স্কটিশদের ইংল্যান্ড বধ: আপসেট না যোগ্য দলের জয়?

‘ইংল্যান্ডকে একদিন হারতেই হবে! তাহলে এই রবিবারেই কেন নয়?’

কথাটা ম্যাচের একদিন আগে স্কটল্যান্ডের কোচ গ্র্যান্ড ব্র্যাডবার্ন মিডিয়ার সামনে বলেছিলেন। আর তাঁর খেলোয়াড়রা মাঠে তার প্রমাণ দিয়েছে। কমেন্ট্রি বক্সে, সংবাদমাধ্যমে ঘুরেফিরে একজন ভদ্রলোকের নাম বেশ কয়েকবার উঠে এসেছিলো, পল উইলসন, আইসিসির এলিট প্যানেলের আম্পায়ার। খুবই ক্রিটিক্যাল এক মুহুর্তে তার দেয়া ভুল সিদ্ধান্তে উইকেট হারিয়ে ডিএলএস হিসাবে পিছিয়ে পড়ে বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব থেকে বিদায় নেয় স্কটল্যান্ড, চূড়ান্ত পর্বে চলে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

একটা জবাব দেয়ার তাড়না সেদিন থেকেই যেন স্কটিশদের ভেতর ছিলো, সেটা ক্রিকেটার-দর্শক সবার মাঝেই।

ম্যাচের ৭২ দিন আগে ক্রিকেট স্কটল্যান্ড জানিয়ে দিয়েছিলো এই ম্যাচের সব টিকিট শেষ, ‘সোল্ড আউট’, অথচ পাকিস্তানের বিপক্ষে দুই ম্যাচ টি-টুয়েন্টি সিরিজের টিকিট এখনো পাওয়া যাচ্ছে ওয়েবসাইটে!

স্কটল্যান্ড-ইংল্যান্ড ম্যাচ স্কটিশদের কাছে ফুটবল বিশ্বকাপের মতো, চার বছর পর পর আসে! ২০০৭ সালে করা এক চুক্তি অনুযায়ী ইংল্যান্ড দুই বছর পর পর স্কটল্যান্ডে যায় একটি ওয়ানডে খেলার জন্য।

২০০৮, ২০১০ সালে নিয়মিত ম্যাচের পর ২০১২ সালে এডিনবরাহ-তে (এডিনবার্গ ভুল উচ্চারণ) বন্যার কারনে ম্যাচ বাতিল হয়। ২০১৪ সালে ম্যাচ হয়েছিলো আবার। যেহেতু ২০১৫ বিশ্বকাপে এই দুই দল মুখোমুখি হয় তাই ২০১৬ সালে কোন ম্যাচ হয়নি। তারপর এবার ২০১৮ সালে।

বিশ্বকাপের মতো চার বছর পর পর দেখার সুযোগ মেলে বলেই কিনা গতকাল ৪,৬০০ ধারণক্ষমতাসম্পন্ন গার্জ ক্রিকেট ক্লাবের মাঠ ছিলো কানায় কানায় পূর্ণ।

স্কটল্যান্ড হতাশ করেনি ফ্যানদের, জবাব দিয়েছে আইসিসি এবং ক্রিকেট বিশ্বকে।

পঞ্চম দেখায় র‌্যাকিংয়ের ১ নাম্বার দল ইংল্যান্ডের উপর শুরু থেকেই চড়াও হন দুই ওপেনার ম্যাথু ক্রস এবং অধিনায়ক কাইল কোয়েৎজার। ১৩ ওভারে স্কোরবোর্ডে জমাহয় ১০০ রান।

কোয়েৎজার (৫৮) এবং ক্রস (৪৮) ফিরে যাবার পর ইংল্যান্ড হয়তো স্বস্তি ফিরে পেয়েছিলো, কিন্তু কিসের কি!

উইকেটে আসেন কালাম ম্যাকলিয়ড, যার গল্পটা বেশ মজার। কাউন্টি ক্রিকেট খেলার সময় একবার ২০০৯ সালে ইংল্যান্ডের বদলি ক্রিকেটার হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন। কাউন্টিতে ছিলেন বোলার, কিন্তু বোলিং অ্যাকশন সন্দেহভাজনের শিকার  হবার পর স্কটল্যান্ড দলে হয়ে যান ব্যাটসম্যান!

উইকেটে এসে ম্যাকলিয়ড ৯৪ বলে ১৪০* রানের ঝড়ো ইনিংস খেলে ইংল্যান্ডের নাগালের বাইরে নিয়ে যায় ম্যাচ।

ম্যাকলিয়ডের সপ্তম সেঞ্চুরি ক্যারিয়ারের। চতুর্থ ১৪০+ রানের ইনিংস। চারবার ১৪০+ ইনিংস খেলা বাকি ব্যাটসম্যান কারা জানেন? স্যার ভিভ রিচার্ডস, ব্রায়ান লারা, রিকি পন্টিং এবং এবি ডিভিলিয়ার্স!

লেগ স্পিন খেলতে এই মুহুর্তে যেকয়জন ব্যাটসম্যান সিদ্ধহস্ত তার ভেতর ম্যাকলিয়ড অন্যতম। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে রশিদ খানকে ‘শায়েস্তা’ করেছিলেন ১৫৭* করার পথে, গতকাল করেছেন আদিল রশিদকে (৭২/২) , এর আগে দুই দফায় জিম্বাবুয়ের গ্রায়েম ক্রিমারকে সামলেছেন সাবলিলভাবে।

জর্জ মান্সে (৫৫) আর বেরিংটন (৩৯) যোগ্য সঙ্গদিলে স্কটল্যান্ডের স্কোর হয় ৩৭১/৫, যেকোন সহযোগী দেশের সর্বোচ্চ দলীয় ওয়ানডে রান। আগের সর্বোচ্চ ৩৪৭/৩, করেছিলো কেনিয়া, প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ, ১৯৯৭ সালে। স্কটল্যান্ডের নিজেদের আগের দলীয় সর্বোচ্চ রান ছিলো ৩৪১, কানাডার বিপক্ষে ২০১৪ সালে।

৩৭২ রানের পাহাড় টপকাতে ইংল্যান্ডের শুরুটা হয়েছিলো রকেট-গতিতে, জেসন রয় এবং জনি বেয়ারস্টোর ওপেনিং জুটিতে আসে ১২৯ রান, মাত্র ১২.৩ ওভারে।

বেয়ারস্টো প্রথম ইংল্যান্ড ক্রিকেটার হিসেবে ওয়ানডেতে টানা তিন ম্যাচে শতক করে ফেরার আগে ৫৯ বলে ১০৫ রান করেন। ২৬.৫ ওভারে ইংল্যান্ডের সংগ্রহ ছিলো ২২০/২, সেখান থেকে মিনি কলাপ্স, ৩১.১ ওভারে ২৪৫/৫। ঠিক এই মুহুর্ত থেকেই স্কটল্যান্ডের ক্রিকেটার এবং দর্শকরা বিশ্বাস ফিরে পায় ম্যাচ জেতার।

২৭৬ রানে ৭ উইকেট পড়ার পর ইংল্যান্ডের ভরসা হয়ে ছিলেন মঈন আলী। কিন্তু জয় থেকে ২৫ রান দূরে থাকতে ৩৩ বলে ৪৬ করে আউট হয়ে যান তিনি ছয় মারতে যেয়ে। ২৭ বলে ২৫ রান দরকার, সেই মুহুর্তে কেন ছয় মারতে গেলেন এই যন্ত্রণা নিশ্চয় মঈনকে পোড়াবে অনেকদিন!

ইংল্যান্ডের আশা তবু টিকে ছিলো, ৪৫ বলে ৪৭ রান করে শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থাকলেও লিয়াম প্ল্যানকেটকে আদিল রশিদ এবং মার্ক উড সঙ্গ দিতে পারেননি। প্ল্যানকেটকে নন-স্ট্রাইকিং প্রান্তে রেখে শফিয়ান শরীফের আনপ্লেয়াব্যল ইয়র্কারে যখন মার্ক উড লেগ বিফোর হন তখন স্কটল্যান্ড মাত্র ৬ রানে জয়ী!

ইতিহাস রচিত হয়ে গেলো এডিনবরাহ-এর গার্জ ক্রিকেট ক্লাব গ্রাউন্ডে। সেই সাথে তিন প্রতিবেশী স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস-এর কাছে পরাজিত হবার চক্র পূরণ করলো ইংল্যান্ড। স্কটল্যান্ডের দর্শকের মাঠের ভেতর দল বেধে নেমে আসাই প্রমাণ করে এই জয় তাদের জন্য কতটুকু গুরুত্ব রাখে। ইউরোপে এইরকম দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়!

কিন্তু স্কটল্যান্ডের জয় কি আপসেট?

চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির আগে প্রস্তুতি ম্যাচে শ্রীলঙ্কা হেরেছিলো স্কটল্যান্ডের কাছে বড় ব্যবধানে, স্কটল্যান্ড আন্তর্জাতিক ম্যাচ চাইলেও শ্রীলঙ্কা রাজি ছিলোনা, ফলে আন্তর্জাতিক জয় হিসেবে সেটি নথিভুক্ত হয়নি। গত জুনে এই গার্জেই জিম্বাবুয়েকে হারিয়ে প্রথম কোন টেস্ট প্লেয়িং দেশের বিপক্ষে জয় পায় স্কটল্যান্ড।

বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে আফগানিস্তানের বিপক্ষে জয়, জিম্বাবুয়ের সাথে ‘টাই’ করার পর প্রায় নিশ্চিত জেতা ম্যাচে আম্পায়ার পল উইলসনের ভুলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে পরাজয়। বৃষ্টি নামার আগ পর্যন্ত ডিএলএস ম্যাথডে এগিয়ে ছিলো স্কটল্যান্ড, কিন্তু আম্পায়ারের ভুলে উইকেট হারিয়ে পিছিয়ে পড়ার পর আর খেলা সম্ভব না হলে পরাজয় মেনে নিতে হয়। প্রচন্ড সমালোচনা হয়েছিলো তখন, কেন এত বড় টুর্নামেন্টে ডিআরএস ছিলোনা!

গত এক বছরের খেলার মান বিবেচনায় নিলে স্কটল্যান্ডের জয় কোন আপসেট না, বরং যোগ্যতর দল হিসেবেই তারা হারিয়েছে ইংল্যান্ডকে।

আইসিসির ১০-দলের বিশ্বকাপ থিওরির মুখে কষে চড় দেয়ার মতো এক জয় পেয়েছে স্কটল্যান্ড। পুরা ম্যাচে কে যে ১-নাম্বার দল তা বোঝার কোন উপায় ছিলো না।

টুইটারে উঠেছে ঝড়, সিকান্দার রাজা, শচীন টেন্ডুলকার, ড্যারেন গফ, বয়েড র‌্যাংকিনরা সহযোগী দেশ গুলার পক্ষে মুখ খুলেছেন। স্কটল্যান্ডের পরের অ্যাসাইনমেন্ট ১২ এবং ১৩ জুন পাকিস্তানের বিপক্ষে দুই ম্যাচের টি-টুয়েন্টি সিরিজ।

যেহেতু স্কটল্যান্ড আইসিসির ১৩-দলের ওয়ানডে লিগে নেই, আবার বিশ্বকাপেও থাকছে না সুতরাং আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ খুবই কম। সেক্ষেত্র বাইল্যাটেরাল সিরিজ আয়োজন করতে অন্য দেশগুলার সহযোগীতা দরকার তাদের।

স্কটল্যান্ড ক্রিকেট একটা স্বপ্ন দেখে, ২০২৩ সালের বিশ্বকাপে অংশ নেয়ার এবং আগামী পাঁচ বছর পর টেস্ট স্ট্যাটাস অর্জনের। এই স্বপ্নে তারা কি পাশে পাবে ক্রিকেট বিশ্ব এবং আইসিসিকে?

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।