ক্রিকেট জুয়া, গৌরবহীন ক্রিকেট ও টিকে থাকা অনিশ্চয়তা

বলতে, লিখতে বা শুনতে খারাপ লাগলেও সাকিব যা করেছেন, তার জন্য শাস্তি ডিজার্ভই করেন। সাকিব সেটা নিজেও স্বীকার করবেন। যেহেতু তার কৃতকর্ম আইসিসির কোড অব কন্ডাক্টের বিরোধী। এটাই এখন সার্টেইন, ভ্যালিড, এস্টাবলিশড। এটা নিয়ে মাইকেল ভন বলেছেন দুই বছর এনাফ না। সাকিবকে আরো বেশি সময়ের জন্য নিষেধাজ্ঞা দেওয়া উচিত ছিল। আরো বলেছেন, নো সিম্প্যাথি। সেটা ভনের ব্যক্তিগত ব্যাপার। কারণ মানুষটা সাকিব, এমন কথা আসাই স্বাভাবিক। জেনেশুনে এসব হতে দিয়েছেন।

ক্রিকেট বেটিং, ফিক্সিং নিয়ে আল জাজিরার আন্ডার কভার স্টিং অপারেশনের ডকুমেন্টারির কথা মনে আছে? ওটা ভন সাহেব দেখেছেন কিনা কে জানে। দেখে থাকলে তার জানারই কথা, তারই অনুজ ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধে ম্যাচ ফিক্সিং, স্পট ফিক্সিংয়ের সরাসরি জড়িত থাকার কথা জানা গেছে। আলজাজিরার মাধ্যমে, তাও জুয়াড়িদের কাছ থেকে সরাসরি। ২০১৭ তে ভারত ট্যুরের ওয়ানডে সিরিজের একটা ম্যাচে সেই মহান কর্ম সাধন করেছিলেন ইংলিশ জেন্টলম্যানরা।

কিন্তু অভিযুক্ত সেই ক্রিকেটাররা তা অস্বীকার করেছেন। এবং ইসিবি তা পাত্তাই দেয়নি। আল জাজিরাকে বলেছে, ‘প্রমাণ ছাড়া কথা বলতে আসছো কিল্লাই?’ সবচেয়ে বড় প্রমাণ কিন্তু ওই ম্যাচের জুয়াড়ি অনীল মুনাওয়ার। নাম ধরে ধরে বলে দিয়েছে আল জাজিরার সেই ইনভেস্টিগেশন ইউনিটের লিড ডেভিড হ্যারিসনকে। নাম এসেছে অস্ট্রেলিয়ার কয়েকজন ক্রিকেটারেররও। অবাক করার মতো বিষয় হচ্ছে, ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াও একই পথে হেঁটেছে। তারা বলেছে, ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আনা মানে তাদের নিচু করা!

মজার ব্যাপার হচ্ছে আইসিসিও এখানে সেইফ গেইম খেলেছে। অনীল মুনাওয়ারকে নিয়ে আল জাজিরার ছুঁড়ে দেওয়া প্রশ্নে নীরব থেকেছে আইসিসি! কেঁচো খুড়তে সাপ বেরোয় কিনা, এই ভয়ে নাকি কে জানে! নাকি সব দোষ, ফিক্সার-জুয়াড়ি ঘোষ? প্রশ্ন রইলো। তবে আল জাজিরাকে আইসিসি সান্ত্বনা পুরস্কার দিয়েছে এভাবে, ‘আমরা এই ডকুমেন্টারির এলিগেশনগুলো খুব সিরিয়াসলি নিচ্ছি, তদন্ত করে দেখব।’

ব্যস! খেলা খতম। কেবল চাক্ষুস প্রমাণ নেই বলে কত কত নামীদামি ক্রিকেটার দিব্যি এরকম অকর্ম করে পার পেয়ে যাচ্ছে। আকসু সেই ইস্যুতে কী করেছিল জানা নেই। ওদিকে ভারতের জুয়াড়ি রবিন মরিস, পাকিস্তানি হাসান রাজা, দুজন আবার সাবেক ক্রিকেটারও। প্ল্যান করছিলেন দুবাইতে চারটা টিম নিয়ে একটা টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট করার। সবকিছুই সেট আপ করা ছিল। বলছিলেন, ১৮ জন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের কথা, যারা সেই টুর্নামেন্টে খেলতে রাজি হয়েছেন। তার মানে সেই ১৮ জন কেবল খেলার নাম করেই ফিক্সিং করতেন! ভাবা যায়? কেবল ফিক্সিং করার জন্যেই একটা টুর্নামেন্ট! যদিও শেষ অবধি টুর্নামেন্টটা অনুমোদন পায়নি বা মাঠে গড়ায়নি।

গত বছর আল জাজিরার ডকুমেন্টারিগুলো দেখার পর ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটের ওপর বিশ্বাস একদম উঠে গেছে। কারণ আমরা যা দেখি, কিছু কিছু ক্ষেত্রে সব ন্যাচারাল বা সত্যিকার নাটকীয় না। স্ক্রিপ্ট লেখা থাকে আগে থেকে। কয়েকজন মিলে ক্রিকেটীয় প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে হার্টবিট বাড়িয়ে দেন আমাদের। আমরা লাফিয়ে উঠে তালি বাজাই। গলা ছেড়ে বলি, ক্রিকেট’ গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা। অথচ ডেভিডকে সেই মুনাওয়ার বলেছিলেন, ‘ইচ স্ক্রিপ্ট আই গিভ ইউ না! ইট উইল হ্যাপেন, হ্যাপেন অ্যান্ড হ্যাপেন।’

কেবল নিজের দেশের খেলাটাকেই আমি বিশ্বাস করি আমি সেদিনের পর থেকে।

লাইভ টেলিকাস্ট ও মাঠের খেলায় পার্থক্য থাকে কেবল সাত সেকেন্ড। মাঠে একটা বল ডেলিভারি হওয়ার সাত সেকেন্ড পর আমরা তা দেখতে পাই টিভিতে। এই সাত সেকেন্ডে কত ক্রিকেটার তার দেশকে বিক্রি করে দিচ্ছেন, কত জুয়াড়িদের পকেট ফুলেফেপে উঠছে ডলারে, পাউন্ডে। লোকাল টিভি ব্রডকাস্টার অপারেটর থেকে শুরু করে কমেন্ট্রি বক্সের ক্রু, সবাইকে কাজে লাগিয়ে চলে এই জুয়া, বাজি। কেউ মিনিটে ফকির, কেউ রাজা।

খেলার মাঠের এমন সব ইন্সটিংকটকে জুয়াড়িরা যা কাজে লাগায়, তা ভাবলেও অবাক লাগবে। ওভার ব্রেকে কোনো ব্যাটসম্যান পানি চাইবেন, গ্লাভস খুলবেন, সেটাই স্বাভাবিক। টেস্টে একটা পার্টিকুলার সেশনের শেষ কয়েক ওভার ব্যাটসম্যানরা রানই তুলতে চান না। কারণ আমরা সবাই জানি, সেশনের লাস্ট দিকে কেউই উইকেট দিতে চায় না। সেটাও স্বাভাবিক। মাঠে দেখা গেল, কোনো এক ওভারের মাঝখানে একটা কুকুর ঢুকে গেছে, আপাতদৃষ্টিতে আমাদের কাছে ব্যাপারটা এন্টারটেইনিং এবং যথারীতি স্বাভাবিক।

দেখা গেল আগের ওভারে ধুন্ধুমার ব্যাটিং করা কোনো ব্যাটসম্যান ওভার ব্রেকে ডান হাতের গ্লাভসটা আগে খুলে ফেলেছেন। পরের ওভারেই রান রেট স্লো, বা তিনি আউট। ওভার ব্রেকে গ্লাভস খুলে ফেলাটাই ছিল সিগনাল। ঠিক তখনই অনলাইন বেটিং সাইটগুলোতে বেড়ে যায়, পার্টিকুলার প্লেয়ারের উপর ধরা বাজির রেট।

সেশনের শেষদিকে উইকেট দিতে চান না বিধায় ব্যাটসম্যানরা ডিফেন্সিভ খেলেন। ওভারে দুই একটা সিংগেল-ডাবল আসে। ওভার ব্রেকে একটা সিগনাল যায়, একইভাবে বেড়ে যায় বেট মার্কেটে ওই বাজির রেট। কেউ পক্ষে-কেউ বিপক্ষে।

মাঠে কুকুরগুলো আসে কোত্থেকে? সিকিউরিটি কন্সার্ন থেকে রাখা ডগ স্কোয়াডের কুকুরগুলো দেখতে আলাদা। ওদের মধ্যে থেকে কোনোটাকে মাঠে ঢুকতে দেখিনি আমি। যা দেখেছি ঘরে পালা আদুরে কুকুর। মাঠে কুকুর ঢুকে, ফিক্সিং করতে সম্মতি দেয়া ক্রিকেটার রেডি হয়, বেট মার্কেট ওপেন।

এভাবেই চলছে ক্রিকেট। ক্রিকেট নট ইভেন আ গ্লোবাল গেইম ইয়েট। আমাদের এশিয়া, ওদিকে ওশেনিয়ার দুই দেশ, ব্রিটিশ প্রভিন্স, ক্যারিবিয়ান আর দক্ষিণ আফ্রিকা। বড় আকারে বলতে গেলে কেবল এশিয়াতেই আছে ক্রেজ, হাইপ। ওশেনিয়ার দুই দেশে তো ক্রিকেটের চেয়ে রাগবি বেশি জনপ্রিয়। তবুও ক্রিকেটের একেকটা গ্লোবাল ইভেন্টে কী পরিমাণ পাবলিক এটেনশন গ্র্যাব করে। একদিক থেকে চিন্তা করলে এই হাইপ, আনসার্টেইনিটি ক্রেজগুলো, আইওয়াশ হয়ে গেছে কিছু কিছু ক্ষেত্রে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।