জয়দের মতো ভাঁড়দেরই জয়জয়কার হবে!

শাহরিয়ার নাজিম জয় নামক এক ‘উদ্ভট চিজ’ দিনের পর দিন টেলিভিশনে উপস্থাপনার নামে অথিতিদের হ্যারাস করে যাচ্ছে। সস্তা হিউমারের দোহাই দিয়ে জয়ের করা প্রশ্ন অধিকাংশই প্রচন্ড কুরুচিপূর্ণ, অপমানকর।

সম্প্রতি হুমায়ুন আহমেদের জন্মদিন উপলক্ষ্যে জয় মেহের আফরোজ শাওনকে একটি টকশোতে আমন্ত্রণ জানিয়ে তার স্বভাব অনুযায়ী চরম আপত্তিজনক একান্ত ব্যাক্তিগত কিছু প্রশ্ন করে। জয়ের প্রশ্নগুলো ছিল এমন –

আমেরিকাতে চলে গেছেন, গ্রিন কার্ড নেয়ার চেষ্টা করছেন, বাচ্চা দুটোকে নিয়ে গেছেন, হুমায়ুনের প্রতি এতো ভালোবাসা যদি থাকত তবে নুহাশপল্লী ছেড়ে আমেরিকায় চলে গেলেন কেন? আসল তথ্য হল – শাওন আমেরিকায় গিয়েছিল সিনেমা নির্মানের উপর একটি ছয়মাসের কোর্সে, পড়াশোনা শেষে সে দেশে আবার ফিরে এসেছে।

একটি মেয়ে একাকী জীবন চলার পথে অধিক পড়াশোনা করে নিজেকে আরও যোগ্য করে তুলছে, নিজের সপ্ন পুরনে এগিয়ে যাচ্ছে। জয় সেটা মানতে নারাজ।

জয়ের যুক্তি, হুমায়ূনের স্ত্রী হিসেবে ভালোবাসা প্রদর্শনের জন্য শাওনকে নুহাশ পল্লীর বাইরে যাওয়া যাবে না। স্বামীর কবর ধরে কান্নাকাটি না করলে স্বামীকে ভালোবাসা হয় না!

এখানে জানিয়ে রাখা প্রয়োজন, জয় সেই মানুষ, যে কিনা ২০১৪ সালে পুর্বাচলে এক কাঠা জমির জন্য প্রধানমন্ত্রীকে মা ডেকে আবেগঘন চিঠি দিয়েছিল। জয় বলেছিল, আমার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য পুর্বাচলে এক কাঠা জমি প্রয়োজন।

সেই জয় এখন হুমায়ূনের সন্তানরা তার মায়ের সাথে কেন আমেরিকায় গেছে সেটা নিয়ে জাতীয় মিডিয়ায় ইঙ্গিতপুর্ন প্রশ্ন করে হুমায়ূনের প্রতি তাদের ভালোবাসার জবাবদিহিতা চায়!

সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য শাওন যদি চিন্তা করে আমেরিকায় সেটেলড হবে, সেখানেও কারো কিছু বলার বা প্রশ্ন তোলার কিছু নেই। জয়ের এমন প্রশ্ন ব্যাক্তি শাওন ও হুমায়ুন পরিবারের প্রতি অপমানকর।

আমেরিকার কোর্সে আপনি কি শিখলেন? – প্রশ্ন শুনে হাসব নাকি রাগব কিছুক্ষন বুঝতে পারছিলাম না। ফিল্ম মেকিং এর উপর একটি ছয় মাসের আমেরিকান কোর্সে শাওন কি কি শিখছে জয়কে সেটা তিনশ সেকেন্ডে বলতে হবে!

তিনশ সেকেন্ডে যদি ছয়মাসের আমেরিকান টপ মোস্ট কোর্সে বিবরণ দেয়া যেত তাহলে মানুষ এতো কষ্ট করে লাখ লাখ টাকা খরচ করে আমেরিকায় কেন যাবে? তাহএল তো দেশে কোন বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল কলেজ দরকার নাই। সকল ভার্সিটির প্রফেসররা জয়ের কাছে তিনশ সেকেন্ড লেকচার দিয়ে গেলেই হয়ে যায়। দেশবাসী জয়ের কাছ থেকে কয়েক সেকেন্ডে শুনে শুনে সব শিখে যাবে

আপনি কি মনে করেন, হুমায়ুন আহমেদের গল্প ছাড়া আপনি যা শিখে এসেছেন তা দিয়ে আপনি একজন সফল নির্মাতা হতে পারবেন?

– প্রশ্নটি একজন ক্রিয়েটিভ পারসনের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর। শাওন সিনেমা নির্মাতা, সে গল্পকার নয়। একটি সিনেমা নির্মাতার উপর অনেকটা নির্ভর করে। নির্মাতাকে সিনেলার ক্যাপ্টেন বলে ডাকা হয়। তাই কেবল ভালো গল্প,চিত্রনাট্য পেলেই সিনেমা হিট খায় না, ভালো পরিচালক লাগে, ভাগ্য লাগে।

সত্যজিৎ রায়ের প্রথম চলচ্চিত্র ‘পথের পাঁচালী’ বিভূতিভূষণের লেখা। তিনি বিভূতিভূষণর উপন্যাসকেই সিনেমার পর্দায় নিজের যোগ্যতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। এখানে ক্রেডিট লেখকের যেমন , ঠিক তেমনি পরিচালকের।

যদিও জয়ের মতো লো গ্রেডের অভিনেতারা এমন ক্রিয়েটিভ কিছু বুঝবে না।

অনেকের হয়তো মনে আছে, বনানী অগ্নিকান্ডে এই জয়ই নাইম নামের এক শিশুকে দুই হাজার টাকার বিনিময়ে মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য শিখিয়ে তা প্রচার করে সেই সময় প্রচুত সমালোচনার মধ্যে পড়েছিল।

হুমায়ুন আহমেদকে মিস করেন? – শাওনের উত্তর এখানে ভালো লেগেছে, সে বলেছে এ প্রশ্নের উত্তর আমি ক্যামেরার সামনে দিতে চাচ্ছি না। মিস করা এমন একটি ব্যাপার যেটা টেলিভিশন সেটে দর্শকদের সামনে দিতে হবে বলে আমি মনে করি না। মিস করা মানুষের একান্ত আপন অনুভুতি।

সাব্বাস শাওন।

সন্তানরা হুমায়ুন স্যারের সন্তান হিসেবে বড় হচ্ছে… – শাওন দ্রুত জয়কে থামিয়ে বলে, আপনার প্রশ্নে ভুল আছে, তারা হুমায়ুন কেবল নয়, হুমায়ুন এবং আমার, আমাদের সন্তান।

জয়ের মুখে এইটা ছিল একটা ঠাস করে চড়। জয় পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে। জয়ের মতো মানুষরা মেয়েদের স্বীকৃতি দিতে চায় না। বাবা মায়ের সন্তানকে তারা কেবল পরিচয় করিয়ে দেয় বাবার সন্তান হিসেবে, আবার সন্তান খারাপ কিছু বললে দোষ দেয়, মায়ের। তারা মেয়েদের স্বামীর কবরে বন্দী করে রাখতে চায়, উচ্চ শিক্ষায় কোন মেয়ে বিদেশে পড়াশুনা করতে গেলে, তাকে মিডিয়ায় অপবাদ দেয়, স্বামীর কবর ছেড়ে বিদেশে গেছে, স্বামীর প্রতি ভালোবাসা নেই।

আপনাকে কি প্রশ্ন করা যেতে পারে আমাকে বলবেন? – শাওনকে যখন এক পাক্ষিক অপমান করেও তেমন সুবিধা করতে পারছিল না জয় তখন এই প্রশ্ন করে।

একজন উপস্থাপক মাত্র পাঁচ মিনিট তার অথিতিকে প্রশ্ন করবার যোগ্যতা রাখে না, সেই অযোগ্য একজন নাকি এই সময়ে দেশের কথিত সেরা উপস্থাপক! হায়রে!

হুমায়ুন আহমেদের সম্পদ কি ভাগাভাগি হয়েছে? – জয় যখন কোন মতেই পারছিল না তখন সে শাওনকে সরাসরি ব্যাক্তিগত আক্রমণ করে জানতে চায়, সম্পদ ভাগাভাগি হয়েছে?

দেশ বিদেশের প্রচুর টক শো আমি দেখেছি, কিন্তু এমন নিম্নমানের প্রশ্ন আমি কোনদিন কাউকে করতে শুনি নাই।

কেবল শাওন নয়, এর আগে শাবনূরকে সে প্রশ্ন করেছিল, শাবনুরের সন্তানের চেহারা কেন রিয়াজের মতো! ন্যাশনাল টিভিতে মাহিয়া মাহিকে বলে, বিয়ের পরও মাহি নাকি আবদুল আজিজের সাথে লিভ টুগেদার করে!

কোন নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই, নেই নূন্যতম কমনসেন্স। মুখরোচক বাজার কাটতি প্রশ্ন নিজের খেয়াল খুশি মতো বানিয়ে উপস্থাপকের চেয়ারের পাওয়ারে বসে অপরকে অপমান করে জয় ভাবে খুব একটা সেন্স অফ হিউমার হয়ে গেল!

এমনসব অশালীন প্রশ্নের কারনে জয়কে তৎক্ষণাৎ টিভি মিডিয়ায় অবাঞ্ছিত ঘোষণার কথা

অথচ জয় এখনও বহাল তবিয়তে টিভি মিডিয়া দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। এর কারন হতে পারে তিনটি –

  • জয় অতীব ক্ষমতাশালী কেউ (মনে হয় না, ক্ষমতাশালী হইলে পুর্বাচলে এক কাঠা জমির জন্য এমন ছ্যাচড়ামি করত না।
  • আমাদের টিভি মিডিয়া চ্যানেলের পরিচালনা পর্ষদে শিক্ষিত, রুচিবোধসম্পন্ন কেউ অবশিষ্ট নেই। নুন্যতম ভদ্র মার্জিত কেউ থাকলে দিনের পর দিন জয়কে উপস্থাপনার নামে এমন কুরুচিশীল প্রশ্ন, প্রশ্নের নামে ফাত্রামি সহ্য করা হতো না।
  •  আমাদের দর্শকরাই হয়তো দায়ী। দর্শক হিসেবে আমরা আজও শিক্ষিত মানবিক বোধসম্পন্ন রুচিশীল হয়ে উঠতে পারেনি।

বাজারে চাহিদাই যদি হয় নিম্নমানের তবে সেখানে তো জয়দের মতো ভাঁড়দেরই জয়জয়কার হবে!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।