আমার ফিল্ম মেকিং ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা

উত্তম কুমারকে প্রথম যখন পর্দায় দেখি – তখনও আমি পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করিনি। অনেকের মুখে এই নতুন নায়কের কথা শুনেছি, এবং কৌতূহল নিয়ে তাঁকে দেখার অপেক্ষায় ছিলাম। টানা তিনটা সিনেমা দেখে ফেললাম উত্তম কুমারের। তিনটাই নির্মাণ করেছিলেন আমাদের সময়কার সেরা একজন নির্মাতা নির্মল দে।

উত্তমের ব্যাপারে প্রথম ইম্প্রেশন ছিল- অসাধারণ। উত্তমের ছিল আকর্ষণীয় ব্যাক্তিত্ব, চমৎকার চেহারা এবং সৌজন্যবোধ।

তার সাথে কাজ করার সুযোগটা এলো বেশ দেরী করেই। ততোদিনে উত্তম কুমার রীতিমত কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছেন। তখন প্রায় প্রতিটা সিনেমাই তৈরি হতো তাকে নিয়ে, জুটি হিসেবে থাকতো সুচিত্রা সেন। বিশ্ব সিনেমার ইতিহাসে এতো জনপ্রিয় এবং দীর্ঘদিন ধরে চলা রোমান্টিক জুটি কালেভদ্রেই দেখা যায়।

উত্তম সত্যিকার অর্থে হলিউড ঘরাণার একজন তারকা ছিলেন।

‘নায়ক’-এর সেটে উত্তম-শর্মিলার একটি দৃশ্যধারণ করছেন উত্তম

সে কি আক্ষরিক অর্থেও ‘নায়ক’ কি না এটা বিতর্কিত আলোচনার ব্যাপার। খোদ হলিউডে এরকম একটি উদাহরণ আছে; একজন অভিনেতা যিনি খুব বেশি পারদর্শী ছিলেন না অভিনয়ে, কিন্তু তার প্রথম সিনেমা মুক্তির পর ভক্তরা তাঁকে দ্রুত বেগে তারকার আসনে বসিয়ে দেন। অভিনেতার নাম- গ্রেগরি পেক। তিনি সবসময় বলতেন, ‘আমি আসলে সবসময়ই একজন ‘কাজ চালানোর’ মত একজন অভিনেতা।’

উত্তম, সিনেমার সবচাইতে তুচ্ছ শটটিকেও এতোটা আত্মবিশ্বাসের সাথে সম্পন্ন করতেন যেটি ‘গ্রেগরি পেক’ করতে পারেননি।

সত্যি বলতে আমি কিছুটা উদ্বিগ্ন ছিলাম উত্তমের সাথে প্রথম কাজ করার সময়। তার কথা মাথায় রেখেই তার জন্য একটি চরিত্র তৈরি করেছিলাম। এটি এমন একটি চরিত্র ছিল যার মুল ভাবটা উত্তম খুব সহজেই ধরে ফেলতে পারবে।

একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের যুবক, অভিনয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সিনেমায় ঝুঁকে পড়া এবং বেশ দ্রুত সাফল্যের দেখা পাওয়া। অনেকটা ‘র‌্যাগস টু রিচেস’ টাইপের গল্প, যে গল্পে উত্তমের ব্যাক্তিগত জীবনের কিছুটা ছায়াও থাকবে। যদিও আমি বুঝতে পারছিলাম এই চরিত্রটির কারনে তার সে সময়কার ‘গ্ল্যামার বয়’ ইমেজের উপর একটা প্রভাব পড়তেও পারে তবে উত্তম চরিত্রটি পড়া মাত্রই কাজ করতে রাজি হয়ে যান। কোন প্রকার মেকাপ এর ব্যবহার হবে না – এই মর্মেও তিনি খুব সহজে রাজি হন, যদিও সম্প্রতি চিকেন পক্সের আক্রমণ তাঁর চেহারায় কিছুটা ছাপ ফেলে গিয়েছিলো।

আমি অবশ্যই বলবো – উত্তমের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা – আমার ফিল্ম মেকিং ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা। কাজ শুরুর প্রথমেই ধরে ফেললাম- অভিনয় ব্যাপারটা উত্তমের রক্তের সাথে মিশে আছে। সহজ ভাষায়, জাত অভিনেতা যাকে বলে।

দুই শ্রেণীর অভিনেতার সাথেই কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে আমার। সেরিব্রেল অ্যাক্টরদের কাছ থেকে কাজ আদায় করে নেয়া যায় বৈকি তবে সেক্ষেত্রে তাঁদের সাপোর্ট এবং মোটিভেশনের দরকার হয়। এরপর তারা চরিত্রে ঢুকে যায়। তবে বাস্তবতা হচ্ছে – তাঁদের কাছ থেকে অভিনয়ের নির্যাস বের করে আনার ব্যাপারে কোন গ্যারান্টি নেই। যেটা উত্তমের মতো ইন্সটিঙ্কটিভ অ্যাক্টরের বেলায় আছে।

বার্লিন ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ১৯৬৬ সালে স্পেশাল জুরি অ্যাওয়ার্ড জিতে নিয়েছিল ‘নায়ক’

চরিত্রের বিশ্লেষণাত্মক দিকগুলো নিয়ে উত্তমের সাথে আমার আলোচনা করতে হয়েছিলো – এরকম কোন ব্যাপার আজও মনে পড়েনা।

তবুও সে প্রতিমুহূর্তে আমাকে হতবাক করে দিচ্ছিল তাঁর নিজস্ব অভিনয়শৈলী দ্বারা। চরিত্রের ছোট ছোট ডিটেইলিংগুলো সে নিজের মতো করে পরিবেশন করে যাচ্ছিলো যার একটিও আমার স্ক্রিপ্টে ছিল না।

ডিটেইলিংগুলোও এতো চমৎকার এবং স্বতঃস্ফূর্ত ছিল যে, মনে হচ্ছিলো ব্যাপারগুলো সে মুহূর্তের মধ্যে তৈরি করছে এবং জাদুকরের মতো শার্টের হাতা থেকে বের করে আনছেন।

একজন শিল্পীকে সবসময়ই তার ‘সেরা কাজ’ দিয়ে বিচার করতে হয়। উত্তমের কোন কাজটি তাঁকে স্মরণীয় করে রেখেছে – এটা বলা মুশকিল। কারণ, উত্তম সেই মানের অভিনেতা ছিলেন যার প্রতিটা কাজই মনে রাখার মতো এবং সমানভাবে প্রশংসনীয়। অভিনয়ে ‘স্বতঃস্ফূর্ততা’ এবং ‘আত্মবিশ্বাস’ এ দুইয়ের মিশ্রণ আজকাল দেখা যায়না বললেই চলে। উত্তমবাবুর মাঝে এই মিশ্রণটা যেমনভাবে ছিল তেমনটা বাংলার আর কোন অভিনেতার মাঝে ভবিষ্যতেও কোনদিন দেখা যাবে কিনা- এ ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

দামী একটা ছবি। এক ফ্রেমে চার কিংবদন্তি – সৌমিত্র, উত্তম, সত্যজিৎ ও জ্যোতি বসু।

________________

– কথাগুলো যে মহানায়ক উত্তম কুমারকে নিয়ে বলা সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। আর কথাগুলো বলেছেনও আরেক খ্যাতিমান। তিনি হলেন কিংবদন্তিতুল্য বাঙালি চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়। উত্তম ও সত্যজিৎ জুটি বেঁধে ক্যারিয়ারে দু’টি ছবি করেছেন – ‘চিড়িয়াখানা’ ও ‘নায়ক’।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।