শাবানা: বাংলা ছবির অবিস্মরণীয় এক ব্র্যান্ড

ঢাকার ছায়াছবির জগতে ৩০ বছর ধরে শাবানা ছিলেন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত শাবানার নামেই ছবি চলতো। ছবিতে শাবানা আছে শুনলেই তামাম জনতা ভিড় করতো ছবিঘরের সামনে।

নাচ, গান কিংবা অভিনয় – সব খানেই অনন্য ছিলেন শাবানা। ‘রা – রা – রা মোর পায়ের ঘুঙুরু ছমছম ছমছম’ কিংবা  ‘আমরা তো বানজারান দেখাবো নাচ গান’ ইত্যাদি গান দেখে শাবানাকে স্বপ্নের রাজকন্যা ভাবতোন লাখো দর্শক।

শাবানা যখন নায়িকা ছিলেন তখন সর্বশ্রেণীর লোকজন ছবি দেখতো। কী ছাত্র, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, গৃহিণী, শিক্ষক, চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার সব পেশার লোকজন তাঁর ছবি দেখার জন্য ছবিঘরে ভিড় করতো। আর এ জন্যই শাবানা জীবদ্দশায় হয়েছেন কিংবদন্তি।

১৯৬১ সালে শিশু শিল্পী হিসেবে অভিনয় শুরু করেন ‘নতুন সুর’ ছবিতে। ওই ছবিতে নায়ক-নায়িকা ছিলেন রহমান ও রওশন আরা। ‘নতুন সুর’ মুক্তি পেয়েছিল ১৯৬২ সালের ১৬ নভেম্বর। ছবিটির পরিচালক ছিলেন এহতেশাম।

১৯৬৬ সালে শাবানার যথার্থ উত্থান ঘটে ‘আবার বনবাসে রূপবান’ ছবিটির মাধ্যমে।  এই ছবিতে শাবানা রূপবানের কন্যা ‘সোনাভান’-এর চরিত্রে অভিনয় করেন। ছবিতে শাবানার নায়ক ছিলেন কাসেম। ‘আবার বনবাসে রূপবান’

মুক্তি পেয়েছিল ১৯৬৬ সালের ৮ এপ্রিল। পরিচালক ছিলেন ইবনে মিজান। ১৯৬৭ সালের ‘জংলী মেয়ে’ এবং ‘চকোরী’ ছবি দুটি শাবানাকে দিয়েছিল আকাশচুম্বী খ্যাতি। ‘জংলী মেয়ে’ ছবিতে শাবানার বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন আজিম। ইবনে মিজান পরিচালিত ‘জংলী মেয়ে’ ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৬৭ সালের ১৯ মে।

শাবানা ও সুজাতা

আর এহতেশাম পরিচালিত ‘চকোরী’ ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল এরই প্রায় ২ মাস আগে অর্থাৎ ১৯৬৭ সালের ২২ মার্চ তারিখে। সে বছরই মুক্তি পেয়েছিল ‘ছোটে সাহেব’ ছবিটি।

মুস্তাফিজ পরিচালিত ‘ছোটে সাহেব’ ছিল উর্দূ ভাষায় নির্মিত ছবি। নায়ক ছিলেন নাদিম। উর্দূ ভাষায় নির্মিত ‘চকোরী’ ছবিটি শাবানার খ্যাতি পৌঁছে দিয়েছিল – সুদূর করাচী, পিন্ডি, পেশোয়ার, কোয়েটা, মারী পর্যন্ত।

পরবর্তীতে নায়ক নাদিম পরিচালক এহতেশামের মেয়েকে বিয়ে করে পাকিস্তানে চলে যান। শাবানার পৈতৃক নিবাস চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার ডাবুয়া গ্রামে। তাঁর বাবা ফয়েজ চৌধুরী একসময় চিত্র পরিচালক ছিলেন।

প্রথমদিকে শাবানার নায়ক ছিলেন – কাসেম, নাদিম, আজিম, রাজ্জাক এবং পরবর্তী সময়ে ওয়াসিম, সোহেল রানা, আলমগীর, জাভেদ, বুলবুল আহমদ, জাফর ইকবাল – প্রমুখ। শাবানা অভিনীত ছবির সংখ্যা আনুমানিক ৩০০।

খুব কম ভক্তই জানেন যে শাবানা তাঁর আসল নাম নয়। আসল নাম হল আফরোজা সুলতানা রত্না। জন্ম ১৯৫১ সালে।

শাবানার কিছু উল্লেখযোগ্য ছবির তালিকা

  • ১৯৬৮ সালে – চাঁদ আওর চাঁদনী, ভাগ্যচক্র, কুলি।
  • ১৯৬৯ সালে – মুক্তি, আনাড়ী।
  • ১৯৭০ সালে – পায়েল, বাবলু, সমাপ্তি, মধুমিলন, মুন্না আউর বিজলী, ছদ্মবেশী।
  • ১৯৭২ সালে – সমাধান, স্বীকৃতি, ওরা ১১ জন, অবুঝ মন, ছন্দ হারিয়ে গেল, চৌধুরী বাড়ি, এরাও মানুষ।
  • ১৯৭৩ সালে – ঝড়ের পাখি।
  • ১৯৭৪ সালে – দূর থেকে কাছে, আঁধারে আলো, অতিথি, বিচার, দস্যুরাণী, মালকা বানু, ডাকু মনসুর, অবাক পৃথিবী, ভাইবোন, কার হাসি কে হাসে।

 

স্বাধীনতার আগে কাজী জহিরের ‘মধুমিলন’ ছবিতে শাবানার অভিনয় দেখে বাঙালি দর্শকরা তাঁর প্রতি বেশি দুর্বল হয়ে পড়েন। কেননা, শাবানা নিজেই আমাকে একবার বলেছিলেন, ‘আমার তো মনে হয়, মধু মিলন ছবিতে সম্ভবত প্রথম হৃদয়স্পর্শী অভিনয় দেখাতে সক্ষম হয়েছিলাম।’

১৯৭৫ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত শাবানা অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হলো – সাধু শয়তান, সোনার খেলনা, চাষীর মেয়ে, আলোছায়া, অনেক প্রেম অনেক জ্বালা, দুই রাজকুমার, বাদশা, মায়ার বাঁধন, জয় পরাজয়, ফেরারী, রাজরাণী, আগুন, মনিহার, অমর প্রেম, লুকোচুরি, সাহেব বিবি গোলাম, রাজ দুলারী, সোহাগ, দোস্ত দুশমন, শাহজাদা, তুফান, কন্যাবদল, মাটির ঘর, মধুমিতা, দাতা হাতেম তাঈ, ফকির মজনু শাহ, স্বামীর আদেশ, অন্ধ বিশ্বাস , উৎসর্গ, আগুন, লালু ভুলু, ভাত দে, লাল কাজল, কাজের বেটি রহিমা, বিজয়িনী সোনাভান, চোখের মনি, আয়না, আমির ফকির, রাজ নন্দিনী, শেষ উত্তর, ভাই ভাই, ছক্কা পাঞ্জা, ওমর শরীফ, সংঘর্ষ, আলতা বানু, দুই পয়সার আলতা, একটি সংসারের গল্প, মা যখন বিচারক, বাপের টাকা, পরাধীন কোহিনূর, শশীপুন্নু, জবাবদিহি, সকাল সন্ধ্যা, বউ শ্বাশুড়ি, চাঁপা ডাঙার বউ, মায়ের দোয়া, গরীবের বউ, ঘরে ঘরে যুদ্ধ, টপ রংবাজ, মেয়েরাও মানুষ, জিদ্দি, লাট সাহেব, মিথ্যার মৃত্যু, ভাবীর সংসার, প্রায়শ্চিত্ত, স্ত্রীর স্বপ্ন নাগরানী, রজনী গন্ধা, মিয়াবিবি, মা ও ছেলে, শিরি ফরহাদ, দেশ বিদেশ, সালতানাৎ, ধন দৌলত, সখিনার যুদ্ধ, হিম্মতওয়ালী ইত্যাদি।

একালের শাবানা

রাজ্জাক-শাবানা জুটির উল্লেখযোগ্য ছবি হলো – ছদ্মবেশী, সমাপ্তি, মধু মিলন, ঝড়ের পাখি, অবুঝ মন, ছন্দ হারিয়ে গেল, চৌধুরী বাড়ি, এরাও মানুষ, অতিথি, অবাক পৃথিবী, ভাই বোন, সাধু শয়তান, আলো তুমি আলেয়া, অনেক প্রেম অনেক জ্বালা, আঁধার পেরিয়ে, মায়ার বাঁধন, আগুন, অমর প্রেম, অনুভব, অলংকার, অনুরাগ, মাটির ঘর ইত্যাদি।

আলমগীর-শাবানা জুটির মনে রাখার মতো ছবি হলো – দস্যুরানী, জয় পরাজয়, মনিহার, লুকোচুরি, মনের মানুষ, মধুমিতা, চাষীর মেয়ে, কন্যা বদল। নাদিম-শাবানা জুটির উল্লেখযোগ্য ছবি হলো – চকোরী, ছোটে সাহেব, চাঁদ আওর চাঁদনী, কুলি, পায়েল, দাগ, বসেরা, আঁধি, আনাড়ী, চাঁদ সুরুজ – ইত্যাদি।

ওয়াসিমের বিপরীতে শাবানা ডাকু মনসুর, দুই রাজকুমার, সন্ধিক্ষণ, তুফান, জীবন সাথী, দোস্ত দুশমন, রাজ দুলারী, রাজনন্দিনী, বানজারান‌ কাজ করেন।

উজ্জ্বলের বিপরীতে তিনি স্বীকৃতি, সমাধান, ফকির মজনু শাহ, বঁধু মাতা কন্যা; আঁধারে আলো ছবিতে কাজ করেন। জাভেদের বিপরীতে করেন মালকা বানু, সাহেব বিবি গোলাম, শাহজাদা ইত্যাদি ছবি।

বুলবুল আহমেদের বিপরীতে জননী, সোহাগ; আনন্দের বিপরীতে কার হাসি কে হাসে; আজিমের বিপরীতে বাবুল, মুন্না আওর বিজলী; সাজ্জাদের বিপরীতে মুক্তি; খসরুর বিপরীতে বাদশা; সোহেল রানার বিপরীতে রাজরানী, হাতেম তাই; জাভেদ শেখের বিপরীতে হালচাল; জাফর ইকবালের বিপরীতে দূর থেকে কাছে, ফেরারী, বিচার ছবিতে অভিনয় করেছিলেন।

ওই সমেয়ের শীর্ষ সব নায়কদের সাথে জমে গিয়েছিল শাবানার জুটি। তবে, সবচেয়ে বেশি জমেছিল রাজ্জাক ও আলমগীরের সাথে। এক আলমগীরের সাথেই নাকি তিনি ১৩০ টির মত ছবি করেন।

শাবানা ১৯৭৩ সালে সরকারী কর্মকর্তা ওয়াহিদ সাদিকের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৯৭ সালে তিনি সিনেমার জগতকে বিদায় জানান। ২০০০ সালে তিনি আমেরিকায় সপরিবারে পাড়ি জমান। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে শাবানা অধ্যায়ের এখানেই সমাপ্তি।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।