সবাই করলে লীলাখেলা, সাকিব করলেই পাপ!

ভারতের খেলোয়াড়দের মধ্যে সবার আগে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করেছিলেন সাবেক অধিনায়ক কপিল দেব। ১৯৮০ সালে চন্ড্রিগড়ে হোটেল কপিল নামে রেস্টুরেন্ট চালু করেন তিনি। বর্তমানে সেই হোটেলটি ক্যাপ্টেইন’স রিট্রিট নামে পরিচিত।

২০০২ সালে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করেন শচীন টেন্ডুলকার। ভারতের খ্যাতিমান হোটেল ব্যবসায়ী সঞ্জয় নারাঙ্গের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে মুম্বাইয়ে এই ব্যবসা শুরু করেন লিটল মাস্টার। তার রেস্টুরেন্টের নাম, টেন্ডুলকার’স। একই সময়ে দিল্লিতে সেনসো নামে একটি রেস্টুরেন্ট চালু করেন ভারতের সাবেক অধিনায়ক অজয় জাদেজা। ২০০৪ সালে সৌরভ’স নামে রেস্টুরেন্ট চালু করেন ভারতের সাবেক অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলী। রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় নাম লিখিয়েছিলেন ভারতের মারদাঙ্গা ওপেনার বীরেন্দ্র শেবাগও।

মুম্বাইয়ে শেবাগ ফেবারিটস নামে রেস্টুরেন্ট চালু করেছিলেন তিনি। পুনেতে জেডকে’জেড (জহির খান’জ) নামে রেস্টুরেন্ট দিয়েছিলেন ফাস্ট বোলার জহির খান। রাজকোটে ২০১২ সালে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করেন জাদেজা। তার রেস্টুরেন্টের নাম জাদ্দু’স ফুড ফিল্ড।

ক্রিকেট মাঠের বন্ধুত্বকে ব্যক্তিগত জীবনে টেনে নিলেন জয়াবর্ধনে এবং সাঙ্গাকারা। দুই বন্ধু মিলে নিজ দেশে শুরু করেন রেস্টুরেন্ট ব্যবসা। তাদের সঙ্গে আছেন শ্রীলঙ্কার খ্যাতিমান শেফ দর্শন মুনিস। অন্যদিকে জ্যামাইকাতে ত্রিপল সেঞ্চুরি স্পোর্টস বার ৩৩৩ নামে একটি রেস্টুরেন্ট চালান দেশটির মারদাঙ্গা ওপেনার গ্রিস গেইল। হোটেল ব্যাবসায় বাংলাদেশে সবার আগে নাম লিখিয়েছেন মোহাম্মদ আশরাফুল। তার চাইনিজ রেস্টুরেন্টটার নাম সিচুয়ান গার্ডেন। এছাড়াও হোটেল ব্যবসায় জড়িত ইমরুল কায়েস আর তাসকিন আহমেদও।

এর বাদে ইমরুল কায়েস, সোহরাওয়ার্দী শুভ, নাফিস ইকবাল, এমনকি ফুটবলার ওয়াহেদ আহমেদও হোটেল ব্যবসায় জড়িত। তবে এতো কিছুতেও কারো কোনো সমস্যা নেই। সবার একটাই মাত্র সমস্যা। সেটা হলো, সাকিব কেন হোটেল ব্যবসায়ী!

পৃথিবীতে পরিবর্তীত হ্যাপি আর শাবানা বাদে আমার জানামতে কোনো নায়িকা পর্দা করে না। আমরা তাদের দেখি, ক্রাশ খাই, আমাদের কোনো সমস্যা নাই। এসবের কিছুতেই আমাদের কোনো সমস্যা হয়না। আমাদের সমস্যা শুধুমাত্র একটাই -‘সাকেব তুমার বউ কেন পর্দা করেনা’! বাদ পড়েন না মাহমুদুল্লাহর, মুশফিক, তামিম, এমনকি মাশরাফির স্ত্রীও!

ক্রিকেট ভদ্রলোকের খেলা হলেও মাঠে এবং মাঠের বাইরে অভদ্র খেলোয়াড়ের নজির ইতিহাস অনেকবার দেখেছে। শোয়েব আখতার, সৌরভ গাঙ্গুলী, হরভজন সিং, জেসি রাইডার থেকে শুরু করে হালের বাটলার, স্ট্রোকস বা বিরাট কোহলী। কেউ মাঠে মারামারি করেছেন, কেউ মারামারি করেছেন মাঠের বাইরে বা মদ খেয়ে নাইট ক্লাবে। কেউ আম্পায়ারের সাথে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেছেন, আবার কেউবা করেছেন জনসম্মুখে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি।

সুনীল গাভাস্কার, অর্জুনা রানাতুঙ্গার মতো অনেকে আবার মাঠ ছেড়ে বের হয়ে গেছেন বা বের হওয়ার হুমকি দিয়েছেন। আছে বল টেম্পারিং, বা একস্ট্রাক্ট দ্যা ফিল্ড আউটের ইতিহাসও। কিন্তু মানুষের কোথাও কাউকে নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। সবার একটাই মাত্র সমস্যা, সাকিব কেন বেআদবি করবে!

যেহেতু এখনই ইনজুরিতে পড়লে বা দীর্ঘমেয়াদি অফ ফর্মের শিকার হলে কয়েকদিন পর কেউ আপনাকে চিনতেও পারবে না, সেহেতু সব ধরণের ক্রীড়াবিদদের জন্যই ‘দিন’ থাকতে থাকতে টাকা পয়সা আয় করে নেয়া ইম্পর্টেন্ট। প্রতিটা খেলোয়াড় টাকার জন্যই প্রফেশনাল ক্রিকেট খেলে।

বিরাট কোহলি কিংবা মহেন্দ্র সিং ধোনিরা আয়ের দিক দিয়ে দেশের বড় বড় ব্যাবসায়িকে ছাড়িয়ে গেলেও কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা নেই আইপিএল বা বিগ ব্যাশ টাইপের লিগে আক্ষরিক অর্থে টাকার জন্য খেলতে গিয়েও দেশের অনেক প্লেয়ারেরই এক ম্যাচের বেশি সুযোগ না পাওয়াতেও। সবার একটাই সমস্যা, সেটা হলো সাকিব কেন টাকার জন্য খেলে!

বউ নিয়ে আহ্লাদী করা ক্রিকেটারের সংখ্যাও কম না। সেঞ্চুরি করার পর বউ বা প্রেমিকাকে সাফল্য উৎসর্গ করতে দেখা গেছে অনেককেই। সেটা আমাদের মাহমুদুল্লাহ, মুশফিক বা ভারতের রোহিত শর্মাই হোক না কেন। শচীন টেন্ডুলকার বিভিন্ন স্পিচে অঞ্জলীর কথা বলে তাকে থ্যাংকস জানালেও আমাদের সমস্যা নেই। বিরাট কোহলি ম্যাচ দুই তিনবার হানিমুন করে বেড়ালেও আমরা কিছু মনে করিনা।

আমাদের একটাই সমস্যা। সেটা হলো, সাকিব কেন বউ পাগলা!

একজন ক্রিকেটারকে পছন্দ বা অপছন্দ করার নানাবিধ কারণ থাকে। তবে সবগুলো কারণই হতে হয় ক্রিকেটীয়। তার শর্ট সিলেকশন ভাল্লাগে, বা ডেলিভারী পছন্দ হয়না। তার ফুটওয়ার্ক জোস, বা বডি ল্যাঙ্গুয়েজে সমস্যা। কিন্তু সাকিবের ক্ষেত্রেই শুধুমাত্র জিনিসটা খাটেনা। তাকে অপছন্দ করা হয় কারণ সে হোটেল ব্যবসায়ী, সে টাকার জন্য খেলে, সে বেআদব, সে বউ পাগলা ইত্যাদি ইত্যাদি। তাকে প্রশংসা করতে গেলেও সরাসরি করা হয়না। স্যাটায়ার করে করা হয়। বলতে হয়, আমি এই বউ পাগল বেআদব ছেলেটাকেই ভালোবাসি।

আর দেশভরা যত সাকিব হেটার তারমধ্যে সাকিবের নিজের জেলা আমাদের মাগুরার জনগন সবচাইতে বেশি। আপনি মাগুরা না আসলে কল্পনাও করতে পারবেন না কি অদ্ভুত অদ্ভুত কারণে সাকিবকে ঘৃণা করা হয়। আমার এক ফ্রেন্ড সাকিবকে দেখতে পারেনা কারণ গত ঈদে ঈদের নামাজ শেষ করে সাকিব তার সাথে কোলাকুলি করেনি এজন্য। সে বলে বেড়ায় সাকিব যে ভাবিষ্ট এতেই তার বোঝা হয়ে গেছে। হাইরে! একে কে বোঝাবে যে সাকিব যদি সবার সাথে কোলাকুলি শুরু করতো তবে অন্তত বিকাল চারটা বাজত তার বাসায় ফিরতে। যার সামান্য জ্বর হলে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত দেখতে চলে আসে, যে রাস্তায় বের হলে বিশাল জ্যাম সৃষ্টি হয়, তাকে আর সবার সাথে এক করলে তো হবেনা।

আরেকদিন আমরা কলেজ থেকে ট্যুরে নাটোর রাজবাড়ি যাচ্ছি। তো নাটরের আগে খুব সম্ভবত বগুড়াতে বিশাল বড় একটা স্টেডিয়াম রাস্তার পাশে। সেটা দেখে আমার পেছনের সিটের দুই ছেলের কথোপকথন –

– দেখ কত বড় স্টেডিয়াম।

– হ, আর আমাদের সাকিব মাগুরাতে কিচ্ছু করেনা। হালা আছে নিজের পকেট ভরার ধান্ধায়।

আমি একথা শুনে পেছনে ফিরে শুধু বললাম, ‘আচ্ছা ভাই কোন দেশের কোন কোন ক্রিকেটার নিজের এলাকায় স্টেডিয়াম করে দিয়েছে? শচিন, কোহলী, পন্টিং, মাশরাফি, কয়টা করে স্টেডিয়াম করেছে?’

তারা কিছু বললো না। তবে এমন লুক দিলো যার অর্থ, আর কেউ করুক বা না করুক, তাতে কোনো সমস্যা নাই। সমস্যা হলো সাকিব কে স্টেডিয়াম করবে না!

তবে এই মাগুরাবাসিদের বড় একটা অংশের একটা ‘কিউট’ বৈশিষ্ট্য আছে। তারা ঢাকা বা অন্য কোথাও গেলে প্রথমে সবার সামনে সাকিবকে দাম দিতে চায় না। তারপর যখন দেখে লোকজন তার জেলাকে সাকিবের জন্যই চিনতেছে তখন একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে, আরেহ সাকিবের বাসা তো আমার বাড়ির পাশেই। দুই বাসা পর। এইটা এক দুইজন না, মাগুরার মোট নয়লাখ জনসংখ্যার সবাই এই সেম কথাটাই বলে।

সাকিব তোমার অনেক বড় দূর্ভাগ্য যে তুমি এই দেশে জন্ম নিয়েছিলে। সাকিব আমাদের বিশাল সৌভাগ্য যে তুমি এই দেশে জন্ম নিয়েছিলে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।