়ে গেছে। ব্যাপারটা কিছুটা হাস্যকর। শুধু আমি না, অনেকেই লিখেছেন। এরা বাংলা ছবির প্রেমিক। এরা মনে প্রানে চান মান সম্মত বাণিজ্যিক ছবি হোক। এই ছবিটি ঈদে মুক্তিও পাবে, ব্যাবসা ও করবে। লাভ উঠে আসবে। কিন্তু ঐ এক সপ্তাহ পর এই ছবিটি হারিয়ে যাবে। এ ছবি দর্শক দের মন ভরাতে পারবে না। অভিনেতাদের উচিত দায়িত্বশীল হওয়া। ওনারা দায়িত্বশীল হলে এসব মানহীন ছবি তৈরি হয় না। আমাদের ও হল বিমুখ হতে হয় না।

আমরা খাবার প্রতি বেলাই খাই। কখনো মজা হয়, কখনো হয় না। মাঝে মাঝে বদহজমও হয়। তাই বলে কি খাওয়া ছেড়ে দেই? বদহজমের কারণ খুজে বের করি, আর যাতে না হয় সে চেষ্টা করি।

আশা করবো নামি দামি অভিনেতা নির্মাতারা ও বদহজম থেকে শিক্ষা নিবেন।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।