সাকিব, সাক্ষাৎকার এবং উপলব্ধি

আজকের প্রথম আলোয় সাকিব আল হাসানের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ পেয়েছে। খুব দীর্ঘ নয়, তবু নাতিদীর্ঘ এই আলোচনায় সে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট তুলে ধরেছে। বাংলাদেশ দল নিয়ে যারা ভাবেন তাদের জন্য কিছু ইঙ্গিত রয়েছে।

  • পয়েন্ট ১

সে বলেছে অধিনায়ককে অবশ্যই পারফর্ম করতে হবে। মাশরাফির পারফরম্যান্সহীনতা বিশ্বকাপে যে বাংলাদেশকে অনেকখানি পিছিয়ে দিয়েছে এটা সে অকপটে উল্লেখ করেছে।

  • পয়েন্ট ২

বিশ্বকাপ চলাকালে সাইফুদ্দিনকে নিয়ে একটি নেগেটিভ রিপোর্ট এসেছিল কালের কণ্ঠ আর প্রথম আলোতে; সে নাকি বড়ো দলের বিপক্ষে খেলতে ভয় পায়। সাকিব বলেছে, দলে যারা ছিল প্রত্যেকেই জানে এই রিপোর্টটা কে ‘করিয়েছে’। আমি ক্রিয়াপদটিকে উদ্ধরণ চিহ্নাধীন রাখলাম বিশেষ দৃষ্টিপাতের উদ্দেশ্যে। করেছে নয়, ক্রিয়াপদটি হলো করিয়েছে।

  • পয়েন্ট ৩

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মন্থর ব্যাটিংয়ের কারণে পরের ম্যাচে সাকিব মাহমুদউল্লাহকে একাদশের বাইরে রাখার জন্য অধিনায়ক মাশরাফিকে পরামর্শ দিয়েছিল, সাকিব আর মাহমুদুল্লাহ-এর মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চলেছে – এই সংবাদ বেশ কয়েকটি মিডিয়ায় চলে আসে, সম্প্রতি মাহমুদউল্লাহ ফেসবুক লাইভে এসে এ ব্যাপারে মন্তব্য করেছে।আজ সাকিবের উত্তর ছিল সে এরকম কিছু বলেনি, যদি বলেও থাকে সেটা মিডিয়ার কাছে গেল কীভাবে, এই দায় কার?

সে আরো সুনির্দিষ্টভাবে ইঙ্গিত দিয়ে বলেছে, বিদেশি কোচরা নিশ্চয়ই সাংবাদিকদের বলেনি, দলের পরিকল্পনায় ২-১ জন মানুষই সংযুক্ত থাকে, নিজেদের মধ্যে কথা বলে বাংলাতেই, কোচরা তা বুঝতে পারেনি নিশ্চয়ই। কে জানালো তবে? সঙ্গে সে এও বলেছে, কারো চোটের কারণে কেউ একাদশে সুযোগ পেল, তার সামনে গিয়ে যদি বলা হয় অমুক থাকলে কত ভালো হতো, সুযোগ পাওয়া খেলোয়াড়টি কি জীবনেও ভালো খেলতে পারবে? এবং সবশেষে সে বলেছে, এরকম যখন শুরু হয়েছে ‘তখনই বুঝেছি এই দলের পক্ষে ভালো করা সম্ভব নয়’।- ইনভার্টেড কমার মধ্যস্থিত বাক্যটি লক্ষণীয়।

  • পয়েন্ট ৪

টেস্ট, টি-টোয়েন্টি কোনো ফরম্যাটেই অধিনায়কত্ব করার জন্য সে মানসিকভাবে প্রস্তুত নয়। কিন্তু দল এখন যেরকম অস্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে তাতে সে অধিনায়ক হলে দলের জন্য ভালো হয়। অধিনায়কত্ব না করলে সে নিজের খেলাতে আরো বেশি মনোযোগ দিতে পারবে, তাতে দলেরও উপকার হবে। সে বরং নতুন কাউকে অধিনায়ক করার ব্যাপারে ইঙ্গিত দিয়েছে৷ সে ২২ বছরে অধিনায়কত্ব পেয়েছিল, তখন তার মধ্যে কী আছে না আছে এ ব্যাপারে কে জানতো। অনুরূপভাবে যাদের এখন ২৫-২৬ বছর বয়স তাদের কাউকে দায়িত্ব না দেয়া অবধি বোঝা যাবে না সে পারবে কিনা।

উপরোক্ত ৪ পয়েন্টের বাইরে, বিশ্বকাপে নিজের অতিমানবিক পারফরম্যান্সের পেছনে বিভিন্ন ফ্যাক্টরের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর উৎসাহ প্রদানকে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে। খেলার মাঠের বাইরের খেলাতেও সে দক্ষ হয়ে উঠেছে এটা তারই প্রমাণ। অবশ্য তার ক্যারিয়ারের যতটুকু সময় অবশিষ্ট আছে তাতে ভবিষ্যত ভাবনাটা মাথায় রাখতেই হচ্ছে।

ইন্টারভিউটা পর্যালোচনা করলে দুটো মূল প্রতিপাদ্য পাই।

  • প্রতিপাদ্য ১

বিশ্বকাপের জন্য সে বিশেষভাবে প্রস্তুতি নিয়েছে। কম্পিউটার অ্যানালিস্টদের কাছ থেকে দুর্বলতা সম্বন্ধে জেনেছে। অতিরিক্ত প্র‍্যাক্টিস করলেই ভালো পারফর্ম করা যাবে, এই নীতির সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছে। ভাগ্যের ব্যাপারটা সামনে আনেনি। তার ভাবনা ছিল নয় ম্যাচে গড়ে ৫০-৫৫ করে রান করলেও ৫০০ রান হয়, সাথে ১২-১৫ টা উইকেট। সে ক্যালকুলেটিভ ছিল। সঙ্গে সে এটাও বলেছে, অনেকদিন অলরাউন্ডার তালিকায় ১ নম্বরে থাকলেও বড়ো মঞ্চে পারফর্ম্যান্স ছিল না, এটা এক ধরনের অতৃপ্তি হিসেবে কাজ করেছে।

গতকাল প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করণে সে ধর্তব্যযোগ্য আরেকটি মন্তব্য করেছে, বেন স্টোকস প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে। আগে যখন সে অলরাউন্ডারের তালিকায় উপরে ছিল তখন নিচের নামগুলো ( জয়াসুরিয়া, রাজ্জাক) অনুপ্রেরণা যোগাতো, বিগত কয়েক বছরের নামগুলোতে কোনো চ্যালেঞ্জ পাচ্ছিল না, স্টোকস যেভাবে খেলছে তাতে উপরের স্থানটা তার প্রাপ্যই।

  • প্রতিপাদ্য ২

সমগ্র ইন্টারভিউতে মাশরাফির প্রতি চরম বিরক্তি প্রকাশিত হয়েছে। তার ইঙ্গিতপূর্ণ ব্যক্তিত্বটি যে মাশরাফি এটা বুঝতে কারোরই সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তামিম ইকবালের ফর্ম নিয়ে বেশি আলোচনা করতে গিয়ে মাহমুদুল্লাহ যে আলোচনার বাইরে থেকে যাচ্ছে সেই প্রসঙ্গটি তার সাক্ষাৎকারে না এলেও পরোক্ষভাবে এটি প্রতিষ্ঠিত ( মাহমুদউল্লাহ’র ফেসবুক লাইভের অ্যাপ্রোচ এবং সাকিবের ‘যদি বলেও থাকি’ কথাটা এবং গতকাল কালের কণ্ঠ অনলাইনে প্রকাশিত ফরহাদ রেজার একটি বক্তব্য, যেখানে সাকিব তাকে উৎসাহ দেয়ার জন্য বলেছে – ‘ভালো খেললে থাকবেন, না পারলে চলে যাবেন’) যে, মাশরাফির শাসনামলে তামিম, মাহমুদউল্লাহ যেরকম অটো চয়েজ হিসেবে খেলে গেছে, পারফরম্যান্স এবং কন্ট্রিবিউশন নিয়ে মাথা ব্যথা ছিল না, সেই সংস্কৃতিতে এবার পরিবর্তন আসবে।

২-৩ দিন আগেই প্রথম আলোর অনলাইনে নতুন খেলোয়াড় নেয়া প্রসঙ্গে সাকিব একটি ঝাঁঝালো বক্তব্য দিয়েছে – ‘জাতীয় দল কোনো এক্সপেরিমেন্টের জায়গা নয়। কোনো দল যখন কাউকে সুযোগ দেয় এটা ভাবে না যে প্লেয়ারটা কেমন দেখি, সুযোগ দেয়া হয় ম্যাচ জেতার জন্য।’

সাকিবের প্রধান চ্যালেঞ্জ মাঠে অবশ্যই, তবে মাশরাফিকে অবলম্বন করে জনপ্রিয়তা পাওয়া ক্রিকেট সাংবাদিকদের ট্যাকল করাটাও তার জন্য সমান চ্যালেঞ্জিং হবে নিকট ভবিষ্যতে। বাংলাদেশ একটি মিডিওকর দল, হার আর জিতের অনুপাত প্রায় কাছাকাছি থাকে; ২০১৫ এর তিনটি সিরিজ( ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা) জয় এদেশের ক্রিকেটকে একটি মিথের উপর ভর করে এগিয়ে নিয়েছে। এর বাইরেও সাফল্য যেমন আছে, ব্যর্থতাও সমপরিমাণ। মিডিওকর দলের জন্য এটাই প্রযোজ্য। কিন্তু মাশরাফি-কেন্দ্রিক সাংবাদিকদের বদৌলতে আমরা মুদ্রার এক পাশটাই দেখেছি শুধু। নিচের টায়ারের দলের বিপক্ষে ক্রমাগত খেলাকেও আমরা বড়ো অর্জন হিসেবে দেখেছি, যার প্রভাবে কেনিয়া স্ট্যান্ডার্ডের বোলিং অ্যাটাক নিয়েও সেমিতে খেলাটাকে স্রেফ সময়ের ব্যাপার হিসেবে দেখেছি।

ওয়ানডে লিগের কারণে নিচের টায়ারের দলের বিপক্ষে ইচ্ছেমতো খেলার সুযোগ রহিত হয়েছে, টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চালু হচ্ছে; এমতাবস্থায় বঞ্চিত-ক্ষুব্ধ সাংবাদিক প্যানেল যদি মুদ্রার অন্য পাশকেই প্রাধান্য দিতে শুরু করে, জনমত কোনদিকে যায় সেটাও একটা ইন্টারেস্টিং পর্যবেক্ষণ হতে পারে।

সাকিবের বক্তব্যে কোনো অনুভূতি জর্জর গল্প নেই, যা পড়ে মানুষের মন ছুঁয়ে যাবে, তার দার্শনিকতায় মুগ্ধতা তৈরি হবে। কিন্তু আরিফুল ইসলাম রনি, দেব চৌধুরী, মোস্তফা মামুন, দেবব্রত মুখোপাধ্যায় প্রমুখ ক্রিকেট সাংবাদিকদের যে সাংবাদিকতা নীতি তার সাথে সাকিবের বক্তব্য এবং দর্শন কোনোটাই মিলে না, বরং মারাত্মকভাবে সাংঘর্ষিক। বিসিবির পরিচালক, এমনকি স্বয়ং সভাপতিও সাকিবের কাছ থেকে আনুগত্য পেতে ব্যর্থ। মাঠের ক্রিকেট সামলে নিলেও বিসিবি এবং সুযোগসন্ধানী আর সুবিধাভোগী ক্রিকেট সাংবাদিকদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে সাকিব কতটা কী করতে পারবে সেটা এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্নের মুখোমুখি এনে দাঁড় করাবে, নিশ্চিত।

টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, ওয়ানডে লিগ, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি – সামনের দিনগুলোতে কঠিন কঠিন সব অ্যাসাইনমেন্ট, সেখানে দলীয় সাফল্য আনতে একজন-দুইজনের পারফরম্যান্স যথেষ্ট নয়, বিশ্বকাপ তার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত, এর মধ্যে যদি গৃহদাহ চলতেই থাকে, এবং গৃহশত্রুরা ওঁৎ পেতে থাকে ব্যর্থতা দেখবার প্রত্যাশায়, সেই সংকট সামাল দেয়ার স্মার্টনেস সাকিবের কতটা আছে দেখবার বিষয় সেটাই।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।