শাহনাজরা জিতলে জিতে যায় বাংলাদেশ

গতকাল বিকেলে শাহনাজ আপার বাইক হারানোর পর প্রথম ফোন কল তিনি আমাকে করেছিলেন, কারণ এই শহরে তাঁর পরিচিত কেউ ছিল না যাকে তিনি আর এক মুহূর্তের জন্য বিশ্বাস করতে পারেন, ‘ও সিফাত ভাইয়া, আমার বাইকটা নিয়া গেছে, ও ভাইয়া আমার বাইকটা নিয়া গেছে, আমি কি করবো ভাইয়া, ভাইয়া, আমার বাইকটা ফিরিয়া দেন, এই বাইক ছাড়া আমার আর কিচ্ছু নাই।’

আমার শুরুতেই মনে হয়েছিল পুলিশ প্রশাসন চাইলে শাহনাজ আপার বাইক উদ্ধার করে দিতে পারবে কিন্তু তাদেরকে বলার মতো করে বলতে হবে। কিন্তু সেই চাপ কে দিবে? দিবে সাংবাদিক ভাই বোনেরা। আমি শাহনাজ আপাকে দ্রুত থানায় যোগাযোগ করার সাথে সাথে সাংবাদিকদের মোবাইলে যোগাযোগ করতে বললাম।

বাকিটুকু ইতিহাস। খবর ছড়াতে শুরু হল।

রাতে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি খেয়েছেন? তিনি বললেন, ‘বাইক না পাওয়া পর্যন্ত আমি খাব না ভাইয়া।’

গতকাল রাতে, আমার কাছে কমপক্ষে শাহনাজ আপাকে নতুন বাইক কিনে দিতে দেশ বিদেশ থেকে সাত আট জন মানুষ যোগাযোগ করেছে, এমনকি তারা তাঁর আগের বাইকের ঋণও শোধ করে দিতে চেয়েছিল। একজন বলছিল সে তাঁর পরিচয় গোপন রেখে শাহনাজ আপার সব টাকা শোধ করে দিবে।

আমি যখন আপাকে বললাম, নতুন বাইকের কথা, তিনি আমাকে বললেন, ‘ভাইয়া, আমি নতুন বাইক চাই না, আমাকে আমার পুরনো বাইক দিন। আমি তো কারও সাহায্য চাইনি না, আমি খেটে খাব। আমাকে আমার বাইক ফিরিয়ে দিন, আমাকে একটা ভালো কাজের সুযোগ দিন। আমার মেয়েদের সুখই আমার সুখ।’

শাহনাজ আপার পায়ের দিকে যদি তাকান, দেখবেন তিনি কিন্তু কেডস পরেন না, সাধারণ বাইক যারা চালায় তারা কেডস পরে। জিজ্ঞেস করেছিলাম কেন? তিনি বলেছিলেন, ‘একটা কেডসের দাম তিন থেকে চারশ টাকা। ওই টাকায় আমার মেয়েদের আমি ভালো কিছু খাওয়াতে পারবো।’

সকালে তিনি খেয়ে বের হন না, যত টাকা পারেন জমা করেন। একজন সংগ্রামী শাহনাজ হেরে যেতে পারে না।

শাহনাজ আপা, একবারের জন্য হাল ছেড়ে দেয়নি, লোভ করেননি। নতুন বাইকের আশা করেনি। তিনি বিশ্বাস করতো, তিনি তাঁর পুরনো বাইক ফেরত পেয়ে নিজের চেষ্টায় উপার্জন করতে পারবেন।

আমি একজন সদা হাসোজ্জল এক সাহসী তেজি শাহনাজ আপাকে চিনি যে কিনা একক প্রচেষ্টায় ট্যাড়াচোখে তাকানো এই সমাজের চোখের সামনে লড়াই করে বেঁচে আছে।

শাহনাজ আপা, আপনি জয়ী। আপনার সাথে আজ আরেকবার বাংলাদেশের শক্তি জয়ী হল। কারণ শাহনাজরা জিতলেই জিতে যায় বাংলাদেশ।

শ্রদ্ধা শাহনাজ আপা, আপনি সাহসী!

লেখক: কথা সাহিত্যিক

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।