আমাদের স্বঘোষিত সুপারস্টার জাতেও মাতাল, তালেও মাতাল।

একটা সময় ছিল যখন শাকিব খানের ছবিকে লোকে রিকশাওয়ালার ছবি বলত। খান সাহেব নাকি তা নিয়ে গর্ব করে বলতেন, আমি না হয় রিকশাওয়ালাদের হিরো হয়েই থাকলাম। তাদের জন্যই না হয় সিনেমা বানালাম। এখন সেই রিকশাওয়ালারাও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। দেশের সমস্ত রিকশাওয়ালারা যদি দলে দলে হলে গিয়ে শাকিবের ছবি দেখত, হল সংখ্যা দিন দিন কমত না।

শাকিব খান ইন্ডাস্ট্রিতে আছেন একুশ বছর ধরে। একুশ বছরে তার উল্লেখযোগ্য সিনেমার নাম বলতে গেলে কয়টার নাম বলতে পারব আমরা? থাকলে তবেই তো বলার সুযোগ তৈরি হয়। সুভা, সত্ত্বা এগুলো শাকিব করেছেন। মান্না, ফরিদীদের সঙ্গে একটা ছবি করেছিলেন মায়ের মর্যাদা নামে। সেগুলো রিকশাওয়ালার পাশে বসে অভিজাত মানুষও দেখেছে। এত বছর পর শাকিবের সিনেমা বের হলে দর্শক হুমড়ি খেয়ে পড়ার কথা।

তামিলনাড়ুতে রজনীকান্তের ছবি রিলিজ হলে সেখানে প্রতিষ্ঠান ফাঁকা হয়ে যায়। সকলে ছোটে হলের দিকে। রজনী কি আহামরি সিনেমা উপহার দেন? দিতেন একটা সময়। এখন কিন্তু দেন না। কাবালি, কালা, পেট্টা, দরবার; সর্বশেষ কাজগুলো গরপড়তা মানের চেয়ে বেশি নয়। তবুও দর্শক যাবে হলে। তারা জানে, সিনেমার মূল যে উপজীব্য সেই বিনোদন পরতে পরতে পাবে রজনীর সিনেমায়। রজনী আর শাকিব এক নন। আবার আমাদের ইন্ডাস্ট্রি হিসাব করলে শাকিব খানের ক্রেজ রজনীর চেয়ে কম নয়। তাহলে দর্শক যাচ্ছে না কেন? কারণ বিনোদন পাচ্ছে না তারা।

থ্রিলার গল্পে দর্শক থ্রিলার খোঁজে। প্রেমের গল্পে প্রেম, জীবনঘনিষ্ঠ সিনেমা দেখে দর্শক কাঁদতে চায়। কমেডিতে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরাতে চায়। অ্যাকশনে তাদের প্রয়োজন ধুন্ধুমার উত্তেজনা। খান সাহেব এখানে নিদারুণ ব্যর্থ। সস্তা অ্যাক্টিং আর চূড়ান্ত ভাঁড়ামিতে মানুষ অতিষ্ঠ। সম্প্রতি মুক্তি পায় বীর সিনেমা। সেই সিনেমার প্রমোশনে তিনি বলেন, ‘বলিউডের তিন খানের মতো বছরে একটা ছবি করলে আমাদের পোষাবে না।’

সেখানে উপস্থিত কয়েকজন নির্মাতাকে উল্লেখ করে বলেন, ‘আগে আমি যেমন বছরে ২০টা ছবি করতাম। এমনো দিন গেছে সকালে এই ছবি তো দুপুরে ওই ছবি, সন্ধ্যায় আরেকটা রাতে অন্যটার শুটিং। দুই ঘন্টা এফডিসিতে ঘুমিয়ে সকালে আবার অন্য ছবির কাজ শুরু। এখন আবার সময় এসেছে সেই পুরনো দিনে ফিরে যাওয়ার। বছরে ২০টা ছবি করার।’

সিরিয়াসলি শাকিব? একটা মানুষ চূড়ান্ত মূর্খ হলেও এভাবে কথা বলে কি না সন্দেহ আছে। শাকিব, বছরে একগাঁদা সিনেমা করেছিলেন তো আপনি। এমন বহু ঈদ গেছে, আপনার ছয় আটটা ছবি রিলিজ পেয়েছে। নিজেও সেসবের খবর রাখতেন না। অথচ সিনেমা নাকি আপনার সন্তান! ব্যাপারখানা এমন, আগের জমানায় একেকজন পুরুষ ডজন ডজন বাচ্চার জন্ম দিত। বেলাশেষে নিজের সন্তানের নাম বলতে পারত না সেই পিতা, চিনত না সকলকে।

মশাই, আপনি বললেন খানেদের মতো বছরে একটা ছবি করলে পোষাবে না। অক্ষয়, আয়ুষ্মানদের দিকে তাকাননি কেন? ওরা বছরে তিন চারটে ছবি করছে, মানসম্পন্ন এবং বক্সঅফিস হিট। দুই ঈদে দুটো, দূর্গা পূজো ক্রিসমাসে দুইটা হলে বছরে চারটা হলো। বিশটা করে কোয়ালিটি ঠিক রাখতে পারবেন না, একটা করার মতো ডেডিকেটেড আপনি নন। চারটা করুন। তবু মানসম্মত কাজ উপহার দিন।

মালায়লাম অভিনেতা মোহনলালের একবার বছরে ৩৩টা ছবি মুক্তি পেয়েছিল। যাতে ২৫ টার কাছাকাছি হিট। এর মানে এই নয়, এরপর থেকে তিনি বছরের পর বছর একসাথে এত সিনেমায় কাজ করেছেন! সালমান শাহ ইন্ডাস্ট্রির হিরোদের পথিকৃৎ। অথচ ক্ষণজন্মা তিনি। আর একুশ বছরে আপনাকে ক’জন আদর্শ মানে?

আপনি স্বঘোষিত সুপারস্টার। মজার ব্যাপার কও জানেন? বাইরের দেশের কেউ যখন আমাদের সিনেমা নিয়ে ঘাঁটবে, সেরা সিনেমাগুলোর খোঁজ লাগাবে, সেখানে তখন আপনার ছবি থাকবে না তেমন। থাকবে মনপুরা, আয়নাবাজি, অজ্ঞাতনামা, ঢাকা অ্যাটাক, স্বপ্নজাল, গহীন বালুচর, হালদা, ব্যাচেলর, আমার আছে জল, ঘেঁটুপুত্র কমলার মতো সিনেমাগুলি। আশি নব্বইয়ের দশকেরগুলি বাদ দিলাম। এই শতাব্দীর ছবি হিসেবে আপনার দুয়েকটা ছবি থাকতে পারে বড়জোড়। ভিনদেশি লোকেরা জানতেই পারবে না, আপনি কতটা সো কল্ড পরিশ্রম করছেন!

শাকিব, নামের প্রতি সুবিচার করবেন কবে! না পারলে ছেড়ে দিন না অভিনয়। থেকেও তো কোন ফায়দা হচ্ছে না। চলচ্চিত্র একটা শিল্প। শিল্পে যিনি সবার আগে থাকেন, তার দেখানো পথে বাকীরা হাঁটে। আমাদের দুর্ভাগ্য, শাকিব খানের মতো একটা ক্লাসলেস ব্যক্তি এই শিল্পের মাথায় চড়ে বসে আছে। তিনি শুধু বকবক করতেই ওস্তাদ। তার মতে, ইন্ডাস্ট্রিটা একা হাতে বাঁচাচ্ছেন তিনি। সেই বাঁচানোর কায়দা এতটাই জঘন্য যে কেউই এগিয়ে আসছে না। উল্টো হাসছে। বাংলা চলচ্চিত্রের ধ্বংসের পেছনে, আজকের এই অধঃপতনের পেছনে শাকিব খানের দায় কোন অংশে কম নয়।

গত ঈদে পাসওয়ার্ড সিনেমার প্রচারে তিনি বলেন, ‘আমি সিনেমার মানুষ। আমাকে সুন্দরবনে ছেড়ে দিলেও ইন্টারন্যাশানাল লেভেলের সিনেমা উপহার দিতে পারবো।’ আফসোস, যেই সিনেমা তার রুটিরুজি সেই সিনেমা শব্দটাই উচ্চারণ করতে পারেন না ঠিকমতো! এই শাকিবই কিন্তু শিকারি, নবাব করেছিল। নাকাব করেছিল।

কলকাতায় তার এই ছবিগুলো হয়ত নকল, তবে অভিনয় বাংলাদেশের চাইতে হাজারগুণ ভালো করেছে সেখানে। দেশ ছেড়ে যখন দেশের বাইরে গেলেন, একটু হলেও উন্নতি বাংলার সিনেপ্রেমীরা আশা করতেই পারত। কিসের কী! যাহা লাউ তাহাই কদু, সেটা আবারো প্রমাণ করলেন। অপু, বুবলি, বিয়ে এসব ইস্যুতে শাকিব বেঁফাস কথাবার্তা বলেন। যাই বলুক, আসল কাজ অভিনয়টা যদি ঠিকঠাক করত তাহলে মানা যেত। বলা যেত, জাতে মাতাল হলেও তালে ঠিক। কিন্তু হায়, আমাদের স্বঘোষিত সুপারস্টার জাতেও মাতাল, তালেও মাতাল।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।