যে ছিল হৃদয়ের আঙিনায়

দিন ১৫ আগেও তিনি গুলশান ক্লাবে গেয়েছেন। তবে, আজ তিনি অতীত। হৃদয়ের আঙিনা, দৃষ্টির সীমানা থেকে শাহনাজ রহমতুল্লাহ হারিয়ে গেছেন কোনো এক দূর অজানায়।

শাহনাজ রহমতুল্লাহ কত বড় শিল্পী ছিলেন? – এই প্রশ্নের জবাব দিতে গেলে আসলে একটা তথ্যই যথেষ্ট। গুণী এই শিল্পীর গাওয়া ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’, ‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়ে’, ‘একতারা তুই দেশের কথা বলরে‌ এবার বল’ – গানগুলো বিবিসি জরিপে সর্বকালের সেরা বিশটি বাংলা গানের তালিকায় স্থান পায়। বোঝাই যাচ্ছে, বাংলা গানে তাঁর স্থান আসলে কিংবদন্তিদের চেয়েও ওপরে।

তাঁর জন্ম ১৯৫২ সালের দুই জানুয়ারি। পাকিস্তানের গজল সম্রাট নামে খ্যাত মেহেদী হাসানের কাছ থেকে তালিম নেন তিনি। রেডিও-তে যখন গান গাওয়া শুরু করেন বয়স মাত্র ১১। পাকিস্তান আমলের সেই সময়ে রেডিওতে তাঁকে ডাকা হত শাহনাজ বেগম নামে।

একই বছর, মানে ১৯৬৩ সালেই চলচ্চিত্রেও গান গাওয়া শুরু করেন। শুরুটা হয় ‘নতুন সুর’ নামের একটি ছবি দিয়ে। ১৯৬৪ সালে প্রথমবারের মত ছোট পর্দায় প্রথম গান করেন। সেই হিসেবে সঙ্গীত শিল্পী হিসাবে তাঁর পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হয় ২০১৩-১৪ সালের দিকে।

বহু বছর আগে তিনি ‘সাক্ষী’ সিনেমাতে সর্বশেষ গানটি গান । আওকাত হোসেন পরিচালিত এই ছবিতে তাঁর গাওয়া গানটি ছিল ‘পারি না ভুলে যেতে’। এ গানের সুরকার ছিলেন স্বনামধন্য সুরকার আলাউদ্দিন আলী। ‘ইয়ে ভি এক কাহানি’, ‘সংগম’, ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’, ‘আবার বনবাসে রূপবান’, ‘গুনাই’, ‘মধুমালা’, ‘বেহুলা’, ‘সাইফুল-মুলক-বদিউজ্জামান’, ‘সোয়ে নদী জাগে পানি’, ‘নয়নতারা’, ‘আনোয়ারা’, ‘বাঁশরি’, ‘রাখালবন্ধু’, ‘আপন দুলাল’, ‘এতটুকু আশা’, ‘সাতভাই চম্পা’, ‘পরশমণি’, ‘বেদের মেয়ে’, ‘চোরাবালি’ – ইত্যাদি ছবিতে গান গেয়ে তিনি প্লে-ব্যাকেও নিজেকে স্মরণীয় করে রেখেছেন।

শাহনাজ রহমতুল্লাহ’র ব্যাপারে একটি তথ্য বেশ চাঞ্চল্যকর। তার এক ভাই ছিলেন চিত্রনায়ক জাফর ইকবাল। তিনি একাধারে গানবাজনার সাথেও জড়িত ছিলেন। শাহনাজের বড় ভাই হলেন সুরকার আনোয়ার পারভেজ ছিলেন। গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ারের বন্ধু ছিলেন এই আনোয়ার পারভেজ।

জাফর ইকবাল (ডানে) ও শাহনাজ রহমতুল্লাহ

শাহনাজ রহমতুল্লাহ মূলত আধুনিক গানের শিল্পী। আধুনিক গানের মধ্যে দেশাত্ববোধক গানের আলাদা একটা ঘরানার জন্ম দিয়েছিলেন তিনি। দেশাত্মবোধক গান সংগীত পিপাসুদের মনে সব সময়ই আলোড়ন তোলে। কথা, সুর ও কণ্ঠে শাহনাজের প্রতিটি গানই অনবদ্য।

তবে ক্লাসিক, সেমি-ক্লাসিক, গজলে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। নজরুলগীতিও গাইতে পারতেন চমৎকারভাবে। শাহনাজের বিচরণ যত জায়গাতেই থাক একথা স্বীকার করতেই হবে যে, আধুনিক গানে তিনি তুলনাহীন। তিনি যেভাবেগান গেয়েছেন, যে গানগুলো গেয়েছেন গুণগত বিচারে তার ধারে কাছে অন্য কাউকে বসানো সম্ভব নয়।

শাহনাজ রহমতুল্লাহর গাওয়া গানগুলোর মধ্যে ‘সাগরের তীর থেকে’, ‘পুরোনো আমাকে খুঁজে’, ‘যদি চোখের দৃষ্টি দিয়ে’, ‘আমায় কেন মুক্ত হতে’, আর নেমো না’, আমি তো আমার গল্প শুনেছি’, তোমার আগুনে পোড়া’, ‘যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়’, ‘সাগরের সৈকতে’ – ইত্যাদি আধুনিক গানগুলো জনপ্রিয়তা পায়।

রেডিওতে তাঁর গাওয়া প্রথম গানটি ছিল ‘যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়’। খান আতাউর রহমানের লেখা ও সুরে  এই গানটি যে বাংলা ভাষার অন্যতম সেরা আধুনিক গান সেটা বলতে কোনো দ্বিধা নেই। শাহনাজ রহমতউল্লাহ সিনেমাতেও বেশ কিছু গান গেয়েছেন।

এক ফ্রেমে তিন ভাইবোন

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।