গাফিলতি নাকি দক্ষতার অভাব?

সাকিবের বাঁ-হাতের কনিষ্ঠা কখনোই আর শতভাগ ঠিক হবে না। ভীষণ দু:খজনক, কিন্তু খুবই সত্যি। তবে গতকাল থেকে যেভাবে ব্যাপারটি ছড়ানো হয়েছে বা ছড়িয়ে পড়েছে, যতটা আতঙ্ক ছড়িয়েছে, তাতে অনেকে ভুল বার্তা অনেকে পেতে পারেন। কখনও আঙুল ঠিক হবে না, এটা মূল দুশ্চিন্তা নয়। মূল দুর্ভাবনা হওয়া উচিত তার আঙুলের ইনফেকশন।

ভুল বার্তার কথা এজন্য বললাম, আঙুল যে ঠিক হবে না, এটা নতুন কিছু নয়, এশিয়া কাপেরও আগের বাস্তবতা। এশিয়া কাপের ইনফেকশনের কারণে নয়। নরম্যালি যে কোনো ফ্র্যাকচারের পরই হাড় আগের মতো শতভাগ নিখুঁত ভাবে জোড়া লাগে না। সেটা খুব জরুরিও নয়। কাজ চালানোর মতো জোড়া লাগলেই চলে।

এশিয়া কাপের বেশ আগে, গত ৮ অগাস্ট বিসিবির প্রধান চিকিৎসক দেবাশীস চৌধুরী প্রেস কনফারেন্সেই এটি বলেছিলেন। আমরা নিউজ করেছিলাম। দেবাশীস দার কথাটুকু হুবুহু তুলে দিচ্ছি।

‘এখন যেটা হচ্ছে, ওর আঙুলের জয়েন্টের দুটি হাড়ে সংঘর্ষ হচ্ছে। হাড় একটু চেছে দিতে হবে। তাহলে আঙুলের মুভমেন্ট আবার স্বাভাবিক হবে। তবে হাড় আবারও পরে বাড়তে পারে। পুরোপুরি রিকভারি কখনোই হবে না। পুরোপুরি রিকভারি জরুরিও নয়। ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ রিকভারি করতে পারলেই ফাংশনাল হয়ে যাবে।’

‘ফাংশনাল’ কথাটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আঙুল কার্যকর হতে কতটা জোড়া লাগা দরকার, সেটিই আসল। শতভাগ জোড়া লাগা জরুরি নয়, সার্জারি ঠিকমতো হলে ৬০-৭০ ভাগ ফাংশনাল হয়েই যাবে। সাকিব তখন ওই আঙুলের ব্যবহার যথেষ্ট করতে পারবেন। বোলিংয়ে এমনিতেও খুব বেশি সমস্যা ছিল না, ব্যাটিংয়ে গ্রিপ করায় ও ঝাঁকি লাগায় ছিল মূল সমস্যা। ৬০-৭০ ভাগ হলে সেই সমস্যা থাকবে না। আজকেও দেবাশীস দার সঙ্গে কথা বলেছি এটা নিয়ে। একই কথা বলেছেন।

আমি যদি এখন বলি, তামিম ইকবালের যে আঙুলে চোট, সেই আঙুলের ব্যবহার আগের মতো আর জীবনেও করতে পারবেন না। সেনসেশন সৃষ্টি হবে? কথাটি কিন্তু সত্যি। তামিম আঙুলটির ব্যবহার আগের মতো করতে পারবেন না। আজকেও বলেছেন। কিন্তু সেটি খুব সিরিয়াস ব্যাপার নয়। কারণ ইনজুরি ঠিক হলে ব্যাট গ্রিপ করার মতো অবস্থায় থাকবে আঙুল। সেটিই যথেষ্ট। শতভাগ দরকার নেই। এখন শতভাগকেই আমরা মূল ইস্যু ধরে আতঙ্ক ছড়াবো নাকি তামিম কবে নাগাদ ফিরতে পারে, সেটি মূল ইস্যু হওয়া উচিত?

গত বছর নিউজিল্যান্ড সফরের শেষ টি-টোয়েন্টিতে মাশরাফির বুড়ো আঙুল ভেঙে প্রায় দুই ভাগ হয়ে গিয়েছিল। সার্জারিও করাননি। সেটা জোড়া লেগেছে বাঁকা ভাবে। শতভাগ আগের মতো নেই। কিছু করার নেই। সেটি নিয়েই খেলতে হবে। তার শরীরের অনেক হাড়ই আছে এরকম। সাকিবের ক্ষেত্রেও এতদিন বলা হয়েছিল যে সার্জারি লাগবেই। এখন বলা হচ্ছে, নাও লাগতে পারে। অস্ট্রেলিয়ায় স্পেশালিস্ট দেখার পর সিদ্ধান্ত নেবেন লাগবে, নাকি লাগবে না। ইনফেকশন না ঠিক হওয়া পর্যন্ত কিছু বলাও কঠিন হবে। সবচেয়ে দুশ্চিন্তার ব্যাপার, ইনফেকশন সেরে যাওয়ার পর দেখা যেতে পারে, হাড়ের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। তখন?

সাকিব কালকে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার সময় অনেক কথার মাঝে ‘কখনও ঠিক হবে না’ কথাটিও বলেছেন। আমরা সেটিকেই মূল ইস্যু ধরে নিয়েছি। ইনফেকশনের কথা অনেকবার বলেছেন, আমরা পাত্তাও দিচ্ছি না। একজন নিজেকে নিয়ে বলছেন যে শরীরের একটি অংশ আগের মত কাজ করবে না, দেখে কষ্ট হওয়া খুবই স্বাভাবিক। খারাপ না লাগার কারণ নেই। কিন্তু সেটির ডামাডোলে মূল ইস্যু চাপা পড়ে যাচ্ছে। ইনফেকশন।

এই ইনফেকশন কেন হলো? কিভাবে হলো? ফিজিওর কাছে কি জবাব চাওয়া হয়েছে?

দলের নবীনতম সদস্যটিও ইনজুরি নিয়ে কোনো টুর্নামেন্ট খেললে তার দিকে ফিজিওর বাড়তি মনোযোগ রাখতে হবে। সেখানে এটি সাকিব, দেশের ইতিহাসের সেরা ক্রিকেটার। তার চোটও বহুল আলোচিত। টুর্নামেন্ট চলার সময় প্রতিনিয়তই তার পরিচর্যা হওয়ার কথা। ফিজিওর খেয়াল রাখার কথা। তাহলে ইনফেকশন কেন বোঝেননি ফিজিও? গাফিলতি নাকি দক্ষতার অভাব?

সাকিব যেদিন দেশে ফিরলেন, তার পরদিনই হাসপাতালে তার আঙুল থেকে এত এত পুঁজ বের করা হলো। আরেকটু দেরি হয়ে ভয়ানক কিছুও হতে পারত। তাহলে আগের দিনও কি বাংলাদেশ দলের ফিজিও সেটা বোঝেননি? আমি ঠিক জানি না, দেশে ফেরার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আঙুলের এতটা অবনতি হওয়া, এত পুঁজ জমা হওয়া মেডিক্যালি সম্ভব কিনা। যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেই, দেশে ফেরার পরই সব পুঁজ জমা হয়েছে, তার পরও প্রশ্ন থেকে যায়। অবস্থা যে এই দিকে গড়াচ্ছে, সেটা ফিজিও কেন বোঝেন নি?

এটা ফিজিওর দক্ষতার অভাব নাকি গাফিলতি, সেটা জানা দরকার। দুটির কোনোটিই মেনে নেওয়ার মতো নয়।

ইনফেকশনের কারণে সবচেয়ে বড় ক্ষতি যেটা হয়েছে, তার সম্ভাব্য সার্জারি পিছিয়ে যাচ্ছে। ইনফেকশন ঠিক না হলে সার্জারি সম্ভব নয়। যত দেরিতে ইনফেকশন সারবে, সার্জারিতে তত দেরি। তার মাঠে ফিরতেও তত দেরি। আরেকটা ভয় এখন যোগ হয়েছে, ওপরে যেটা বলেছি। ইনফেকশন সেরে যাওয়ার পর যদি দেখা যায় হাড় আরও ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে গেছে, তখন?

আমি মনে করি এটিই হওয়া উচিত মূল আলোচনা। আঙুল শতভাগ কাজ করছে না, এটা নিয়ে পড়ে থাকলে ইনফেকশন আড়াল হয়ে যায়। শতভাগ কাজ না করার ব্যপারটি ক্রিকেটীয় ইনজুরি। আরও অনেক ক্রিকেটার, স্পোর্টসপার্সনদের এই বাস্তবতা নিয়েই চলতে হয়। খুব বড় সমস্যা এটি নয়। কিন্তু ইনফেকশন তো ক্রিকেটীয় ইনজুরি নয়। ফিজিও কিংবা যে-ই দায়ী হোক, এটা খুঁজে বের করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিকল্প নেই। যদি ফিজিও দায়ী হন, তার যদি দক্ষতার অভাব থাকে, তাহলে তার নিয়োগকর্তাদেরও কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত। আর যদি গাফিলতি হয়, তাহলে শুধু বরখাস্ত নয়, মামলা করা উচিত।

সাকিবের আঙুলে ইনফেকশন হয়ে গেল, কেউ বুঝতে পারল না, এটা শোনার পর থেকে এখনও পর্যন্ত আমার বিস্ময় কাটেনি। সাকিবের আঙুলে ইনফেকশন, সাকিব…. কেউ বুঝলো না! গুরুতর অপরাধই শুধু নয়, ভয়ঙ্কর কিছু এটা!

– ফেসবুক ওয়াল থেকে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।