ধনী হওয়ার সিক্রেট(!)

অনলাইন বুকশপ রকমারি ডট কম এর সাইট ব্রাউজ করার সময় একটা ইমেজে চোখ পড়লো আচমকা; ইমেজের শিরোনামটি চটূল এবং চটকদার- ধনী হওয়ার সিক্রেট কী?

বইয়ের প্লাটফরমে এরকম নীলক্ষেত ধাঁচের লাইন ব্যবহারের উদ্দেশ্য যে নিছকই মনোযোগ আকর্ষণ তা অনুমেয় ছিল, তবু মনোযোগ বিনিয়োগ করি এবং জানতে পাই,  নেপোলিয়ন হিল এর বেস্ট সেলিং বই ‘থিংক এন্ড গ্রো রিচ’ কে প্রমোট করার উদ্দেশ্যেই চটকদার এই শিরোনামের আবির্ভাব, এবং বইটি নিয়ে ৫৯ মিনিটের দীর্ঘ ভিডিও আলোচনা সংযুক্ত করা হয়েছে।

পৃথিবী অত্যন্ত উচ্চহারের সুদযুক্ত একটি ব্যাংক, অর্থনীতির বাইরে এখানে দাঁড়কাক ব্যতীত কারো অস্তিত্ব থাকতে নেই— সেই নিরেট বাস্তবতা মানতে অরুচি বোধ করি না।এও মানি- ধনী হওয়ার সিক্রেট কী এই প্রশ্নটা পৃথিবীর প্রতি মিলিমিটার স্পেসে লিখিত হয়ে আছে, রকমারি ডট কম সেই লেখাকেই ডিসপ্লে করছে মাত্র, করুক গে। তবু লাইনটা চোখে পড়ার পরবর্তীতে গতকাল অর্ধদিবসের পর থেকেই নানারঙের ভাবনা ঘুরঘুর করছে।

সেল্ফ হেল্প বই আদতে কতটা হেল্পফুল এটা বোঝার জন্য যখনই কোনো ম্যাস অডিয়েন্সের সাথে মিথস্ক্রিয়ার সুযোগ ঘটে জানতে চাই মোটিভেশনাল বই বা স্পিচ তাদের কতটা কাজে আসে। যা জবাব পাই তার সারমর্ম হলো ‘বিশ্বাসে মেলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর’। অর্থাৎ তারা গভীরভাবে বিশ্বাস করে এ ধরনের কনটেন্ট জীবনের কোনো এক পর্যায়ে তাদের ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করবে, এবং তাদের জীবনভাবনায় যথেষ্ট পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। কীভাবে নিশ্চিত হলেন পরিবর্তন এসেছে সেই প্রশ্নে অবশ্য গোছালো উত্তর পাওয়া হয় না সচরচর।

তবু লক্ষ-কোটি মানুষের এই যে বিশ্বাস জন্মে, সাময়িক উদ্দীপনা তৈরি হয় এটা সেল্ফ হেল্প বইয়ের বিরাট সাফল্য নিঃসন্দেহে। সাফল্য একটি গ্ল্যামারাস বিষয়, তাতে মিনিং এবং ভ্যালু খুঁজতে যাওয়া নিরর্থক। সাফল্যের প্রধান দুই স্তম্ভ- অর্থ এবং খ্যাতি। এই দুই স্তম্ভ থেকেই গড়ে উঠে ক্ষমতাচক্র।

সেল্ফ হেল্প বইয়ের বিপুল চাহিদার ব্যাকরণটা কীভাবে তৈরি হয় আদতে?

পৃথিবীতে সেল্ফ হেল্প ঘরানার যত বই বিখ্যাত হয়েছে সেগুলো পর্যালোচনা করলে ৩টা বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি পাওয়া নিশ্চিত। প্রথমত, সেখানে কিছু ফ্যান্সি কী-ওয়ার্ড থাকবে এবং সেগুলোকে ভিন্নভাবে এন্টারপ্রেট করা হবে। যেমন বইয়ের নাম গ্রো রিচ, শুনে মনে হবে ধনী হওয়ার টিপস দিচ্ছে। বইয়ের ভেতরে দেখা যাবে, ধনশালীতাকে কেবলমাত্র অর্থনৈতিক জায়গা থেকে না দেখে মানসিক সমৃদ্ধিতার মেটাফর হিসেবে দেখানো হয়েছে। যে ব্যক্তি মানসিকভাবে যত সমৃদ্ধ সমাজে-পৃথিবীতে তার কন্ট্রিবিউশন তত বেশি – এটাই প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা।

দ্বিতীয়ত, একটি দীর্ঘ সময়ব্যাপী রিসার্চ এবং স্ট্রাগলের গল্প। যেমন বইটি লিখতে লেখক একটানা ১০ বছর, ১২ বছর বা ২০ বছর ধরে গবেষণা করেছেন, চরম কপর্দকশূন্য জীবন যাপন করেছেন। সমস্ত অভিজ্ঞতাগুলোর নির্যাস তিনি একটি বইয়ে সংরক্ষণ করেছেন, যেটি গ্লোবালি কয়েক লক্ষ বা কোটি কপি বিক্রিত হয়েছে। ১০-১৫ বছর এবং ২ লক্ষ কপি, এগুলো যতটা সময়-সাধনা বা রেসপন্সের নির্দেশক, তার চাইতে বেশি সংখ্যা, যা দিয়ে মানুষকে আশ্বস্ত করানোটা সহজ হয়।

তৃতীয়ত, প্রচুর পরিমাণে কেইস স্টাডি। যেমন, দুই বন্ধু ছিল; তাদের একজনের বাবা প্রতিনিয়ত অভিযোগ করতো, এবং নিরুৎসাহিত করতো; অন্যজনের বাবা তাকে অনবরত চ্যালেঞ্জ আর প্রতিকূলতার মধ্যে ফেলে দিতো। ১৫ বা ২০ বছর পরে দেখা গেলো চ্যালেঞ্জ শেখানো বাবার ছেলে সমাজে বিশাল প্রভাববিস্তারি মানুষে পরিণত হয়েছে, আর অভিযোগকারী বাবার ছেলেটি মিডিওকর এক মানুষ হিসেবে জীবনযাপন করছে। এ থেকে কী শেখা গেল? অল্প বয়সে বাচ্চাকে যত বেশি চ্যালেঞ্জের সম্মৃখীন করবেন তার বড়ো মানুষ হওয়ার সম্ভাব্যতা তত বেড়ে যাবে।

সেল্ফহেল্প বইয়ের সমালোচনা করার উদ্দেশ্য থেকে এসব ভাবনা উৎসারিত হয়নি, ভাবনার সূত্রপাত ‘ধনী হওয়ার সিক্রেট’ সংক্রান্ত লাইন থেকে।

ধনশালীতাকে মানসিক ধারণা হিসেবে দেখাতে চাওয়া এক ধরনের কনস্পাইরেসি, এবং সচেতনভাবেই এটা করা হয়। ধনতান্ত্রিকতা একটি আদ্যন্ত অর্থনৈতিক ধারণা বা ব্যবস্থা। একজন মানুষ মানসিকতার দিক থেকে কতখানি সমৃদ্ধ তা নির্ভর করে তার ব্যক্তিসত্তা, চিন্তাপ্রক্রিয়া, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এবং শ্রেণিভেদে নানারকম ব্যক্তিত্বের সাথে আচরণের প্রেক্ষিতে। সমৃদ্ধ মানুষদের আমরা কখনো বলি ব্যতিক্রমী, কখনো মহাত্মা, কখনোবা আলোকিত। আরো হয়তো অনেক কিছুই বলি, কিন্তু ‘ধনী’বিশেষণের ব্যবহার কি করা হয়? একদমই নয়।

কেন হয় না, এ বিষয়ে একটু গভীর চিন্তা করলেই ধোঁকাটা উন্মোচিত হওয়ার কথা। বিত্ত এবং চিত্ত- এরা চুম্বকের দুইমেরু, আপনি মধ্যবর্তী অবস্থানে আছেন মানে উভয়মেরুর সাথে সমতা এবং সমঝোতা বজায় রেখে চলেছেন, কোনো একটি মেরুর দিকে ঝুঁকে যাওয়া মানে অন্য মেরুর থেকে ক্রমশ দূরে সরে যেতে থাকে। বিত্তসুখ যার তার চিত্তসুখের সন্ধান পাওয়া হয় না, যে চিত্তসুখে বিভোর তার পক্ষে বিত্তসুখের অনুভূতির সাথে পরিচিত হওয়া অসম্ভব।

পক্ষান্তরে ধনী তাদেরই বলা হয় যাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিকে আর্থিক মূল্যে কনভার্ট করলে যে পরিমাণ দাঁড়াবে তা সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের এককভাবে অর্জিত সম্পত্তির আর্থিক মূল্যমানের তুলনায় বহুগুণ বেশি।

আমি ব্যক্তিগতভাবে ধনশালীতাকে সরাসরি লিকুইড ক্যাশ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি। ধরা যাক, কারো ১০০ বিঘা জমি আছে, তাকে ধনী বলবো কিনা তা শর্তসাপেক্ষ, কারণ সেই জমি বিক্রি না করা অবধি তার হাতে ক্যাশ নেই। আবার জমিটা শহরে নাকি গ্রামে সেই ভৌগলিক অবস্থানটাও বিবেচ্য। কিন্তু কারো ব্যাংকে ৫০ কোটি টাকা থাকা মানে এই পরিমাণ লিকুইড ক্যাশ সে সংরক্ষণ করে এবং যখন ইচ্ছা খরচ করতে পারবে।

একটা সময় পর্যন্ত আমার ধারণা ছিলো সমাজের সিংহভাগ মানুষ ধনী হতে চায়। এর পেছনে দেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির গুরুতর দায় রয়েছে। এখনো এদেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করে, এবং বেসরকারি খাতে এন্ট্রি লেভেল চাকরির বেতন গড়ে ১২-১৫ হাজার টাকা হওয়ায় তীব্র অর্থনৈতিক অবদমন মানুষের মধ্যে কাজ করে। সেই সাথে জনসংখ্যার ঘনত্ব একটি নিয়ামক তো বটেই। তবে যেসব দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরেকটু স্থিতিশীল সেখানকার মানুষের মনোজগত হয়তোবা আরেকটু ভিন্নভাবে কাজ করে।

সময়ের পরিক্রমায় এখনকার উপলব্ধি হলো, খুব কমসংখ্যক মানুষই ধনী হতে চায়। তারা প্রাচুর্যের স্বপ্ন দেখে, এও বিশ্বাস করে এক জীবনে সেই স্বপ্নের নাগাল আর পাওয়ার নয়। মানুষ মূলত অভাবকে এড়াতে চায়, এবং পরিবার-পরিজন নিয়ে নির্ঝঞ্ঝাট এক জীবন অতিবাহিত করতে চায়—এটা বলা অধিক নিরাপদ। অভাবে থাকতে না চাওয়া আর ধনী হতে চাওয়া দুইয়ের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান।

নিজের ব্যাংক একাউন্টে ১০ কোটি টাকা আছে কিংবা কোম্পানীসূত্রে বছরে ৪০-৫০ কোটি টাকা রেভিনিউ জেনারেট করে এরকম প্রায় ২০-২২জন মানুষকে নিবিড় পর্যবেক্ষণের সুযোগ ঘটেছে, এদের মধ্যে কয়েকজনের সাথে দীর্ঘ সময় কাটানোর অভিজ্ঞতাও হয়েছে। ধনীর স্কেলে তারা হয়তোবা খুব উপরের দিকে থাকবে না, তবু বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতার নিক্তিতে অবধারিতভাবেই তাদের ধনী বলা উচিত।

তো এইসকল ধনী ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার দরুণ ব্যক্তিগতভাবে ধন-সম্পদের প্রতি আরো নিরাসক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে আমার।দিন যায় আর অনুভব করি, ধনী হওয়া এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা, কিছুটা উন্মত্ততা। ধনীর চাইতে ইনফ্লুয়েন্সিয়াল মানুষ হওয়াটা অধিকতর আনন্দের। প্রশ্ন আসতে পারে, কতগুলো প্রজন্মে নিজের প্রভাব সঞ্চারিত করা সম্ভব। অন্যদিকে বিত্তশালী মানুষ তার সময়ে এবং সমাজে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে, এই প্রলোভন উপেক্ষা করার শক্তিই বা আসবে কোত্থেকে!

আমি বিশ্বাস করি, মানুষের চেতনা যতক্ষণ সক্রিয় থাকে সেটাই তার সত্তা, অস্তিত্ব বা জীবন মানচিত্র। তার জন্মের পূর্বে এবং মৃত্যুর পরে যা হয়েছে বা হবে কোনোটাই তার অনুভব করার সুযোগ নেই। সুতরাং জীবদ্দশায় যদি ৫০ জন মানুষকে চিন্তা এবং দর্শন দিয়ে উদ্ভাসিত করা যায়,সেটা ৫০ কোটি টাকার মালিক হওয়ার চাইতে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান এবং চিকিৎসা-শিক্ষার নিগড়ে একটি সম্মানজনক জীবন উদযাপন করতে একজন ব্যক্তির ঢাকা শহরে মাসে কত টাকা খরচ হতে পারে? সেই টাকার চাহিদা কোনো একভাবে নিবৃত্ত হবেই, কিন্তু ধনী হওয়ার অভিযাত্রাটা তো পুরোপুরি আলাদা। সেই অভিযাত্রায় মানুষ শরিক কেন হয় আদতে?

যে কোনো ধনী ব্যক্তির জীবনযাপনে প্রধান যে সমস্যাটা আবিষ্কার করেছি, সেই জীবনে প্রায় পুরোটাই আরোপিত আচরণ আর মেকি কথা-বার্তায় ঠাঁসা; যা বলি তা ধারণ করি না এবং যা পালন করি তা বিশ্বাস করি না- এটা মারাত্মক অসহনীয় এক ফিলোসফিকাল ক্রাইসিস, যার মধ্য দিয়ে ধনী মানুষকে প্রতিনিয়ত সময় পার করতে হয়। তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বহুরূপী। ফলে একজন ধনী মানুষের ট্রু কালার বা প্রকৃত স্বরূপ কখনোই উদঘাটন করা সম্ভব হয় না।

তার আশপাশে মানুষের ভিড় লেগে থাকে, সে নিজে পরিণত হয় আগুনে যার প্রতি আকৃষ্ট হয় অসংখ্য পতঙ্গ। একজন ধনী ব্যক্তির সাথে অন্যান্যদের যে মিথস্ক্রিয়া সেখানে স্বার্থ এবং বৈষয়িক প্রয়োজন পূরণই প্রাধান্য পায় সাধারণত, নির্ভেজাল আত্মিক তাগিদ খুবই নগণ্য। ফলে সামাজিক পরিমণ্ডলে একজন ধনী ব্যক্তির জীবনযাপন বিচ্ছিন্ন দ্বীপে একাকী বসবাসরত রবিনসন ক্রুসোর চাইতে ব্যতিক্রমী কিছু নয়।

জীবনের এক পর্যায়ে বহু ধনী ব্যক্তিরই চিন্তার প্যারাডাইম শিফট হয়ে যায়। তারা তখন কেবলমাত্র অর্থ-সম্পদে তৃপ্ত না থেকে সোস্যাল ভ্যালু তৈরিতে আগ্রহী হয়ে উঠে। তারই পরম্পরায় প্রচুর দান-খয়রাত করে, স্কুল-কলেজ-মসজিদ-মাদ্রাসা বা এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করে, শিল্প-সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করে, এবং সামাজিক অবতারের প্রতিমূর্তি হিসেবে স্বীকৃতি পেতে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠে। এবং ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, যে আর্থিক বুনিয়াদের জোরে তারা সোস্যাল ভ্যালু নামক মণ্ডা-মিঠাই উৎপাদন করে, পাবলিক মতবাদের সময়ে সেটিকেই অপাঙক্তেয় হিসেবে চালিয়ে দিতে চায়।

তারা বলবে, টাকার পেছনে ছুটে খুব বেশি টাকা উপার্জন করা যায় না, অসাধারণ কিছু করতে চাওয়াটাই মূখ্য। অথচ এই জাতীয় কথাগুলো তারা তখনই বলে যতদিনে তারা প্রচুর টাকা উপার্জন করে নিয়েছে। যে কারণে সাধারণ মানসে তাদের বক্তব্যগুলো বিশেষ অনুরণন তোলে না।

আর্থিকভাবে ধনী এবং সোস্যাল ভ্যালু বিষয়ে কথা বলা ব্যক্তিবর্গের বক্তব্যে কখনোই উঠে আসে না মানি মেকিংও একটি অভ্যাস, এক ধরনের খেলা, যার সেই অভ্যাস নেই সে কখনোই প্রচুর টাকা উপার্জন করতে সমর্থ হবে না। টাকা উপার্জনের প্রতি ধাপে কতরকম কম্প্রোমাইজ করতে হয়, স্বকীয়তা বিসর্জন দিতে হয়, এবং অনবরত অভিনয় করে যেতে হয়, সর্বোপরি মানসিকভাবে অতিমাত্রায় আত্মকেন্দ্রিক হতে হয় সেইসব নিখাদ সত্য স্বীকার বা কনফেশন কোথাও কি শোনা যায়? বরং আমাদের সম্মুখে আসবে বড়ো স্বপ্ন দেখো, লেগে থাকো, আলস্যকে প্রশ্রয় দিয়ো না, ভ্যালুতাড়িত হও – আরো কত কি।

ধনী মানুষ আদতে সফল মানুষ। সফলতার দুটো গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো- ডিপ্লোম্যাটিক হওয়া, অর্থাৎ যা ভাবছি বা যা বলা উচিত বোধ করছি তাকে প্রাধান্য না দিয়ে কোন কথাটা বললে সর্বকুল রক্ষিত হয় সেই বোধের চর্চা, এবং বর্ণচোরা হওয়া, অর্থাৎ যে যেমন তার সাথে সেই অনুসারে আচরণ করা, নিজে কেমন তা বুঝতে না দেয়া। এই দুটো শর্ত যে যত নিপুণভাবে পালন করে তার ধনী হওয়ার সম্ভাবনা তত বৃদ্ধি পায়। এর সাথে যদি মেধার সংযোগ ঘটে সে পরিণত হয় ক্লাসিকাল ধনীতে। সে তখন মিষ্টভাষি, ইনস্পাইরিং পাবলিক ফিগার তথা সমাজে কন্ট্রিবিউটিং ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিতি পায়।

গড়পড়তা ধনী আর ক্লাসিকাল ধনীর মধ্যে পার্থক্যটা মূলত আচরণ আর পাবলিক গ্রহণযোগ্যতায়। গড়পড়তা ধনী অর্থ আর আভিজাত্যের ঠাঁট প্রদর্শনে ব্যস্ত, অনেকটা বাংলা সিনেমার চৌধুরী সাহেবের মতো। ক্লাসিকাল ধনী জীবনযাপনে সিম্পলিসিটির বিজ্ঞাপন দিবে, প্রাচুর্যে সুখ নেই সেই বাণী প্রচার করবে, এবং শিল্প-সাহিত্য-ধর্ম-শিক্ষা প্রভৃতি কোনো এক বা একাধিক ক্ষেত্রের পৃষ্ঠপোষক-সমঝদার হিসেবে নিজেকে পরিচিত করতে চাইবে, যদিও মনের দিক থেকে দুই ধনীর মধ্যে দূরত্ব সামান্যই, উপরন্তু গড়পড়তা ধনী বরং প্রেডিক্টেবল এবং নিরাপদ।

আদর্শ, মূল্যবোধ, ইমপ্যাক্ট, ভ্যালু প্রভৃতি ধারণা বা মনোবৃত্তিগুলো ধারণকারীরা আদতে ইনডিভিজুয়াল বা সামাজিক মানদণ্ডে ফ্রিল্যান্সার। তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেই, তার বসবাস অত্যন্ত ক্ষুদ্র এক গণ্ডিতে। একক স্বাধীন পেশাজীবী যেমন নায়ক, গায়ক, লেখক,খেলোয়াড় প্রভৃতি পরিচয়েও সে প্রচুর উপার্জন করতে পারে, তবুও সে একজন বিচ্ছিন্ন ইনডিভিজুয়াল থেকে যাবে যতক্ষণ না পর্যন্ত সে কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের অধীনে নিজেকে সোপর্দ করছে। এবং সোপর্দ করামাত্রই সে কিছু এটিকেট আর ম্যানারের সাথে সমঝোতা করে নেয়, এবং পরিণত হয় গড়পড়তা কিংবা ক্লাসিকাল ধনীতে।

ধনী হতে চাওয়াটা কি তবে অন্যায্য এবং অযৌক্তিক?

মানুষ যদি একক ব্যক্তিগত প্রাণী হয় সেক্ষেত্রে তার অর্থনৈতিক চাহিদা এবং প্রয়োজন – দুটোই সীমিত। কিন্তু মানুষ একই সাথে পারিবারিক, সামাজিক,আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক প্রাণী। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাকে সংঘবদ্ধতার শর্তগুলো পূরণ করতে হয়। সংঘবদ্ধ প্রাণী অনিরাপত্তা বোধে ভুগে, পরশ্রীকাতরতায় আক্রান্ত হয়, সহযোগিতার চাইতে প্রতিযোগিতাকে অধিক আকর্ষণীয় গণ্য করে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সংঘবদ্ধতার যেসব সীমাবদ্ধতা সেগুলোকে পাশ কাটানোতে বা নির্মূলের ক্ষেত্রে মোক্ষম দাওয়াই হয়ে উঠতে পারার সম্ভাবনাযুক্ত।

পক্ষান্তরে স্বকীয়তা, নির্মোহতা, নির্মল আনন্দ প্রভৃতি শর্তগুলোর সাথে প্রাচুর্যের সরাসরি কনফ্লিক্ট বাঁধে। এই কনফ্লিক্ট অন্তহীন এবং এখানে একজন ব্যক্তির পক্ষে নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণের সুযোগ নেই; হয় তুমি প্রাচুর্যকামী অথবা নির্মোহতাকামী। নির্মোহতা অনেকটাই এবস্ট্রাক্ট ধারণা হওয়ায় এটা উপলব্ধি করাই কঠিন একজন ব্যক্তি তার জীবনাচরণের ঠিক কোন পর্যায় পর্যন্ত নির্মোহ থাকতে পারে। নির্মোহকে অনেকে নির্বিকারত্বের সাথেও গুলিয়ে ফেলেন। যে কারণে নির্মোহ মানুষমাত্রই তাকে সাধু-সন্ন্যাসী স্তরে চিন্তা করে নেয়। নির্মোহতা সংক্রান্ত অস্পষ্টতা থেকে সহজ সমাধান হিসেবে মানুষ প্রাচুর্যকামীতাকেই অবলম্বন করতে চায়, এবং সেখান থেকেই মানসিক উৎপীড়নে ভুগতে থাকে।বিষন্নতা, অবসাদগ্রস্ততাকে প্রাচুর্যকামীতার অন্তিম ফলাফল হিসেবেই দেখা যেতে পারে।

তাহলে ধনী হওয়ার সিক্রেট নিয়ে মানুষের আগ্রহের বা ব্যাকুলতার হেতু কী? এটা নিতান্তই সংখ্যালঘুতা বা দুর্লভ্যতার প্রতি মানুষের আকাঙক্ষা বা আকর্ষণ। আপনি যখন জানবেন পৃথিবীর মাত্র ৫% মানুষের হাতে পৃথবীর যাবতীয় ধন-সম্পদের মালিকানা, সঙ্গতকারণেই আপনি বাকি ৯৫% এর প্রতিনিধি হিসেবে উদ্বেলিত হবেন ৫% এর মনোজগতে এবং জীবনযাপনে প্রবেশ করতে,সঙ্গে এটাও জানেন, তা হয়তোবা আপনার পক্ষে সম্ভব হবে না। যে কারণে এটা এক ধরনের ফ্যান্টাসি মাত্র।

তাই ধনী মানুষেরা কথা বলে বা কাজ-কর্ম করে এমন এক শ্রেণির জন্য যে শ্রেণির মনোজগতের সাথে তাদের সংযোগ নেই। অনেকটা কানাডায় বসে ফিলিপাইনের কালচার সম্বন্ধে থিসিস করার মতো। এজন্যই মানুষের আন্ত:ক্রিয়া গ্রেটার স্কেলে কোনো অর্থবহন করে না, এবং দিনশেষে রকমারি ডট কম এ ‘ধনী হওয়ার সিক্রেট কী’ ই জ্বলজ্বল করতে থাকে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।