শহীদ কাপুর নামের লম্বা রেসের ঘোড়া

১৯৮১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। অভিনেতা পঙ্কজ কপুর ও অভিনেত্রী-নৃত্যশিল্পী নীলিমা আজিমের সংসারে একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। পরবর্তীতে সেই পুত্র সন্তান বলিউড আকাশের একটি জ্বলজ্বলে তারকা হিসেবে নিজেকে প্রমান করেন তার অভিনয় দক্ষিতা, নৃত্য পারদর্শীতা এবং নায়কোচিত লুক এবং মিস্টি হাসি দিয়ে।

ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে তার অভিনয় দক্ষতা নিয়ে দর্শক এবং সমালোচকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ছিল। আস্তে আস্তে নিজের চেষ্টা, একাগ্রতা এবং অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা তাকে বলিউডের এই সময়ের অন্যতম দক্ষ এবং শক্তিশালী অভিনেতায় পরিণত করেছে। বলা হচ্ছে বলিউডের লম্বা রেসের ঘোড়া খ্যাত শহীদ কাপুরের কথা।

শহীদের যখন তিন বছর বয়স, তখন তাঁর বাবা-মায়ের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। ১০ বছর বয়সে দিল্লী থেকে মায়ের সাথে স্বপ্ন নগরী মুম্বাইয়ে পাড়ি জমান তিনি। শহীদ কাপুর অল্প বয়স থেকেই নাচের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। তার মা অভিনেত্রী হিসেবে কাজ করলেও নৃত্যশিল্পী হিসেবেও জনপ্রিয় ছিলেন। মায়ের মাধ্যমেই তার নাচের প্রতি আগ্রহ জন্মায়। ১৫ বছর বয়সে তিনি বলিউডের অন্যতম সেরা জনপ্রিয় কোরিওগ্রাফার শ্যামক দাভারের ড্যান্স ইনস্টিটিউটে যোগ দেন।

এই ড্যান্স ইন্সটিটিউটের একজন ছাত্র হিসেবে তিনি ১৯৯৭ সালে ‘দিল তো পাগল হ্যায়’ এবং ১৯৯৯ সালে ‘তাল’ সিনেমার মতো সুপার ডুপার হিট সিনেমায় ব্যাকগ্রাউন্ড নৃত্যশিল্পী হিসেবে কাজ করেন। এবং ‘তাল’ সিনেমায় কয়েক সেকেন্ডের জন্য ঐশ্বরিয়া রায়ের সাথে একটি গানে দেখা যায় তাকে। ভাগ্যদেবী হয়তো সেদিনই তার দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছিলেন।

এই গানের দৃশ্যে দেখেই তাকে পরবর্তীতে মিউজিক ভিডিওতে কাজ করার অফার দেন তৎকালীন জনপ্রিয় মিউজিক ভিডিও নির্মাতা কেইন ঘোষ। শাহরুখ, কাজল, রানীর সাথে পেপসির বিজ্ঞাপন তাকে নবাগত এক ক্রেজ হিসেবে লাইমলাইটে নিয়ে আসে। তারপর কিট-ক্যাট এবং ক্লোজ-আপের মতো ইন্টারন্যাশনাল ব্রান্ডের বিজ্ঞাপন তাকে জনপ্রিয়তা এবং খ্যাতি এনে দেয়। চকোলেট বয় হিসেবে তকমাও পেয়ে যান তিনি।

২০০৩ সালে ‘ইশক-ভিশক’ নামে একটি রোম্যান্টিক কমেডি সিনেমায় শহীদ প্রথমবার নায়ক হিসেবে বলিউডে পা রাখেন। অল্প বাজেটের সেই সিনেমাটি ত্রিভুজ প্রেমের রোমান্টিক গল্প, অসাধারন কিছু গান এবং তিন নতুন অভিনেতা-অভিনেত্রী নিয়ে সুপারহিট ব্যবসা করেছিল। এই সিনেমাতে অভিনয় করে তিনি সেরা নবাগত অভিনেতা হিসেবে জিতে নেন ফিল্মফেয়ার পুরস্কার।

অবশ্য এরপরে তাঁর অভিনীত কয়েকটি চলচ্চিত্র বাণিজ্যিক সফলতা অর্জনে ব্যর্থ হয়। সম্ভাবনাময় অভিনেতা হিসেবে তাকে মনে করা হলেও বানিজ্যিক ভাবে সফল সিনেমা উপহার দিতে না পারায় এক সময় মনে করা হচ্ছিল তিনি মনে হারিয়েই যাবেন বলিউড থেকে। মাঝে কারিনা কাপুরের সাথে প্রেম তাকে কিছুটা আলোচনায় রাখলেও সেটি বলিউডের কঠিন জগতে যথেষ্ট ছিলনা নায়ক/অভিনেতা হিসেবে টিকে থাকার জন্য।

অবশেষে তার প্রথম সিনেমার নায়িকা অমৃতা রাওয়ের সাথে জুটি বেধে আবারো অভিনয় করেন বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় এবং দক্ষ পরিচালক সুরজ বারজাতিয়ার পারিবারিক রোমান্টিক ড্রামা ‘বিবাহ’ সিনেমাতে। প্রেম চরিত্রে তার অভিনয়, লুক, এবং শহীদ-অমৃতা জুটির কেমেস্ট্রি বক্স অফিস থেকে শুরু করে দর্শক তথা সমালোচকদের মন জয় করে। সুপারহিট এই সিনেমার মধ্য দিয়ে এক নতুন শহীদ কাপুরের পথচলা শুরু হয়। তবে আক্ষরিক অর্থে তারকা খ্যাতি পান ইমতিয়াজ আলীর পরিচালনায় কারিনা কাপুরের সাথে ‘জাব উই মেট’ সিনেমার মধ্য দিয়ে। এই সিনেমা মুক্তির অল্প কয়দিন আগেই কারিনার সাথে ব্রেক-আপ হয় তার। তবে এই সিনেমাই তাকে বক্স অফিসে তারকা খ্যাতি এনে দেয়।

মাঝে ‘কিসমত কানেকশন’, ‘বদমাশ কোম্পানি’ বক্স অফিসে অ্যাভারেজ ব্যবসা করলেও পরবর্তীতে আরেক দক্ষ এবং ভিন্নধর্মী সিনেমার পরিচালক বিশাল ভরদ্বাজের ‘কামিনে’ সিনেমায় যমজ ভাইয়ের দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় তাকে সেই সময়ের দক্ষ এবং প্রতিশ্রুতিশীল অভিনেতা হিসেবে বলিউডে জায়গা করে দেন। কিছুদিন বিরতি দিয়ে প্রভু দেবার ‘আর রাজকুমার’ তাঁকে বানিজ্যিক সফলতা এনে দেয় এবং অ্যাকশন নায়ক হিসেবে তার নতুন লুক সবার প্রশংসা কুড়ায়।

২০১৪ সালে বিশাল ভরদ্বাজের ‘হায়দার’ তাঁকে সফলতার শিখরে নিয়ে যায়। শেক্সপীয়ারের ‘হ্যামলেট’ অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমা প্রমান করে সুযোগ পেলে শহীদ কাপুর যেকোন চরিত্রে নিজেকে তুলে ধরতে পারেন। এই সিনেমা তাকে সেরা অভিনেতা হিসেবে সেই বছর সেরা অভিনেতা হিসেবে ফিল্মফেয়ার, আইফা, জি-সিনে সহ সকল পুরস্কার এনে দেয়।

ততদিনে চিরচেনা রোমান্টিক নায়কের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন এই অভিনেতা। ‘হায়দার’ এর পরে আরেক ধামাকা ‘উড়তা পাঞ্জাব’ এই সিনেমায় আলিয়া ভাট, কারিনা কাপুরের সাথে তার অভিনয় থেকে চোখ ফেরাতে পারেননি কেউ। সাফল্যের নতুন পালক উড়তা পাঞ্জাব তাকে এগিয়ে নিয়ে যায় আরো অনেকটা পথ। এর পরে সাইফ আলী খান এবং কংগনা রানাউতের সাথে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেন ২য় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত ‘রেঙ্গুন’ সিনেমায়।

সমালোচকদের কাছ থেকে প্রশংসা মিললেও বক্স অফিসে সফলতা পায়নি  ‘রেঙ্গুন’। তারপর ২০১৮ তে সঞ্জয়লীলা বানসালীর এপিক ‘পদ্মাবত’ সিনেমায় রাজা রাওয়াল রতন সিং-এর চরিত্রে আবারো নিজের অভিনয় প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। রানী পদ্মাবতী’র চরিত্রে দীপিকা এবং আলাউদ্দিন খিলজি’র চরিত্রে রনবীর সিংয়ের সাথে চুটিয়ে অভিনয় করে গেছেন তিনি।

শহীদ কাপুরের সু-অভিনীত চলচ্চিত্রের তালিকায় সংযোজন হতে চলেছে আরও একটি সিনেমা। সম্প্রতি রিলিজ করা হয়েছে তার নতুন সিনেমা ‘কবির সিং’-এর টিজার, যেখানে নেশাগ্রস্ত ও রগচটা চরিত্রে দেখা যাবে তাকে। ভারতের তেলেগু ভাষার সিনেমা ‘অর্জুন রেড্ডি’র অফিসিয়াল হিন্দি রিমেক ‘কবির সিং’। এতে মেডিকেল ছাত্রের চরিত্রে অভিনয় করেছেন বলিউড অভিনেতা শহীদ কাপুর।

সিনেমাটিতে একেবারে নতুন রূপে হাজির হতে যাচ্ছেন এই তারকা। এই সিনেমায় চরিত্রের প্রয়োজনে নিজের ১৪ কেজি ওজন কমিয়েছেন ‘পদ্মাবত’ খ্যাত এই অভিনেতা। গত সোমবার কবির সিংয়ের টিজার প্রকাশ পেয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। যা এরই মধ্যে ভক্তদের মধ্যে হইচই ফেলে দিয়েছে।

শারীরিক পরিবর্তনের জন্য ট্রেইনার সামির জাউরার অধীনে দীর্ঘদিন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন শহীদ। এই প্রসঙ্গে শহীদ জানিয়েছেন, ২০০৩ সালের ‘ইশক ভিশক’ সিনেমার পর এই প্রথম আবার কলেজ ছাত্রের চরিত্রে আমাকে দেখা যাবে। তাই প্রতিদিন ১৪০০ থেকে ১৫০০ ক্যালোরি কমানোর কঠিন রুটিনে রেখেছি নিজেকে। কঠিন পরিশ্রম ও পরিমিত খাবারের মাধ্যমে ১৪ কেজি ওজন কমাতে পেরেছেন তিনি বলে জানান। সিক্স প্যাকও বানিয়েছেন এই সিনেমার জন্য।

‘কবির সিং’ সিনেমায় দুই রকম শেডে শহীদকে দেখতে পাওয়া যাবে। এতে তার প্রেমিকার চরিত্রে অভিনয় করেছেন এই সময়ের সম্ভাবনাময় অভিনেত্রী কিয়ারা আদভানী। সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন সন্দীপ ভাঙ্গা। আগামী ২১ জুন ভারতে সিনেমাটি মুক্তি পাবে।

ব্যক্তিজীবনে পারিবারিক ভাবে বিয়ে করেন সিনেমা জগতের বাইরের এক মেয়ে মীরাকে। দুই সন্তান এবং স্ত্রী কে নিয়ে বেশ সুখেই জীবন কাটাচ্ছেন তিনি। বলিউডের এই ঝা চকচকে দুনিয়া থেকে তার স্ত্রী এবং সন্তানদের দুরেই রাখতে চান তিনি। একটি সাধারন সুখী পরিবারের যে স্বপ্ন তিনি ছোটবেলায় দেখেছেন কিন্তু পাননি সেটি নিজের স্ত্রী এবং সন্তানদের মাঝেই পেয়েছেন বলেই এক সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন তিনি। প্রফেশনাল জীবনে সামনে আরো চ্যালেঞ্জিং এবং ভিন্নধর্মী চরিত্রে নিজেকে তুলে ধরতে চান এই অভিনেতা। তার অভিনয় প্রতিভা এবং ডেডিকেশন তাকে বাচিয়ে রাখবে ভক্ত এবং চলচ্চিত্র প্রেমীদের মাঝে এমনটাই প্রত্যাশা তাঁর।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।